ব্রিটিশ পার্লামেন্টে বাংলাদেশের গণতন্ত্র, মানবাধিকার, মতের স্বাধীনতা বিষয়ক সেমিনার

আপডেট : ২৭ নভেম্বর ২০১৪, ২২:০৭
 
 
 
ব্রিটিশ পার্লামেন্টের কমিটি রুমে স্থানীয় সময় ২৬ নভেম্বর এক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর বিষয়বস্তু ছিল— বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৪৩ বছরে উন্নয়ন, গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং ধর্মনিরপেক্ষতার ক্ষেত্রে হুমকি। সেমিনারে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির পক্ষ থেকে উচ্চপর্যায়ের দুটি প্রতিনিধি দলের সদস্যরা অংশ প্রহণ করেন।
সেমিনারে বক্তারা বলেছেন, বাংলাদেশে টেকসই উন্নয়নের লক্ষে অংশীদারত্বমূলক গণতন্ত্র, সর্ব ধর্মীয় মতের প্রতি সম্মান প্রদর্শন, মানবাধিকার এবং মানুষের কথা বলার স্বাধীনতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
আওয়ামী লীগ ও বিএনপির পক্ষ থেকে নিজ-নিজ প্রতিনিধিরা তাদের বক্তব্য তুলে ধরেন। তারা প্রত্যেকেই তাদের বক্তব্য অভিযোগাকারে উপাস্থাপন করেন।
সেমিনারের সঞ্চালক লর্ড এভিবুরি বাংলাদেশে অংশীদারত্বমূলক গণতন্ত্র, সর্ব ধর্মের মতের প্রতি সম্মান প্রদর্শন, মানবাধিকার এবং মানুষের কথা বলার স্বাধীনতার ক্ষেত্রে গুরুত্বারোপ করেন।
সেমিনারের শুরুতে বিএনপির আর্ন্তজাতিক বিষয়ক সম্পাদক মাহিদুর রহমানের বক্তব্যে উভয় দলের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হলে লর্ড এভিবুরি বলেন, এই স্থানটা মূলত ঢাকা নয় এটা বৃটিশ পার্লামেন্টের সেমিনারকক্ষ। আপনারা শান্ত হোন। পরে কক্ষ শান্ত হলে মাহিদুর রহমান প্রশ্ন করেন, বাংলাদেশে কখন একটি অবাদ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হবে? এরপর এভিবুরি বক্তব্য দেয়ার আহ্বান জানান আওয়ামী লীগ নেতা ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এইচ টি ইমামকে। তিনি তার বক্তব্যে বর্তমান সরকারের উন্নয়নের নানা দিক তুলে ধরেন এবং সুপ্রিম কোর্টের রায়ের কথা উল্লেখ করে বলেন, বিএনপির তত্ত্বাবধায়ক সরকার-সম্পর্কিত দাবির কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই।
সেমিনারে ব্রিটিশ এমপি অ্যান মেন কো-চেয়ার হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। উভয় দলের সদস্যদের মধ্যে থেমে-থেমে উত্ততপ্ত পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে তিনি বলেন, আমি আশা করি ব্রিটিশ পালামেন্টের এই সেমিনারকক্ষে আপনারা যার-যার অবস্থানে থেকে শান্তিপূর্ণভাবে অবস্থান নিয়ে গণতান্ত্রিক রীতিতে প্রাণবন্ত বিতর্ক করবেন।
তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশ ৪৩ বছরে অনেক দূর এগিয়ে গেলেও এখনো আরো অনেক দূর পথ চলতে হবে। এ জন্য  গণতন্ত্র ও মানবাধিকার, ধর্ম নিরপেক্ষতা, পরমতের প্রতি সম্মান ও সুরক্ষা সমুন্নত রাখা প্রয়োজন।
লর্ড এভিবুরি পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেন, আদিবাসীদের ভূমি জবরদখল এবং তাদের ন্যায়সঙ্গত সমতার ভিত্তিতে ভূমিবণ্টন ও নানা ইস্যুতে গৃহীত শান্তি চুক্তিকে আরো সুদৃঢ় ও এগিয়ে নেয়ার সুযোগ রয়েছে। তিনি আরো বলেন, আর্ন্তজাতিক সম্প্রদায় অর্থাত্, বাংলাদেশের বন্ধু রাষ্ট্রগুলো সব সময়ই বাংলাদেশের মানুষের কল্যাণে কাজ করছে। ধর্মীয় উগ্রবাদ, সন্ত্রাস, কট্টর পন্থাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে কেউ লালন করবে তা আমরা চাই না।
এইচ টি ইমাম ৫ জানুয়রির নির্বাচন প্রসঙ্গে বলেন, বিএনপি এ নির্বাচনে অংশ নেয়নি তার দায়িত্ব তাদেরই নিতে হবে। আমরা বিএনপিকে নির্বাচনে অংশ নিতে আহ্বান জানিয়ে ছিলাম। বিএনপি নেত্রীকে প্রধানমন্ত্রী নিজে উদ্যোগী হয়ে ফোন করেছেন। বিএনপি তাতে সাড়া দেয়নি।
তিনি বলেন, ‘ডেমোক্রাটিক ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদনে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে ৪০ শতাংশ ভোটার ভোট দিয়েছেন মর্মে উল্লেখ রয়েছে।
তিনি সেমিনারে ২০০১-০৬ সাল পর্যন্ত সন্ত্রাসী হামলা, জঙ্গিবাদের উত্থান, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সন্ত্রাস, আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের হত্যাকাণ্ড এবং ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার কথা উল্লেখ করেন।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের আব্বাস ফয়েজ বলেন, বাংলাদেশে গুম, খুন, নিখোঁজ, মিডিয়ার স্বাধীনতা, বিরোধী মতের কণ্ঠ রোধ উদ্বেগজনক। এটা ক্রমেই বেড়ে চলছে। তিনি মত প্রকাশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে চরম উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, বাংলাদেশে  সংবাদপত্র এবং সাংবাদিকদের ন্যূনতম স্বাধীনতা নেই। তারা সব চেয়ে বিপদ-জনক পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে।
বিএনপি নেতা আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী তার বক্তব্যে বলেন, বর্তমান সরকার একদলীয় শাসন কায়েম করেছে। বিরোধী মতের প্রতি কোনো সম্মান বর্তমান সরকার করছে না। তারা ক্রমেই ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে। দুর্নীতির মাত্রা সর্বকালের রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। তিনি ব্যাংক, শেয়ার মার্কেট, পদ্মা সেতুর দুর্নীতির বিষয় তুলে ধরেন। তিনি আরো বলেন, বর্তমান সরকার সকল প্রতিষ্ঠানকে বিপদ-জনক ভাবে দলীয় করণ করছে। এ সময় তিনি এইচ টি ইমামের সাম্প্রতিক সময়ের ছাত্র লীগ বিষয়ক বক্তব্য তুলে ধরেন।
বিএনপির শমসের মুবিন চৌধুরী বলেন, বর্তমানে যারা সংসদে রয়েছে, তারা জনগণের ভোটে নির্বাচিত নয়।
আওয়ামী লীগের ড. মশিউর রহমান বলেন, আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বর্তমান সরকার অর্থনৈতিক উন্নয়নে সক্ষম হয়েছে। দেশ প্রভুত উন্নয়নের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
সরকার দলীয় সংসদ সদস্য প্রমোদ মানকিন বলেন, ধর্মীয় মৌলবাদীরা ধর্মনিরপেক্ষতার ক্ষেত্রে চরম অন্তরায়।
অওয়ামী লীগের এমপি তারানা হালিম বলেন, জামায়াতে ইসলামী একটি সন্ত্রাসী সংগঠন। তারা আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে জড়িত।
লর্ড কার্লাইল বলেন, বাংলাদেশে ক্রমাগতভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা বেড়ে চলছে। এতে আমরা চরমভাবে উদ্বিগ্ন।
জিন ল্যাম্বার্ট বলেন, ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বৈধ হলেও জনগণের মতের প্রতিফলন ঘটেনি।
ব্রিটিশ এমপি জিম ফিজ প্যাট্রিক বলেন, আমরা আওয়ামী লীগ, বিএনপি—সকলের সঙ্গেই কাজ করতে চাই, তবে জঙ্গিবাদকে কখনোই গ্রহণ করব না বা প্রশ্রয় দেব না।