আত্মসমর্পণের পর কারাগারে লতিফ সিদ্দিকী

আপডেট : ২৬ নভেম্বর ২০১৪, ০৯:৩৬



মন্ত্রিসভা ও আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কৃত আব্দুল লতিফ সিদ্দিকীকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। গতকাল দুপুরে তিনি ধানমন্ডি থানায় আত্মসমর্পণ করেন। পরে তাকে গ্রেফতার দেখিয়ে হাজির করা হয় ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে। এরপর মহানগর হাকিম তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। আদালত থেকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে নেয়ার সময় সাংবাদিকদের কোন প্রশ্নের জবাব তিনি দেননি। তিনি কেবল মাথা নেড়ে বুঝিয়ে দেন, তিনি কিছুই বলবেন না।
প্রায় দুই মাস ভারতের পশ্চিমবঙ্গে অবস্থান করার পর লতিফ সিদ্দিকী রবিবার রাতে এয়ার ইন্ডিয়ার একটি ফ্লাইটে দেশে ফেরেন। এরপর তিনি আত্মগোপনে চলে যান। গ্রেফতারি পরোয়ানা থাকলেও বিমানবন্দরে তাকে গ্রেফতার করেনি পুলিশ। তাকে গ্রেফতার করা না করা নিয়ে সরকারের মধ্যে এক ধরনের অস্বস্তি দেখা যায়। সোমবার হেফাজতে ইসলামসহ ধর্মভিত্তিক কয়েকটি সংগঠন হরতালসহ কঠোর কর্মসূচির হুমকি দেয়। সংসদে অনির্ধারিত আলোচনায়ও লতিফ সিদ্দিকীর গ্রেফতারের দাবি ওঠে।
ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়ার অভিযোগে লতিফ সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে ঢাকা ও দেশের ১৮টি জেলায় ২২টি মামলা রয়েছে। নির্ধারিত সময়ে আদালতে হাজির না হওয়ায় প্রতিটি মামলায় তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি আছে।
ধানমন্ডি থানায় লতিফ সিদ্দিকী :দুপুর ১টা ৩৪ মিনিট একটি সিএনজি অটোরিকশা যোগে থানায় পৌঁছান লতিফ সিদ্দিকী। এসময় তার পরনে ছিল সাদা জুতা, কালো প্যান্ট ও সাদা চেক শার্ট। তিনি সরাসরি চলে যান থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আবু বকর ছিদ্দিকীর রুমে। রুমেই ছিলেন ওসি। তিনি ওসিকে সরাসরি বলে ওঠেন, আমি হাজির। পাল্টা ওসি তাকে বলেন, আমি তো আপনাকে খুঁজছি। এরপর লতিফ সিদ্দিকী বলেন, আমি আদালতে যেতে চাই। আর থানায় পৌঁছার ২০ মিনিটের মধ্যে কড়া পুলিশ পাহারায় লতিফ সিদ্দিকীকে পাঠানো হয় আদালতে।
ধানমন্ডি থানা সূত্র জানায়, ধানমন্ডি থানার ওসি আবু বকর ছিদ্দিকীর জিজ্ঞাসাবাদে আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী জানান, রবিবার রাতে বিমান বন্দর থেকে বের হবার পর থেকে ছিলেন গুলশানে তার ছেলের বাসায়। এরপর ছিলেন গুলশান এলাকায় তার এক বন্ধুর বাসায়। এরপর ওসি তাকে প্রশ্ন করেন, গুলশান রেখে ধানমন্ডি থানায় কেন। এমন প্রশ্নের জবাবে লতিফ সিদ্দকী বলেন- ঐ হলো।
কারা ফটকে লতিফ
আদালতে আইনজীবীদের জুতা হাতে মিছিলের মধ্যেই কারাগারে নেয়ার জন্য আব্দুল লতিফ সিদ্দিকীকে তোলা হয় পুলিশের প্রিজন ভ্যানে। প্রিজন ভ্যানটি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ফটকে পৌঁছে বিকাল ৩টা ২৫ মিনিটে। প্রিজন ভ্যান থেকে নামানোর পর মাথা নিচু করে কারাগারের পকেট গেট দিয়ে ঢুকতে তিনি অস্বীকৃতি জানান। তিনি জানিয়ে দেন, তাকে ভেতরে নিতে হলে কারাগারের মূল ফটক খুলতে হবে। উপস্থিত কারা কর্মকর্তাদের বলেন, ‘আমি এখনো এমপি। গত ৩০ বছর আমি পকেট গেট দিয়ে ইন বা আউট হইনি।’
 ইস্পাতের তৈরি মূল ফটকের গায়ে লাগোয়া ছোট আকারের ‘পকেট ফটক’ দিয়েই আসামি ও কয়েদিদের আনা নেয়া করে কারা কর্তৃপক্ষ। প্রিজন ভ্যান ও গাড়ি ঢোকানোর দরকার হলে অথবা বিশেষ প্রয়োজনে মূল ফটক খোলা হয়। শেষটায় পুলিশ সদস্য ও কারা কর্মকর্তারা বিষয়টি লতিফ সিদ্দিকীকে বোঝানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। এভাবে কেটে যায় প্রায় বিশ মিনিট।
এরপর বিকাল ৩টা ৪২ মিনিটে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সুপার ফরমান আলী বাইরে আসেন। এসময় ফটক খুলে দেয়া হয়। ফরমান আলীর সঙ্গেই ভেতরে প্রবেশ করেন লতিফ সিদ্দিকী।
এ ব্যাপারে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার ফরমান আলী বলেন, কোন ফটক দিয়ে কে কারাগারে ঢুকতে বা বের হতে পারবে, সে বিষয়ে তারা সুনির্দিষ্ট নিয়ম অনুসরণ করেন। জেলার চাইলে মূল ফটক খুলে ঢুকতে বা বের হতে পারেন। লতিফ সিদ্দিকীর ক্ষেত্রে এ নিয়মের কোন ব্যত্যয় ঘটেনি। তিনি আমার সঙ্গে ঢুকেছেন। কারা সূত্র জানায়, আব্দুল লতিফ সিদ্দিকীকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ডিভিশন সেলে রাখা হয়েছে।
কোর্ট রিপোর্টার জানান, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের মামলায় জামিন প্রার্থনা না করায় আব্দুল লতিফ সিদ্দিকীকে জেলহাজতে পাঠিয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত। গতকাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আতিকুর রহমান তিনটি মামলায় তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। দুপুর আড়াইটায় তাকে ঢাকার সিএমএম আদালতের দোতলার কোর্টে নিয়ে আসা হয়। সেখানে তিনি আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়ান। বেলা আড়াইটার দিকে এজলাসে আসন গ্রহণ করেন ২৫ নং আদালতের বিচারক আতিকুর রহমান।
শুরুতে ম্যাজিস্ট্রেট আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়ানো লতিফ সিদ্দিকীর কাছে জানতে চান তিনি কাউকে ওকালতনামা দিয়েছেন কিনা বা তার পক্ষে কোন আইনজীবী আছেন কিনা। এসময় লতিফ সিদ্দিকী জানান তিনি কাউকে ওকালতনামা দেননি। বাদী আবেদ রাজা শুনানিতে বলেন, বিশ্বের দুশ’ কোটি মুসলমানের পক্ষে তিনি এই মামলা করেছেন। এরপর বিচারক বাদীকে থামিয়ে বলেন, উনি যেহেতু জামিন চাননি, সেহেতু আপনাদের কোন কথা বলার প্রয়োজন নেই। এরপর বিচারক আসামিকে জেলহাজতে পাঠানোর আদেশ দিয়ে এজলাস ত্যাগ করেন।
এরপর উল্লাসে ফেটে পড়েন আদালতে থাকা বাদীপক্ষের আইনজীবীসহ অন্যরা। এরপর কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে তাকে আদালত কক্ষ থেকে সিএমএম-এর হাজতখানায় নিয়ে আসা হয়। এসময় উপস্থিত আইনজীবী ও অন্যরা নানা শ্লোগান ও দুয়োধ্বনি দিতে থাকেন। আদালত কক্ষেই তাকে নাস্তিক ও শেম শেম বলে তিরস্কার করা হয়। এরপর আদালত প্রাঙ্গণে তারা শ্লোগান দিতে থাকেন। এসময় তার দিকে থুথু নিক্ষেপ করতে দেখা গেছে। শেষে দ্রুততার সাথে কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে পুলিশের গাড়ি জেলহাজতের উদ্দেশ্যে আদালত চত্বর ত্যাগ করে। সর্বশেষ তাকে বহনকারী গাড়ির জানালাতে জুতা দিয়ে আঘাত ও থুথু নিক্ষেপ করতে দেখা গেছে ক্ষুব্ধ কয়েকজনকে।
ঢাকার আদালতে লতিফ সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে সাতটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এর মধ্যে চারটি মামলায় তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে আদালত। এগুলোর মধ্যে সোমবার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আতিকুর রহমান বাদী এএনএম আবেদ রাজার মামলায় তাকে গ্রেফতার করার জন্য তাগিদ দেন পুলিশকে। ঐ দিনই বাদী আসামিকে ১২ ঘন্টার মধ্যে গ্রেফতার করার জন্য একটি আবেদন দাখিল করেছিলেন।  গত ২৮ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে এক অনুষ্ঠানে পবিত্র হজ্ব ও তাবলিগ জামাত নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করায় মন্ত্রিসভা ও দল থেকে বহিষ্কৃত হন আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী।