‘জনতার মঞ্চের’ আদলে আন্দোলন চাচ্ছে বিএনপি

আপডেট : ০৭ ডিসেম্বর ২০১৪, ০০:৪৮

বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে বৃহস্পতিবার রাতে তার গুলশান কার্যালয়ে কতিপয় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর বৈঠক নিয়ে এক ধরনের ধূম্রজাল সৃষ্টি হয়েছে। বিএনপির পক্ষ থেকে দলের মুখপাত্র-ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গতকাল আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে এই ধরনের বৈঠকের কথা সম্পূর্ণ নাকচ করেছেন। তবে দলের অন্য একাধিক নেতার মন্তব্য এবং ভেতরের সূত্রগুলোর তথ্য বলছে-বৈঠকটি হয়েছে।  

এই তথ্যদাতা সূত্রগুলোর দাবি, ১৯৯৬ সালে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাংশ ‘জনতার মঞ্চ’ তৈরি করে যেভাবে তত্কালীন সরকারকে অসহযোগিতার মাধ্যমে প্রশাসন অচল করে তুলেছিলেন, বিএনপিও এবার একই আদলে প্রশাসনের ভেতরেই সরকারবিরোধী আন্দোলন ছড়িয়ে দিতে চায়। এর অংশ হিসেবেই বৃহস্পতিবার ওই বৈঠক হয়, যাকে কেউ কেউ ইতিমধ্যে গুলশান ষড়যন্ত্র হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের প্রায় ছয় বছর এবং এর আগে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দুই বছরে সরকারি যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারী রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে ওএসডি, পদোন্নতি বঞ্চিত কিংবা নানাভাবে উপেক্ষা-অবহেলা-বঞ্চনার স্বীকার হয়েছেন তাদের একটি প্ল্যাটফর্মে আনার জন্য বেশ কিছুদিন ধরেই ভেতরে-ভেতরে কাজ করছে বিএনপি। তাদের সংগঠিত করার জন্য সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সমন্বয়ে দলটির একটি গোপন সেলও রয়েছে। বঞ্চিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পুঞ্জীভূত ক্ষোভকে সামনের সরকারবিরোধী আন্দোলনে কাজে লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে বিএনপির।
পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই বিএনপি সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিভিন্ন স্তরে যোগাযোগ রক্ষা করছে। বৃহস্পতিবার রাতের বৈঠকটি এটিরই একটি অংশ ছিল বলে মনে করা হচ্ছে। সূত্র মতে, যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারী খালেদা জিয়ার সঙ্গে বৈঠক করেছেন, তারা এর আগে বিএনপির আরও কয়েকজন নেতার সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেন। ওইসব বৈঠকের ধারাবাহিকতায় বৃহস্পতিবার তারা খালেদা জিয়ার সঙ্গে বসেন।
বৈঠকটি হয়েছে বলে তথ্য দেয়া বিএনপির একাধিক নেতা জানান, পাঁচ জানুয়ারির নির্বাচনের আগের আন্দোলন ব্যর্থ হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ ছিল-প্রশাসন পুরোপুরি সরকারের আয়ত্তে থাকা। প্রশাসনে সরকারবিরোধী কোনো অবস্থান তৈরি করতে না পারায় মাঠের আন্দোলনে ফল আসেনি। মাঠের আন্দোলনের সঙ্গে সরকারের প্রতি প্রশাসনের অসহযোগিতা যুক্ত করতে পারলেই আন্দোলন সফলতা পায়। এই সমীকরণ থেকেই এবার রাজপথের আন্দোলনের সমান্তরালে প্রশাসনকেও অচল করার চেষ্টা করা হবে। সেক্ষেত্রে বিএনপি-জামায়াত সমর্থকসহ সরকারের ওপর ক্ষুব্ধ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সংগঠিত করার চেষ্টা চলছে। সময়মতো তারা যেন ‘জনতার মঞ্চের’ আদলে সরকারবিরোধী আন্দোলনে সামিল হন, এখন থেকে সেই প্রস্তুতিও নেয়া হচ্ছে। বিএনপির এই নেতাদের মতে, পরিকল্পনা ঠিক থাকলে এসব কর্মকর্তা-কর্মচারী তখন যার যার অবস্থান থেকে সরকারকে অসহযোগিতার ক্ষেত্র প্রস্তুতে ভূমিকা রাখবে।
তবে শুক্রবারের বক্তব্য-বিবৃতিতে এবং গতকাল আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে বৃহস্পতিবারের বৈঠকের কথা অস্বীকার করেছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেছেন ‘দেশের মানুষের দৃষ্টি ভিন্নদিকে ঘুরিয়ে দিতেই এই ধরনের একটি বৈঠকের কথা ছড়িয়ে সরকার বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে।’ তিনি বলেন, ষড়যন্ত্র করে ক্ষমতায় যাওয়ার ইতিহাস বিএনপির নয়, আওয়ামী লীগের রয়েছে।
মির্জা ফখরুল অস্বীকার করলেও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়ার বক্তব্য বৈঠকের সত্যতাই ইঙ্গিত করে। শুক্রবার এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেছেন ‘সরকার পরিচালনায় যারা অভিজ্ঞ, দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে তারাও অনেকে বিবেকের তাড়নায় এখন খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করছেন, কথা বলছেন-এটা দোষের কিছু নয়।’
আর বৃহস্পতিবার রাতের বৈঠকের সত্যতার কিছু সূত্র মেলে বিএনপি চেয়ারপারসনের প্রেস সচিব মারুফ কামাল খান সোহেলের বক্তব্যেও। শুক্রবার তিনি সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘জনতার মঞ্চ হয়েছিল কীভাবে? তখন যদি সার্ভিস রুল ভঙ্গ না হয়, তাহলে এখন কেউ দেখা করলে সার্ভিস রুল ভঙ্গ হওয়ার কথা আসছে কেন?’
এদিকে, খালেদা জিয়ার সঙ্গে কতিপয় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর বৈঠকের খবরে তত্পর সরকারের বিভিন্ন সংস্থাও। বৈঠক হয়েছি কিনা-এর সত্যতা বের করার পাশাপাশি বৈঠকে অংশগ্রহণকারীদের বিষয়ে ইতিমধ্যে একযোগে গোপন তদন্ত শুরু হয়েছে। শুক্রবার গণভবনের সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, আইন নিজস্ব গতিতে চলবে। জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ইসমত আরা সাদেকও বলেছেন, এই ধরনের বৈঠকের সত্যতা মিললে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নেয়া হবে।

অন্যদিকে, এই ধরনের বৈঠক নিয়ে বিএনপিতেও ভিন্নমত রয়েছে। দলটির উদারপন্থী নেতাদের মতে, যদি এই ধরনের বৈঠক হয়েও থাকে, তাহলে এর মাধ্যমে বরং খালেদা জিয়াকেই খাটো করা হয়েছে। কারণ সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যেই স্তর উল্লেখ করা হয়েছে, তাদের সঙ্গে সরাসরি খালেদা জিয়ার বৈঠক করার কোনো প্রয়োজন ছিল না। তাছাড়া যারা এই বৈঠকের আয়োজন করেছেন, তাদেরও জানা উচিত ছিল, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এভাবে বৈঠক করতে পারেন না।