(গতকালের পর)
১১ নভেম্বর নন্দনসহ বেশ কয়েকটি ভেন্যুতে ঘুরে চলচ্চিত্র দেখার সৌভাগ্য হয়। রাতে অতিথিদের সম্মানে কলকাতার সবচেয়ে বড় প্রযোজনা সংস্থা ভেন্কটেশ ফিল্মস এর আমন্ত্রণ পাই। টালিগঞ্জের অভিনেতা-কলাকুশলীরা বরণ করে নেন আমাদের।
১২ নভেম্বর ছিল নন্দনের আঙ্গিনায় শিশিরমঞ্চে ‘গাড়িওয়ালা’ এর ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার। কাকতালীয়ভাবে শিশিরমঞ্চেই আশরাফ শিশিরের ছবিটি দেখানো হয়। এমন কি ডিরেক্টরস প্রেজেন্টেশনের সময়ও উপস্থাপক কনফিউজড ছিলেন শিশিরমঞ্চ আর শিশির নিয়ে। আমি হেসে বললাম, এই মঞ্চের মালিক আমি। কলকাতার মানুষ এখনও থিয়েটার দেখে, বই কেনে, ভাল সিনেমা দেখে জানতাম কিন্তু নিজের চোখে তা দেখতে পেলাম সেদিন। পুরো হল ছিল ভর্তি। শুরুতে আমার বক্তব্যে একটু হতাশ করলাম তাদের, ছবিটা খুব একটা ভাল নয়, ফর্মূলা ছবি নয়, এইসব বলে। বললাম, ‘যে গাড়িকে কেউ কোনদিন হারাতে পারেনি, সেই গল্প গাড়িওয়ালা। ছবি কি বানিয়েছি জানি না, কিন্তু আমার কান্না খুব গোপনে দর্শকদের ভেতরে সংক্রামিত হয়েছে, সেটা ভেবে সিনেমা বানানোর সাহসটা বেড়ে গেল। বাইরে আসতেই সাংবাদিকদের ভীড়, তারা আগেই দর্শক প্রতিক্রিয়া নিয়েছেন, এবার আমার পালা।
১৩ নভেম্বর দুপুরে ছিল সৌমিত্র চট্টপাধ্যায়ের আমন্ত্রণে ঐতিহ্যবাহী ভারতলক্ষী স্টুডিওতে দুপুরের খাবার খাওয়ার আমন্ত্রণ। টালিউডের শিল্পী-কলাকুশলীদের ভীড়ে যেন আবার জ্বেগে উঠেছিল স্টুডিওটি, দেখতে অনেকটা আমাদের এফডিসি’র মত।
বিষয়টি দারুণ যে, গাড়িওয়ালা ২য় বারের মত প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা হয় ১৪ নভেম্বর। সেক্টর ফাইভে নজরুল তীর্থে, যা উদ্বোধন হয়েছে মাস কয়েক আগে। বিশ্বস্ত সূত্রে শুনেছি, স্বাধীন ভারতের প্রয়াত প্রথম প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরুর ১২৫তম জন্মবার্ষিকী তথা শিশু দিবসে অনন্য সন্মান পেল বাংলাদেশি সিনেমা গাড়িওয়ালা। প্রতিবছর ১৪ নভেম্বর জওহরলাল নেহেরুর জন্মদিন উপলক্ষে ভারতে শিশু দিবস পালন করা হয়। ২০তম চলচ্চিত্র উত্সবে ১২ তারিখে কলকাতার শিশিরমঞ্চ প্রেক্ষাগৃহে বাংলাদেশি শিশুদের সিনেমা গাড়িওয়ালা দেখানো হলেও শিশু দিবস উপলক্ষে অভিনেতা রঞ্জিত মল্লিকের নেতৃত্বাধীন চলচ্চিত্র কমিটি গাড়িওয়ালা দেখানোর সিদ্ধান্ত নেয়। শিশিরমঞ্চের প্রদর্শনীতে পাস এর ব্যবস্থা ছিল, নজরুল তীর্থে তা ছিল দর্শনীর বিনিময়ে। ৬০ রুপি ও ৮০ রুপি। আর অডিটেরিয়ামটাও বিশাল। নজরুল তীর্থের প্রধান সম্মানের সঙ্গে রিসিভ করেছিলেন আমাদের। তার অফিসে বসে কথা হল বাংলাদেশ নিয়ে, নজরুলকে নিয়ে। শো এর ১ মিনিট আগে আমরা এক সাথে অডিটেরিয়ামে যাই। মঞ্চে উপস্থাপনা করেন নজরুল তীর্থ প্রধান। শো শেষে আমরা গিয়েছিলাম চলচ্চিত্র উত্সবে অমিতাভ বচ্চনের হাত ধরে রিমোটের মাধ্যমে উদ্বোধন করা মাদাম তুসোর যাদুঘরের আদলে গড়ে ওঠা ‘মাদার ওয়াক্স মিউজিয়াম’ এ। ভাল উদ্যোগ। সেখানে সুচিত্রা সেন থেকে শুরু করে অনেকের সাথে দেখা হয়ে গেল।
১৫ নভেম্বর সকালে বেরিয়ে পড়েছিলাম সাইট সিয়িং করতে... ৩০০ বছরের পুরনো শহরটাকে গায়ে মাখতে। এক্কেবারে গঙ্গার ধারে বিপ্লবের স্মৃতিবিজড়িত দক্ষিণেশ্বর মন্দির হয়ে পুরনো রাস্তাঘাট পেরিয়ে জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি, সেখানে রবীন্দ্রনাথকে খোঁজার অপচেষ্টা। এরপর বিকালে ‘গাড়িওয়ালা’র প্রেস মিট, নন্দনে। ঋজুরেখ চক্রবর্তীর সঞ্চালনায় সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন দেশ-বিদেশের অনেক সংবাদকর্মী। ভয় ছিল, এত বিদেশি ডিরেক্টরের ভীড়ে বাংলাদেশি আনকোড়া ডিরেক্টরের গুরুত্ব কতটুকুই বা হবে। অথচ ঘটল উলটোটা। সবাই আমার কণ্ঠে গাড়িওয়ালার গল্পে বাংলাদেশকে আবিষ্কারের চেষ্টায় মনোযোগী হলেন। আমিও সুযোগ বুঝে ২০০৭ সালে অনলাইন সোশ্যাল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে শুরু করা আমার চলচ্চিত্র আন্দোলন ‘আমরা একটা সিনেমা বানাব’ বা সম্পূর্ণ সাদাকালোয় নির্মিত রঙ্গিন স্বপ্নের চলচ্চিত্র নিয়ে গল্প জুড়ে দিলাম। সেই গল্প ছুঁয়ে গেল পাবনার সুচিত্রা সেন থেকে শুরু করে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা পর্যন্তও। ধর্মীয় দাঙ্গার ব্যাপারে একটা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিলাম আমি বললাম, গত কয়েক দশকে আমাদের দেশে কখনো সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়নি, যা হয়েছে তা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার মোড়কে রাজনৈতিক সন্ত্রাস। আমরা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অসাম্প্রদায়িক দেশ। কিছু খারাপ মানুষের জন্য আমাদের নিন্দিত হতে হয়। প্রশ্ন ছিল, দুই বাংলার চলচ্চিত্র বিনিময় নিয়েও। সেখানেও কথা বলেছি আমি। বলেছি নকল ছবির গল্পও। নানা প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে ঘন্টাখানেক চলে যায়, সঞ্চালক বাধ্য হয়ে সেশনটা শেষ করেন। আমি বের হয়ে আসার পরেও সাংবাদিকরা ছুটে আসেন, প্রশ্নোত্তর চলতে থাকে। পরদিন ভারতের বিভিন্ন টেলিভিশন, ইংরেজি ও বাংলা সংবাদপত্রে এসব কথা ফলাও করে আসে। দুরদর্শন আমাকে নিয়ে একটা এক ঘন্টার প্রোগ্রাম করতে চায়। কিন্তু ওইদিনই আমার ফ্লাইট থাকায় নন্দনেই তড়িঘড়ি করে একটা ইন্টারভিউ নেওয়া হয়। সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে হোটেলে এসে লাগেজ নিয়ে এয়ারপোর্ট পৌঁছাতে দেড়ি হয়ে যায়, আমি নির্ধারিত ফ্লাইটটি মিস করি।
১৬ নভেম্বর বিভিন্ন ভেন্যুতে ছবি দেখে বেড়াই। ১৭ নভেম্বর নজরুল মঞ্চে দারুণ এক সমাপনী অনুষ্ঠান। ১৮ নভেম্বর ফিরে আসি প্রিয় বাংলাদেশে, সঙ্গে করে এক অনবদ্য স্মৃতি, আর সঙ্গে নিয়ে আসি বুকভর্তি সাহস, আরও অনেক অনেক সিনেমা বানানোর !
