ছয় দশক পর দুয়ার খুলছে ছিটমহলের

আপডেট : ০৬ ডিসেম্বর ২০১৪, ০৯:৪৪

অধিবাসীদের মিষ্টি বিতরণ

 
দুই দেশের সীমান্তের বহু বিষয়ের সমাধান হবে
 
বঞ্চিতরা পাবেন নাগরিক অধিকার
 
 মোট ভূমি ২৪ হাজার ২৬৮ একর
 
দুই দেশের ছিটমহলে জনসংখ্যা ৫১ হাজার
ছয় দশক পর বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে ছিটমহল বিনিময়ের জটিলতার অবসান হতে চলেছে। দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ে ছিটমহল বিনিময় নিয়ে অচিরেই ঘোষণা হতে পারে। ছিটমহল বিনিময় নিয়ে বিশেষ করে স্থল চুক্তি বিষয়ে ভারতের সংবিধান সংশোধীন প্রস্তাবটি আটকে ছিল। সম্প্রতি ভারতের লোকসভার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত স্থায়ী কমিটিতে ঐ সংবিধান সংশোধনী অনুমোদিত হয়। ভারতের আগামী সংসদ অধিবেশনের উচ্চকক্ষ রাজ্যসভায় পেশ করা হবে স্থল সীমা চুক্তির সংবিধান সংশোধনী বিলটি। দুই দেশের উচ্চ পর্যায়ের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ আশা করছে, এই সংশোধনী বিলটি পাস হলে ছিটমহল বিনিময়ের চূড়ান্ত কাজটি সম্পন্ন হবে।
ভারত বাংলাদেশ ছিটমহল বিনিময় কার্যক্রম এবং ছিটমহলের বাসিন্দাদের পুনর্বাসনের বিষয় নিয়ে দিল্লিতে আগামী ১১ ডিসেম্বর বসছে বৈঠক। বৈঠকে পশ্চিমবঙ্গের পক্ষে যোগ দেবেন রাজ্যের মুখ্য সচিব সঞ্জয় মিত্র ও স্বরাষ্ট্র সচিব বাসুদেব বন্দ্যোপাধ্যায়। স্বরাষ্ট্র সচিব বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের বলেছেন, পুনর্বাসন প্যাকেজ চূড়ান্ত করেই ছিটমহল সমস্যার সমাধান হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. শাহিদুজ্জামান ইত্তেফাককে বলেন, এই ছিটমহল বিনিময় হলে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের অনেক উন্নয়ন ঘটবে। এর দীর্ঘমেয়াদী সুফল ভোগ করবে দুই দেশ। ছিটমহলবাসীরা তাদের নাগরিক অধিকার ফিরে পাবেন।
ছিটমহল বিনিময়ের বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করছে দুই দেশের যৌথ সীমান্ত ওয়ার্কিং গ্রুপ (জেবিডব্লিউজি)। ইতোমধ্যে কয়েকটি বৈঠক করে দুই দেশের স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পর্যায়ে জমির দলিল ও অন্যান্য কাগজপত্র হস্তান্তরও হয়েছে। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আজিজ আহমেদ বলেন, দুই দেশের মধ্যে ছিটমহল বিনিময় হলে, সীমান্তের অনেক সমস্যার সমাধান হবে। বিশেষ করে দুই দেশের সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ করতে অনেক সহজ হবে।
 
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ছিমহলের সংখ্যা ১৬২। ছিটমহল মানে ভারতের ভিতরে বাংলাদেশের আর বাংলাদেশের ভিতরে ভারতীয় ভূখন্ড। আবার এমনও আছে, বাংলাদেশের ভিতরে ভারত, তার ভিতরে আবার বাংলাদেশ। কুড়িগ্রামে ভারতের ছিটমহল দাশিয়ারছড়া। দাশিয়ারছড়ার ভিতরেই আছে চন্দ্রখানা নামের বাংলাদেশের একটি ছিটমহল। মোট ছিটমহলের মধ্যে ভারতের ১১১টি ছিটমহল আছে বাংলাদেশে। আর বাংলাদেশের ৫১টি ছিটমহল ভারতে। ২০১১ সালের জনগণনা অনুযায়ী, ভারতের ছিটমহলে বসবাসরত লোকসংখ্যা ৩৭ হাজার এবং বাংলাদেশের ছিটমহলের লোকসংখ্যা ১৪ হাজার। ২৪ হাজার ২৬৮ একর ভূমি নিয়ে দুই দেশের ছিটমহল। তার মধ্যে ভারতের ১৭ হাজার ১৫৮ একর। বাংলাদেশের ছিটমহলের জমির পরিমাণ ৭ হাজার ১১০ একর। ভারতের ছিটমহলের মধ্যে লালমনিরহাটে ৫৯, পঞ্চগড়ে ৩৬, কুড়িগ্রামে ১২ ও নীলফামারীতে ৪টি। বাংলাদেশের ৫১টি ছিটমহলের অবস্থান ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে।
১৯৪৭ সালে বাংলা ও পাঞ্জাবের সীমারেখা টানার পরিকল্পনা করেন লর্ড মাউন্টব্যাটেন। তার পরিকল্পনা অনুযায়ী ব্রিটিশ আইনজীবী সিরিল রেডক্লিফকে প্রধান করে সে বছরই গঠন করা হয় সীমানা নির্ধারণের কমিশন। ১৯৪৭ সালের ৮ জুলাই লন্ডন থেকে ভারতে আসেন রেডক্লিফ। মাত্র ছয় সপ্তাহের মাথায় ১৩ আগস্ট তিনি সীমানা নির্ধারণের চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেন। এর তিন দিন পর ১৬ আগস্ট জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয় সীমানার মানচিত্র। ১৯৪৭ সালে রেডক্লিফের মানচিত্র বিভাজন থেকেই উদ্ভব ছিটমহলের।
এদিকে, গত বৃহস্পতিবার পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহার জেলার করলা ছিটমহলে এক জনসভায় পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী ছিটমহল বিনিময়ের সম্মতি দেন। এতে তিনি বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে স্থল সীমা চুক্তি অনুযায়ী ছিটমহল বিনিময়ে রাজ্য সরকারের আপত্তি নেই। এই অনাপত্তি তিনি কেন্দ্রীয় সরকারকে জানিয়ে দিয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্য মন্ত্রীর এমন ঘোষণার পর বাংলাদেশের কূটনৈতিক মহল ধারণা করছে, ছিটমহল বিনিময়ের যে প্রতিবন্ধকতা তা আর সামনে রইল না।
পশ্চিমবঙ্গে মুখ্য মন্ত্রীর এমন ঘোষণার পর বাংলাদেশের অভ্যন্তরে অবস্থিত ভারতের ১১১টি ছিটমহলের জনগণের মধ্যে খুশি জোয়ার বইছে। ছিটমহল অধিবাসীরা মিষ্টি বিতরণ করেছে। গতকাল শুক্রবার ছিটমহলের বিভিন্ন মসজিদে জুম্মার নামাজের পর শুকরিয়া মোনাজাত হয়েছে। আমাদের পঞ্চগড় প্রতিনিধি জানান, পঞ্চগড় সদর উপজেলার গারাতি এবং বোদা উপজেলা শালবাড়ি ছিটমহলে প্রায় আড়াই হাজার পরিবার বসবাস করেন। দীর্ঘ আন্দোলনের পর বৃহস্পতিবার মমতার নমনীয়তায় নতুন করে আশার আলো দেখছেন এই ছিটমহলের নাগরিকরা। তারা ছিটমহলের বিভিন্ন মসজিদে জুম্মার নামাজের পর শুকুরিয়া মোনাজাত করেছেন।
কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি ও ফুলবাড়ী  সংবাদদাতা জানান, ফুলবাড়ী উপজেলায় ভারতের ছিটমহল দাছিয়ারছড়ায় গিয়ে দেখা গেছে, নারী ও পুরুষদের মধ্যে খুশির জোয়ার বইছে। জনসভায় মমতা ব্যানার্জির বক্তব্য মোবাইল ফোনে রেকর্ড করে অনেকে প্রকাশ্যে বাজিয়ে শোনাচ্ছেন।

ভারতীয় ছিটমহল দাসিয়ের ছড়ার এছাহাক আলী (৭০), গৃহবধূ রাহেলা বেগম (৪৫), আলেকজন বেওয়া (৫০) জানান, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাদের সমস্যা বুঝেই সম্মতি দিয়েছেন। এখন বলতে পারবেন তারা বাংলাদেশের নাগরিক। স্বাস্থ্য, চিকিত্সাসহ যোগাযোগের আমুল পরিবর্তন হবে। প্রসূতিদের আর অকালে মৃত্যুবরণ হবে না। ভারত-বাংলাদেশ ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটির ভারতীয় অংশের সহ-সাধারণ সম্পাদক দীপ্তিমান সেনগুপ্ত মোবাইল ফোনে জানান, মমতার বন্দোপাধ্যায় সমাবেশে ঘোষণার পর পরেই ১৬২টি ছিটমহলে আনন্দের জোয়ার ও মিষ্টি বিতরণ চলছে। বাংলাদেশ ইউনিটের সভাপতি মইনুল হক ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা খান জানান, আমরা অপেক্ষা করছি কবে এই বন্ধ দুয়ার খুলবে।