জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির আব্দুস সুবহানের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধকালে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায় যেকোনো দিন ঘোষণা করা হবে।
উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে বৃহস্পতিবার বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বাধীন যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ রায় ঘোষণা অপেক্ষমাণ (সিএভি) রাখেন। এ নিয়ে দুই ট্রাইব্যুনালে মোট চারজনের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের মামলার রায় ঘোষণা অপেক্ষমাণ রইলো। একাত্তরে হত্যা, গণহত্যা, অপহরণ, আটক, নির্যাতন ও লুটপাটের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের নয়টি অভিযোগ রয়েছে সুবহানের বিরুদ্ধে।
রাষ্ট্রপক্ষে সমাপনী যুক্তি উপস্থাপন করেন প্রসিকিউটর ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ।
আর সুবহানের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করেন তার আইনজীবী ব্যারিস্টার এহসান এ সিদ্দিকী। আসামির বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ প্রমাণ হয়েছে দাবি করে ট্রাইব্যুনালে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ড চেয়েছে রাষ্ট্রপক্ষ।
আসামিপক্ষের দাবি সুবহানের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ প্রমাণ হয়নি। অভিযোগ থেকে তিনি খালাস পাবেন বলে তারা প্রত্যাশা করছেন।
গত বছরের ১৯ সেপ্টেম্বর সুবহানের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) আমলে নেয় ট্রাইব্যুনাল। ঐ বছরের ৩১ ডিসেম্বর সুবহানের বিরুদ্ধে নয়টি অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে মামলার বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়।
এরপর চলতি বছরের ৭ এপ্রিল থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সুবহানের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষে মোট ৩১ জন সাক্ষ্য দেন। তবে আসামিপক্ষে কেউ সাফাই সাক্ষ্য দেননি।
এর আগে ২০১২ সালের ২০ সেপ্টেম্বর পাবনার একটি ফৌজদারি মামলায় সুবহানকে বঙ্গবন্ধু সেতুর টোল প্লাজা থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গ্রেফতার করে। ২৩ সেপ্টেম্বর তাঁকে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আটক দেখানো হয়। ওই সময় থেকে তিনি কারাগারে আটক আছেন।
সুবহানের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগে বলা হয়, পাবনা সদরের সাবেক এই সংসদ সদস্য ১৯৩৬ সালে সুজানগর থানার মানিকহাটি ইউনিয়নের তৈলকুণ্ডি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
পাকিস্তান আমলে তিনি পাবনা জেলা জামায়াতের আমির ও কেন্দ্রীয় শুরা সদস্য। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পর তিনি পাবনা জেলা শান্তি কমিটির সেক্রেটারি এবং পরে ভাইস-প্রেসিডেন্ট হন। তার নেতৃত্বে পাবনা জেলার বিভিন্ন থানায় শান্তি কমিটি, রাজাকার, আলবদর, আলশামস বাহিনী গঠিত হয়।
সুবহানের বিরুদ্ধে নয় অভিযোগ
সুবহানের বিরুদ্ধে প্রথম অভিযোগ হলো, ১৯৭১ সালের ১৭ থেকে ১৮ এপ্রিল সুবহান ও তার সহযোগীরা পাবনার ঈশ্বরদী পৌরসভার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে আশ্রয় নেয়া স্বাধীনতাকামী লোকদের অপহরণ করে হত্যা করেন। দ্বিতীয় অভিযোগ হলো, একাত্তরের ১৩ এপ্রিল তার নেতৃত্বে ও উপস্থিতিতে স্বাধীনতা বিরোধীরা ঈশ্বরদী যুক্তিতলা গ্রামে অভিযান চালিয়ে লুটপাটসহ ব্যাপক ক্ষতিসাধন করে হত্যাযজ্ঞ চালায়। তৃতীয় অভিযোগ হলো, ১৯৭১ সালের এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে ও ১৬ থেকে ১৯ মে ঈশ্বরদী অরণখোলা গ্রামে লুটপাট, অগ্নিসংযোগ দুই জনকে অপহরণ করে জেলা পরিষদ ডাক বাংলো নিয়ে নির্যাতন।
চতুর্থ অভিযোগে বলা হয়েছে, একাত্তরের ২ মে সুবহানের নেতৃত্বে পাকিস্তানি সেনারা ঈশ্বরদীর সাহাপুর গ্রামে অভিযান চালিয়ে অসংখ্য বাড়িঘরের মালামাল লুটপাট করে বাড়িঘর আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয় এবং বেশ কয়েকজন লোককে হত্যা করে।
পঞ্চম অভিযোগে বলা হয়েছে, ১১ মে পাবনা সদর থানার দোগাছি গ্রামের হরিপদ সাহার বাড়ি, দোগাছি বাজার, চাঁদ আলী প্রামাণিকের বাড়ি ও কুলুনিয়া গ্রামে হত্যাযজ্ঞ ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এসব অপরাধের সঙ্গে পাকিস্তানি সেনাদের পাশাপাশি সুবহানের সংশ্লিষ্টতা ছিল।
ষষ্ঠ অভিযোগ হলো, ১৯৭১ সালের ১২ মে সুবহানের নেতৃত্বে রাজাকাররা ও পাকিস্তানি সেনারা সুজানগর থানাধীন সাতবাড়িয়া ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামে অভিযান চালায়। এ অভিযানে প্রায় চারশ’ লোক গণহত্যার শিকার হয়।
সপ্তম অভিযোগে বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালের ২০ মে সুবহানের নেতৃত্বে রাজাকাররা ও পাকিস্তানি সেনারা পাবনা সদর থানাধীন ভাড়ারা গ্রামে অভিযান চালিয়ে ১৮ জন নিরীহ লোককে অপহরণ করে। তাদের কয়েক জনের লাশ পাওয়া গেলেও বাকিদের খোঁজ পাওয়া যায়নি।
অষ্টম অভিযোগ হলো, সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহের কোনো একদিন পাবনার আতাইকুলা থানার দুবলিয়া বাজারের গোবিন্দের চায়ের দোকান থেকে কলিমউদ্দিন খাঁসহ দুই জনকে অপহরণের পর নির্যাতন ও হত্যা। এবং নবম অভিযোগ হলো ৩০ অক্টোবর ঈশ্বরদী থানার বেতবাড়িয়া গ্রামের সফিউদ্দিন প্রামাণিকের বাড়ি, রামনাথপুর গ্রামের সাবেদ আলীর বাড়িসহ বিভিন্ন জায়গায় লুণ্ঠন ও অগ্নিসংযোগ করে পাকিস্তানি সেনরা। এর সঙ্গে সুবহানের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।
