মানসম্পন্ন শিক্ষাদান নয় অর্থ উপার্জনই মুখ্য

আপডেট : ০২ ডিসেম্বর ২০১৪, ২৩:৩৭

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের চালচিত্র

শিক্ষক নিয়োগ হয় ট্রাস্টি বোর্ডের ইচ্ছেমতো, শিক্ষার্থী ভর্তিতে পরীক্ষা বা মান যাচাই হয় না, টাকা দিলে বছরের যে কোন সময়েই ভর্তি নেয়া হয়,  সিলেবাসও তৈরি হয় যাচ্ছেতাইভাবে
দেশের অধিকাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা পদ্ধতি ও পাঠ্যক্রম নির্বাচন, শিক্ষক নিয়োগ, আর্থিক ব্যবস্থাপনা, শিক্ষার্থী ভর্তি— সবই চলছে কর্তৃপক্ষের খেয়ালখুশি মতো। প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে শিক্ষার মান নিশ্চিত করা নয়, বরং অর্থ উপার্জনটাই মুখ্য হয়ে উঠেছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কোর্স শিক্ষকই একমাত্র প্রশ্নপত্র প্রণেতা এবং উত্তরপত্র মূল্যায়ন করে থাকেন। শিক্ষার্থীরা কি শিখছে সেদিকে কোন নজর নেই কর্তৃপক্ষের। অর্থ ব্যয় হচ্ছে আইন অনুযায়ী ‘অলাভজনকভাবে পরিচালিত’ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ডের পেছনে। অথচ শিক্ষার পরিবেশ সৃষ্টি, শিক্ষা উপকরণ, গ্রন্থাগার, যোগ্য শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে বরাদ্দ কম।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সঠিক নজরদারির অভাবে এমনটি হচ্ছে। আর মান যাচাইয়ের জন্য বিধিমালা তৈরির কাজও চলছে শ্লথগতিতে। এই বিধিমালা হলে অন্তত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মান গ্রেডিং করা যেত।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে নেই কোন জবাবদিহিতা। শাখা ক্যাম্পাস খুলে ব্যবসা পরিচালনার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়া এবং মালিকানা দ্বন্দ্ব নিরসনই যেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) প্রধান ও একমাত্র দায়িত্ব। যদিও এ ক্ষেত্রে ইউজিসি বার বার ব্যর্থ হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের মান বৃদ্ধি, শিক্ষক নিয়োগ, ছাত্র ভর্তি, সিলেবাস, খাতা মূল্যায়ন, পরীক্ষা পদ্ধতি, আর্থিক ব্যয়ের অনিয়মের দিকে ইউজিসির নজর নেই। আর এই সুযোগটাই নিচ্ছে বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়।
ইউজিসি’র তথ্য অনুযায়ী, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পূর্ণকালীন শিক্ষক আট হাজার ১৭৮ জন, খণ্ডকালীন শিক্ষক তিন হাজার ৯৩৫ জন। পূর্ণকালীন অধ্যাপক ৬২৩ জন, খণ্ডকালীন অধ্যাপক  এক হাজার ৬৬ জন। বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে পার্ট টাইম শিক্ষকই ভরসা।
বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাল মানের শিক্ষকও নেই। বেশি অর্থ ব্যয় করতে হয় বিধায় ভাল মানের শিক্ষকও নিতে রাজি নয় কর্তৃপক্ষ। শিক্ষক নিয়োগ হয় ট্রাস্টি বোর্ডের ইচ্ছেমতো। শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রে কোন পরীক্ষা নেয়া বা মান যাচাই হয় না। টাকা আয়ের জন্য বছরের যে কোন সময়েই ভর্তি নেয়া হয়। কর্তৃপক্ষের ইচ্ছেমতো সিলেবাস তৈরি করে শিক্ষার্থীদের পড়ানো হয়। 
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে আর্থিক কোন জবাবদিহিতা নেই। বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয় এখন পারিবারিকভাবে পরিচালিত হয়। কোন কোন বিশ্ববিদ্যালয় ট্রাস্টি বোর্ডের খেয়ালখুশি মতো চলছে। ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্যরা অনৈতিকভাবে পরিচালক হয়ে মাস শেষে বেতন নিচ্ছেন, যা আইন বিরোধী ও অনৈতিক। অথচ ভালো মানের গ্রন্থাগার, শিক্ষা উপকরণ ক্রয়ে নেই কোন সদিচ্ছা। মাস শেষে টাকা হয় ভাগবাটোয়ারা।
রাজধানীর একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ডের সভাপতি প্রতি মাসে নিচ্ছেন ৪ লাখ টাকা, ভাইস চেয়ারম্যান ও একজন সিনিয়র সদস্য নিচ্ছেন ২ লাখ করে। এছাড়া ট্রাস্টি বোর্ডের সব সদস্যই কোন না কোন অযুহাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের কাছ থেকে উত্তোলিত টিউশন ফি থেকে আদায় করা অর্থ ভাগ করে নিচ্ছেন। অথচ টাকা নেই এমন অযুহাতে চাহিদা অনুযায়ী শিক্ষা উপকরণ কেনা হচ্ছে না। ভালো মানের শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয়নি। পার্ট টাইম শিক্ষকই বিশ্ববিদ্যালয়টির ভরসা।
প্রতিষ্ঠানটির উদাহরণ টেনে ইউজিসির এক কর্মকর্তা বলেন, এভাবে ট্রাস্টি বোর্ড চললে শিক্ষার মান ভালো হবে কিভাবে? রাজধানীর ধানমন্ডি ও টঙ্গীতে দুইটি বিশ্ববিদ্যালয় চলছে পারিবারিকভাবে। পরিবারের সদস্যরা ট্রাস্ট্রি বোর্ডের সদস্য হয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয় দুইটির শিক্ষার মান নিয়ে রয়েছে নানা প্রশ্ন।
ইউজিসির বিভিন্ন সময় প্রকাশিত প্রতিবেদনেও শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। ইউজিসি জানিয়েছে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রচলিত পরীক্ষা পদ্ধতি সম্পর্কে কমিশন ওয়াকিবহাল নয়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কোর্স শিক্ষকই একমাত্র প্রশ্নপত্র প্রণেতা এবং উত্তরপত্র মূল্যায়ন করে থাকেন। একজন বহিরাগত বিশেষজ্ঞ দ্বারা প্রশ্নপত্রের মান এবং মূল্যায়নের যথার্থতা যাচাই করার পদ্ধতি প্রবর্তন করা জরুরি বলে ইউজিসি জানিয়েছে।
সমপ্রতি উত্তরা ইউনিভার্সিটির এক সমাবর্তন অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি মো: আব্দুল হামিদ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার মান বাড়ানোর তাগিদ দিয়ে বলেছেন, দেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয় এখনো সঠিক জ্ঞান-চর্চার কেন্দ্র হয়ে গড়ে উঠতে পারেনি। এখানকার পরীক্ষা পদ্ধতিতে যে ফল পাওয়া যায় তা আহরণ করা ফল; ফলন করা ফল নয়। তিনি বলেন. এমনতরো শিক্ষার প্রতি শিক্ষার্থীদের লোভ আছে, ভক্তি নেই। আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে জ্ঞানের মহাতীর্থে পরিণত করতে না পারলে উচ্চশিক্ষার যে মূল আদর্শ এবং লক্ষ্য তা অর্জন সম্ভব হবে না। এসব প্রতিষ্ঠান তখন সার্টিফিকেট প্রদান সর্বস্ব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে।
ইউজিসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক এ কে আজাদ চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেছেন, মানসম্মত উচ্চশিক্ষার পূর্বশর্ত হচ্ছে মানসম্মত ও বিশ্বমানের কারিকুলাম আর এর শিক্ষক শ্রেণি। কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় খুবই ভালো করছে। কিন্তু অনেকের বিরুদ্ধেই এদিকে নজর না দেয়ার অভিযোগ রয়েছে।
শিক্ষাবিদ অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন, যে প্রক্রিয়ায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন দেয়া হচ্ছে এবং চলছে তাতে শিক্ষার মান ভালো হওয়া সম্ভব নয়। তিনি বলেন, আমাদের আগে জানতে হবে কতগুলো বিশ্ববিদ্যালয় দেশে দরকার। জাতীয় সংলাপের মাধ্যমে এটি নির্ধারণ করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য কী হবে, এটাও নির্ধারণ করতে হবে। এটাও নিশ্চিত করতে হবে বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে কর্তৃপক্ষ বাণিজ্য করবে নাকি তারা শিক্ষার্থীদের পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসাবে তৈরি করবে। শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য সরকারের রাজনৈতিক স্বদিচ্ছা থাকতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় এখন ব্যাংক, ক্লিনিকের মতো হয়ে যাচ্ছে। যা শিক্ষার মানের জন্য ক্ষতিকর।
ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক আতফুল হাই শিবলী বলেন, ভালো মানের শিক্ষক, শিক্ষা উপকরণ না দিলে শিক্ষার মান ভালো হবে কীভাবে। তিনি বলেন, শিক্ষার মান নিয়ে অনেক কথা হয়েছে। এখন আমরা শিক্ষার মান যাচাইয়ের চেষ্টা করছি। যতদিন এক্রেডিটেশন কাউন্সিল না হয় ততদিন আমরা নিজেরাই মান যাচাই করবো। এক্রেডিটেশন কাউন্সিল এখনও হচ্ছে না কেন এ বিষয়ে তিনি বলেন, ২০১০ সালে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন করার পরই এটি তৈরি করা হয়েছে। আমরা মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছি। এখন এর অগ্রগতির বিষয় মন্ত্রণালয়ই ভালো বলতে পারবে।
ইউজিসির উচ্চশিক্ষা মানোন্নয়ন প্রকল্পের কোয়ালিটি এস্যুরেন্স ইউনিটের প্রধান অধ্যাপক মেজবাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, অনেকগুলো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মান খারাপ। এর কারণ হলো তারা ভালো মানের শিক্ষক নিয়োগ দিতে চায় না। ব্যবসার দিকে তাদের ঝোঁক বেশি। তবে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান উন্নয়নে কাজ শুরু করেছি।
ঝুলে আছে অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০১০-এর ধারা ৩৮ অনুসারে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মান পর্যবেক্ষণে একটি অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল গঠনের কথা বলা আছে। এ লক্ষ্যে সরকার একটি ‘অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল’ গঠন করবে।  প্রস্তাবিত এ কাউন্সিল হবে জাতীয়, স্বাধীন ও স্বায়ত্তশাসিত। যার মূল লক্ষ্যই থাকবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মান পর্যবেক্ষণের পর তাদের মান সনদ প্রদান। এতে শিক্ষার্থীরা যেমন রক্ষা পাবে, তেমনি ভুয়া ও মানহীন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ইউজিসি শনাক্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে পারবে। জাতীয় শিক্ষানীতিতে উচ্চশিক্ষার মান নিয়ন্ত্রণের জন্য অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল গঠনের নির্দেশনা রয়েছে। মূলত ২০০৩ সাল থেকে সরকার এ কাউন্সিল গঠনের কার্যক্রম শুরু করতে চেয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘ দিনেও এটি চূড়ান্ত করতে পারেনি মন্ত্রণালয়।