দক্ষিণ আমেরিকার দেশ পেরুর লিমায় জলবায়ু সম্মেলনের মূল পর্ব শুরু হয়েছে গতকাল সোমবার। গত কয়েকদিনে সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী দেশসমূহের প্রতিনিধিরা বিভিন্ন খাতে আলোচনা এগিয়ে নেন। এসব আলোচনার ভিত্তিতে যেসব খসড়া প্রস্তুত করা হয়েছে তার ওপর আলোচনা করবেন বিভিন্ন দেশের মন্ত্রীরা। উচ্চপর্যায়ের নেগো-সিয়েশনে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব প্রদানের জন্য পরিবেশ ও বন মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু ইতিমধ্যে লিমায় পৌঁছেছেন।
কার্বন নি:সরণ কমানো, জলবায়ু তহবিল ও লস এন্ড ড্যামেজ ফান্ড বিষয়ে একটি বৈশ্বিক সমঝোতায় পৌঁছতে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল, চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ভারতসহ প্রভাবশালী ১০টি দেশের প্রতিনিধিদের নিয়ে বৈঠক করেছেন সম্মেলনের সভাপতি পেরুর পরিবেশমন্ত্রী ম্যানুয়েল পুলগার ভিডাল ও ইউএনএফসিসিসি’র নির্বাহী সেক্রেটারি ক্রিস্টিনা ফিগুইরা। বৈঠক শেষে তারা গণমাধ্যমকে বলেন, শিল্পোন্নত ও স্বল্পোন্নত দেশগুলোর মধ্যে বিরোধ কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। লিমা সম্মেলন কম প্রত্যাশা নিয়ে শুরু হলেও শেষে প্রত্যাশার চেয়েও বেশি কিছু পাওয়ার আশা করছেন তারা।
এদিকে, অভিযোজন খাত নিয়ে উদীয়মান অর্থনীতির জোট বেসিক এবং জি-৭৭ চায়না এখনো ঐকমত্যে পৌঁছতে পারেনি। অন্যদিকে চীন, অষ্ট্রেলিয়া, ভারত, ব্রাজিল ও রাশিয়ার মধ্যে বিরোধ আরো বেড়েছে। রাশিয়া বলছে, এক সময় তারা শিল্পোন্নত ছিল, এখন আর তাদের অবস্থা ভালো নেই। তাই তারা কোনো আইনি বাধ্যবাধকতায় যেতে চায় না। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ২০২৫ সালের মধ্যে বৈশ্বিক তাপমাত্রা ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস কমানোর পক্ষে একমত হয়েছে। সে লক্ষ্যে শিল্পের কার্বন নি:সরণে নিয়ন্ত্রণেও একমত হয়েছে তারা। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ২০২৫ সাল থেকে কার্বন নি:সরণ কমাতে ২০১৫ সালে প্যারিসে বিশ্বের সব রাষ্ট্র মিলে একটি নতুন চুক্তি করার পক্ষে। এই সময়ের মধ্যে জোটটি এডাপেটশনকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
অপরদিকে, ২০০৯ সালে কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত কোপ-১৫ চুক্তির আওতায় শিল্পোন্নত দেশগুলো ক্ষতিপূরণ বাবদ ‘নতুন এবং অতিরিক্ত’ অর্থ হিসেবে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে ২০১০-১২ মেয়াদে ৩০ বিলিয়ন ডলার দেয়ার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত মাত্র ২ দশমিক ১৫ বিলিয়ন ডলার দিয়েছে। তখন ২০১৫ সালের মধ্যে বৈশ্বিক চুক্তি করার ব্যাপারে একমত হলেও এখন এই চুক্তি ২০২৫ সালে নিয়ে যেতে চাচ্ছে শিল্পোন্নত দেশগুলো। এর আগের পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০১৫ সালে চুক্তি হয়ে তা ২০২০ সাল থেকে বাস্তবায়নের কথা ছিল। অবশ্য ক্ষতিগ্রস্ত ও স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জোট এলডিসি এ প্রস্তাবের চরম বিরোধিতা করছে। IMG0
কার্বন নি:সরণ কমানো, জলবায়ু তহবিল ও লস এন্ড ড্যামেজ ফান্ড বিষয়ে একটি বৈশ্বিক সমঝোতায় পৌঁছাতে জোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন ১৯২ দেশের নেতারা। তবে ২০২০ সাল থেকে কার্বন নি:সরণ কমানোর আইনি চুক্তির ভবিষ্যত্ এখনো নড়বড়ে। সম্মেলনের শুরুতেই বিরোধপূর্ণ অবস্থানে থাকা চীন, দক্ষিণ আফ্রিকা, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কানাডা, রাশিয়া, ব্রাজিল, অষ্ট্রেলিয়া, জাপান, সৌদি আরবকে একটা মতৈক্যে পৌঁছানোর চেষ্টা সফল হবে বলে মনে করছে সম্মেলনের আয়োজক দেশ পেরু।
প্রসঙ্গত ডারবান প্ল্যাটফর্ম বিষয়ক খসড়া চূড়ান্ত করার জন্য বাংলাদেশ সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করছে। অর্থায়ন, প্রযুক্তি, লস এন্ড ড্যামেজ ইত্যাদি আলোচনায় বাংলাদেশের প্রস্তাব অন্যান্য দেশের সমর্থনের ভিত্তিতে চূড়ান্ত খসড়ায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। সম্মেলনের প্রথম সপ্তাহ কারিগরি এবং দ্বিতীয় সপ্তাহ মূলত রাজনৈতিক পর্যায়ের। এ পর্যায় থেকেই সরকারসমূহের সামগ্রিক সুচিন্তা ও ঐকমত্যের ভিত্তিতে কারিগরি পর্যায় থেকে প্রাপ্ত সিদ্ধান্তসমূহ চূড়ান্ত করা হবে। উল্লেখ্য, কোপ-২০ নেগোসিয়েশনে মূলত পাঁচ ধারায় আলোচনা চলমান থাকবে। এ পাঁচ ধারা থেকে প্রণীত খসড়াসমূহ হাই-লেভেল সেগমেন্টে উপস্থাপিত ও চূড়ান্ত হবে। ইতিমধ্যে সাবসিডিয়ারি বডি ফর টেকনোলজিক্যাল এডভাইজ বিষয়ক কারিগরি পর্যায়ের খসড়া চূড়ান্ত করা হয়েছে।
