দেড় হাজার সন্দেহভাজন মুক্তিযোদ্ধার ভাতা বন্ধ

আপডেট : ২৬ নভেম্বর ২০১৪, ০০:৫০

সন্দেহের তালিকায় থাকা সরকারি গেজেটভুক্ত ৫৫ হাজার মুক্তিযোদ্ধার মাসিক ভাতা বন্ধ ও সনদ বতিলের কাজ শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যে সারাদেশে সন্দেহভাজন দেড় হাজার মুক্তিযোদ্ধার ভাতা বন্ধ করে তদন্তে ভুয়া প্রমাণিত হলে তাদের সনদ বাতিল করতে নির্দেশ দিয়েছে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়। প্রতিদিনই এধরনের নির্দেশ দেয়া হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ভাতা বন্ধের বিষয়টি রুটিন কাজে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন সারাদেশ থেকে অভিযোগ আসছে মন্ত্রণালয়ে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যকার সৃষ্ট প্রতিপক্ষ যারা জেলা ও উপজেলায় নির্বাচনে বা অন্যকোন উপায়ে কমাণ্ডের নেতৃত্বে আসতে পারেননি মূলত তাদের পক্ষ থেকে অভিযোগ আসছে–যারা এখন নেতৃত্বে আছে তাদের বিরুদ্ধে। আবার উল্টোটাও ঘটছে। যারা পরাজিত হয়েছেন তাদের অনেকের বিরুদ্ধেও অভিযোগ আনছেন-বিজয়ীরা। আর এমন অভিযোগপত্র হাতে হাতেও নিয়ে আসা হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়কমন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক অভিযোগপত্রের ওপরই লিখে দিচ্ছেন-ভাতা বন্ধ করে সনদ তদন্ত করতে। অভিযোগপত্রে শুধু লিখছেন ভাতা বন্ধ ও তদন্ত করা যায়। কে তদন্ত করবে কে ভাতা বন্ধ করবে সে সম্পর্কে মন্ত্রী কিছু লিখছেন না। তবে কিছু অভিযোগপত্রে অবশ্য ইউএনও-ডিসির প্রতি নির্দেশ নির্দিষ্ট করে দেয়া হচ্ছে। 
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মুক্তিযোদ্ধা কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) হেলাল মোর্শেদ খান বীর বিক্রম ইত্তেফাককে বলেন, যে প্রক্রিয়ায় ভাতা বন্ধ কিংবা সনদের তদন্ত করা হচ্ছে এতে জটিলতা তৈরি হচ্ছে। অনেক প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা হয়রানির শিকার হচ্ছেন-মর্মে কাউন্সিলে অভিযোগ আসছে। বিষয়টি মন্ত্রণালয়ের নজরে নেয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
বর্তমানে (১০ নভেম্বর ১৪ পর্যন্ত) গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা ২ লাখ ৯ হাজার। এরা সকলেই মাসিক পাঁচ হাজার টাকা করে ভাতা পাচ্ছেন। এখন নতুন করে কাউকে সনদ দেয়া হচ্ছে না।
লালমুক্তিবার্তা, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতিস্বাক্ষরিত এবং মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের তালিকায় (যা ভারত থেকে পাওয়া) নাম না থাকা ৫৫ হাজার গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধার মধ্য থেকেই ভাতা বন্ধ করা হচ্ছে-এই দাবি মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের। এরমধ্যে সরকারি চাকরিজীবী ও বেসরকারি লোকও আছেন। তবে মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিল বলছে, ভাতা বন্ধ ও সনদ তদন্তের বিষয়টি স্পর্শকাতর-এটি সতর্কতার সঙ্গে করা দরকার। কেউ কেউ বলছেন, মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা দেয়া হয় আইনের দ্বারা। মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তে ভাতা নির্ধারণ করা হয়। বাড়ানো হয়। বন্ধ করার ক্ষেত্রে মন্ত্রী এককভাবে যে নির্দেশ দিচ্ছেন-সেটি নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।
প্রসঙ্গত, ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু সরকারের এক আদেশ বলে মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা দেয়ার ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়। সেখানে কারা এই ভাতা পাবেন সেটিও স্পষ্ট করে বলা হয়েছে। ওই আদেশে বর্ণিত মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞায় যারা পড়বেন তারাই ভাতা পাবেন।
১৯৭২ সালের আদেশে বলা হয়েছে, মুক্তিযোদ্ধা মানে এমন একজন ব্যক্তি যিনি মুক্তিযুদ্ধে নিয়োজিত যে কোন সংগঠিত দল (ফোর্স)-এর সদস্য হিসাবে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। কেউ যদি মুক্তিযুদ্ধে নিয়োজিত কোন সংগঠিত দলের সদস্য না হন এবং হয়েও যদি সক্রিয় ভূমিকা না রাখেন তিনি মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞায় পড়বেন না।
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মতে, সরকারি সুযোগ-সুবিধা নিতে বিশেষ উদ্দেশ্যে এসব ব্যক্তির নাম মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে। অনেক সময় উপজেলা, জেলা থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় কমাণ্ড কাউন্সিলের ভোট পরিস্থিতি অনুকূল রাখতেও এ ধরনের কাজ করা হয়ে থাকতে পারে। 
মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা গতকাল মঙ্গলবার ইত্তেফাককে বলেন, গেজেট ভুক্ত মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা যাচাই-বাছাই করে দেখা গেছে- ৫৫ হাজার ব্যক্তিকে মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার কোন আইনগত ভিত্তি নেই। এসব ব্যক্তির মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে কোন দালিলিক প্রমাণও নেই। তারা নিচ্ছেন সকল সরকারি সুযোগ-সুবিধা। এখন তাদেরই সুযোগ-সুবিধা বাতিলের কাজ শুরু হয়েছে।

লালমুক্তিবার্তা, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতিস্বাক্ষর করা এবং মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের মাধ্যমে পাওয়া তালিকা— এই তিনটি মিলিয়ে মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা এক লাখ ৮০ হাজার বা এর কিছু কমবেশি; কিন্তু কী প্রক্রিয়ায় এ সংখ্যা ২ লাখ ৯ হাজার হয়েছে তার সঠিক জবাব পাওয়া যাচ্ছে না।