গণতন্ত্রের মানসপুত্র, উপমহাদেশের প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ৫১তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। বরেণ্য এ নেতা ১৯৬৩ সালের ৫ ডিসেম্বর লেবাননের বৈরুতে একটি হোটেল কক্ষে মারা যান। ঢাকার হাইকোর্টের পাশে তিন নেতার মাজারে তার সমাধি। সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতকাল বৃহস্পতিবার পৃথক বাণী দিয়েছেন। তার স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে উভয়েই এই নেতার বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন।
হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ছিলেন একাধারে প্রতিভাবান রাজনৈতিক সংগঠক, আইনজ্ঞ, বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভা ও গণপরিষদের সদস্য, অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রীসহ তত্কালীন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পর বাঙালির মধ্যে যে জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষ ঘটেছিল, তার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তিনি। তার রাজনৈতিক দূরদর্শিতার ফল ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে অবিস্মরণীয় বিজয়। গণতান্ত্রিক রীতি ও জনমতের প্রতি সর্বদা শ্রদ্ধাশীল থাকায় সুধী সমাজের কাছে তিনি ‘গণতন্ত্রের মানসপুত্র’ হিসাবে আখ্যায়িত হন।
শহীদ সোহরাওয়ার্দী পাকিস্তানের সামরিক স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে এদেশের শান্তিপ্রিয় গণতন্ত্রকামী মানুষের আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকে তিনি মুসলিম লীগ সরকারের একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী ভূমিকা পালন করেন। তত্কালীন পাকিস্তান সরকারের গণবিরোধী কার্যকলাপের বিরুদ্ধে তিনি এদেশের জনগণকে সোচ্চার ও সংগঠিত করেছিলেন। কেবল একজন রাজনৈতিক নেতাই নন, তিনি ছিলেন একজন দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়কও। তার প্রচেষ্টার ফল হিসাবেই ১৯৬৫ সালে পাকিস্তানের প্রথম সংবিধান প্রণীত হয়।
বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের মেদিনীপুরের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে ১৮৯২ সালের ৮ সেপ্টেম্বর হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন কলকাতা হাইকোর্টের খ্যাতনামা বিচারপতি স্যার জাহিদ সোহরাওয়ার্দীর কনিষ্ঠ সন্তান। তিনি কলকাতার আলিয়া মাদ্রাসায় শিক্ষাজীবন শুরু করার পর যোগদেন সেইন্ট জেভিয়ার্স কলেজে। সেখান থেকে বিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর তিনি মায়ের অনুরোধে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আরবি ভাষা এবং সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯১৩ সালে তিনি যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজ্ঞান বিষয়ে সম্মানসহ স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। এছাড়া সেখানে আইন বিষয়ে পড়াশোনা করেন। ১৯১৮ সালে ‘গ্রেস ইন’ হতে ‘বার এট ল’ ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর ১৯২১ সালে কলকাতায় ফিরে এসে আইন পেশায় নিয়োজিত হন। ১৯২০ সালে তিনি বেগম নেয়াজ ফাতেমাকে বিয়ে করেন। নেয়াজ ফাতেমা ছিলেন তত্কালীন ব্রিটিশ ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্যার আবদুর রহিমের কন্যা।
রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর বাণী: রাষ্ট্রপতি তার বাণীতে বলেন, বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ইতিহাসে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এক উজ্জ্বল নাম। বর্ণাঢ্য কর্মজীবনে শ্রমিক ও মেহনতি মানুষসহ অবহেলিত মুসলিম সম্প্রদায়ের স্বার্থ রক্ষায় তত্পর ছিলেন তিনি। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, বিকাশ ও এই অঞ্চলের জনগণের আর্থসামাজিক উন্নয়নে তিনি যে অবদান রেখে গেছেন, তা জাতি শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে।
প্রধানমন্ত্রী তার বাণীতে বলেন, উপমহাদেশের মুসলমান সমাজের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষার সংগ্রামে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ছিলেন উচ্চকণ্ঠ। মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং অসামপ্রদায়িক রাজনীতি বিকাশে তিনি আজীবন কাজ করেছেন। গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রায় ও রাজনৈতিক সঙ্কট নিরসনে এ মহান নেতার জীবন ও আদর্শ আমাদের প্রেরণা জোগাবে।
জেপির বিবৃতি: হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে জাতীয় পার্টির (জেপি) চেয়ারম্যান পরিবেশ ও বন মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এবং মহাসচিব ও সাবেক মন্ত্রী শেখ শহীদুল ইসলাম গতকাল এক যৌথ বিবৃতিতে বলেন, সোহরাওয়ার্দী ছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের অন্যতম স্বপ্নদ্রষ্টা এবং আমৃত্যু তিনি এ দেশের মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করেছেন। এই মহান নেতা গণতন্ত্র ও মানবাধিকার প্রশ্নে কোন আপস করেননি। তার রেখে যাওয়া আদর্শ হলো গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা ও সাংবিধানিক ধারাকে চালু রাখা। নেতৃদ্বয় সোহরাওয়ার্দীর স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা নিবেদন এবং তার রূহের মাগফিরাত কামনা করেন।
জাতীয় পার্টির (জেপি) পক্ষ থেকে আজ শুক্রবার সকাল সাড়ে ৮টায় মরহুমের মাজারে জিয়ারত, ফাতেহা পাঠ ও পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করা হবে।
