সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের চূড়ান্ত দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধীরা রিভিউ পিটিশন দায়ের করতে পারবে। চূড়ান্ত দণ্ডাদেশপ্রাপ্তরা রিভিউ পিটিশন করতে পারবে কিনা এ নিয়ে বিতর্ক দেখা দিয়েছিলো। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াত নেতা আব্দুল কাদের মোল্লার রিভিউ পিটিশনের ওপর গতকাল মঙ্গলবার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করে এই বিতর্কের অবসান ঘটালো। এ সংক্রান্ত রায়ে আপিল বিভাগ বলেছে, রিভিউ কিছুতেই আপিলের সমপর্যায়ের নয়। ভুল এবং ব্যতিক্রমী ক্ষেত্রেই কেবল রায় রিভিউ হয়। তবে মানবতাবিরোধী অপরাধীরা রিভিউর আবেদন করতে পারবেন। একইসঙ্গে রিভিউ পিটিশন দায়ের করতে পারবে রাষ্ট্রপক্ষও। তবে সুপ্রিম কোর্ট রুলসে রিভিউ পিটিশন করার জন্য যে ৩০ দিনের সময়সীমা নির্ধারিত ছিলো আপিল বিভাগ তা কমিয়ে ১৫ দিন ধার্য করেছে। আপিল বিভাগ বলেছে, রিভিউ বা প্রাণভিক্ষার আবেদন নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা যাবে না। এর ফলে পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত দণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াত নেতা এম কামারুজ্জামানের মৃত্যুদণ্ডাদেশ কার্যকর করা যাচ্ছে না।
২০১৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি কাদের মোল্লাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয় যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন কাদের মোল্লা। পাশাপাশি তার সর্বোচ্চ সাজা চেয়ে আপিল করে রাষ্ট্রপক্ষ। উভয় আপিলের শুনানি শেষে ওই বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ কাদের মোল্লাকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেন। আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর এর বিরুদ্ধে রিভিউ পিটিশন দায়ের করেন কাদের মোল্লা। প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেনের নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের ৫ বিচারপতির বেঞ্চ রিভিউ পিটিশন খারিজ করে দিয়ে কাদের মোল্লার মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন। ওই রিভিউ পিটিশনের ওপর গতকাল পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করা হলো। বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা এ রায় লিখেছেন। তার সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেন, বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহহ্াব মিয়া, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন এবং বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী।
আপিল বিভাগের রায়ে ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের একটি রায়ের নজির দেখিয়ে বলা হয়েছে, আপিলে উচ্চতর কর্তৃপক্ষের নিকট পুরো প্রক্রিয়া উপস্থাপিত হয়। আইনের সীমায় পুরো দলিলাদির ভিত্তিতে সমগ্র প্রক্রিয়াকে বিবেচনা করা হয়। যদি কোনো পক্ষ আদালতের কোন আদেশ বা রায়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, এক্ষেত্রে রিভিউ’র সুনির্দিষ্ট বিধান না থাকলে আদালত অন্তর্নিহিত ক্ষমতাবলে তার রায় বা আদেশ বিভিউ করতে পারেন। আইন দ্বারা প্রতিষ্ঠিত যে কোনো আদালতে, বিচারের যে কোনো পর্যায়ে রিভিউ’র ক্ষমতা প্রয়োগ করা যায়।
রায়ে বলা হয়, বিচার বিভাগের প্রাথমিক কাজ হলো, পক্ষগুলোর মধ্যে ন্যায় বিচার নিশ্চিত করা। যাকে আমরা উপেক্ষা করতে পারি না। তবে এটা সংবিধানের ১০৪ অনুচ্ছেদ অনুসারে নয় উল্লেখ করে রায়ে বলা হয়, ১৯৭৩ সালের ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস ট্রাইব্যুনাল আইনটি একটি সুরক্ষিত আইন। তাই সংবিধানের ১০৪ অনুচ্ছেদ এক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না। সংবিধানের ৪৭(ক)(২) অনুসারে মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িতদের সংবিধানের আলোকে প্রতিকার চাইতে পারেন না। তারা আপিলের অধিকার পায় ১৯৭৩’র আইনের আলোকে। সংবিধানের ১০৩ অনুচ্ছেদ অনুসারে নয়। যদি ১০৩ অনুচ্ছেদ প্রযোজ্য না হয়, তাহলে রিভিউ করার জন্য ১০৪ ও ১০৫ অনুচ্ছেদও প্রযোজ্য হবে না। স্বাভাবিকভাবে সুপ্রিম কোর্ট (আপিল বিভাগ) রুল-১৯৮৮ ও প্রযোজ্য হবে না। রায়ে বলা হয়, রিভিউ আপিলের সমকক্ষ নয়। এটা এখন মীমাংসিত বিষয় যে, রিভিউ আবেদনকারীর একটি অধিকার হিসাবে বিবেচিত হবে না। পূর্ববর্তী আদেশের নির্ভরযোগ্যতায় খাদ পাওয়া গেলে বা বিচার-বিভ্রাটের ফল সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়েছে বলে সন্তুষ্ট করতে না পারলে পুনর্বিবেচনা অনুমোদনযোগ্য হবে না। রায়ে বলা হয়, কোনো মামলায় রায়ের রিভিউ একটি গুরুতর পদক্ষেপ। চোখে পড়ার মতো কোন কিছু বাদ গেলে বা সুস্পষ্ট বা বড় কোনো ভুল না হলে আদালত তার এই ক্ষমতা ব্যবহার করতে অনিচ্ছুক।
রায়ে আরো বলা হয়েছে, আপিল বিভাগ রুলসে রিভিউ দায়েরের ক্ষেত্রে যে সময়সীমার কথা বলা হয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালস আইনের অধীনে রায়ের রিভিউর ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য নয়। এক্ষেত্রে ১৫ দিনের সময়সীমা অনুসরণ করতে হবে এবং অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে রিভিউ আবেদন নিষ্পত্তি হবে। আপিল বিভাগের মৃত্যুদণ্ডের রায়ের প্রেক্ষিতে মৃত্যুপরোয়ানা জারির আদেশ কারাকর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছালে কারাকর্তৃপক্ষ তাকে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদনের সুযোগ দিবেন। একইসঙ্গে তাকে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ দিতে হবে। যদি কোন রিভিউ অথবা প্রাণ ভিক্ষার আবেদন দায়ের করা হয় ওই আবেদন নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা যাবে না। সুতরাং বর্তমান পরিবর্তিত অবস্থায় জেল কোডে উল্লেখিত সাত দিন অথবা ২১ দিনের বিধান প্রযোজ্য হবে না।
রায়ে বলা হয়, যখনই কোন আবেদন ও আপিলের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপিত হয় তখন আদালতের দায়িত্ব মেরিটে যাওয়ার আগে সেই প্রশ্নের নিষ্পত্তি করা। মানবতাবিরোধী অপরাধীদের ক্ষেত্রে সংবিধানের কতিপয় অনুচ্ছেদের অকার্যকরতার কথা উল্লেখ করে রায়ে বলা হয়, সংবিধানের ৪৭ ক(২) অনুচ্ছেদে প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে সুপ্রিম কোর্টের রিভিউ ক্ষমতা বাতিল করা হয়নি। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালস আইনের ১১(৩) ধারারও ব্যাখ্যা দেয়া হয় রায়ে। এতে বলা হয়, এ আইনে স্পষ্টভাবেই বিচার কার্যক্রম দ্রুততার সঙ্গে শেষ করার কথা বলা হয়েছে। এমনকি আপিল নিষ্পত্তিতেও সময় বেধে দেয়া হয়েছে, যদিও তা নির্দেশনামূলক। এসব বিধান সমন্বিতভাবে পাঠ করলে বুঝা যায়, আইন প্রণেতাদের উদ্দেশ্যে ছিল ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালস আইনে বর্ণিত অপরাধের বিচার যত দ্রুত সম্ভব শেষ করতে হবে। মানবতাবিরোধী অপরাধ, গণহত্যা এবং যুদ্ধাপরাধের মতো অপরাধে যুক্তদের বিচারের মুখোমুখী করতে এরই মধ্যে অনেক দেরি হয়ে গেছে। শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর রাজনৈতিক মেরুকরণের কারণেই এটা ঘটেছে। দেশের মানুষ এই সব ঘৃণিত অপরাধীদের বিচার দেখতে চায়।
রায় প্রকাশের পর অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম সাংবাদিকদের বলেন, এই রায়ের ফলে দুই পক্ষই রিভিউ আবেদন করার সুযোগ পাবে। তিনি বলেন, জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মামলার রায় হাতে পেলে আমরা বিচার বিশ্লেষণ করব। সেখানে রিভিউয়ের মতো উপাদান পাওয়া গেলে রিভিউ করব। এ রায় প্রকাশ হওয়ায় কামারুজ্জামানের রিভিউ পিটিশন দায়ের নিয়ে যে দোদুল্যমনতা ছিলো তা কেটে গেলো। আমি ভেবেছিলাম রিভিউ করার সুযোগ নেই। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের এখতিয়ারের বলে এর একটা সুষ্ঠু সমাধান হলো।
অন্যদিকে কামারুজ্জামানের আইনজীবী অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, রিভিউ মানে ভুল সংশোধন করা, সঠিক ভাবে মূল্যায়ন করা এবং আইনের বরখেলাপ হয়েছে কিনা তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে দেখা। আর যদি রায়ে কোন ভুল হয় সেটা সংশোধন করে দেয়া। কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগের রায় প্রকাশের পর খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে পরে রিভিউ আবেদন করবো।