র্যাব-১১ এর তত্কালীন প্রধান লেফটেন্যান্ট কর্নেল তারেক সাঈদ মোহাম্মদ, মেজর আরিফ হোসেন এবং নৌবাহিনীর লেফটেন্যান্ট কমান্ডার এমএম রানাকে দায়ী করে নারায়ণগঞ্জের চাঞ্চল্যকর সাত খুনের ঘটনায় তদন্ত প্রতিবেদন দিয়েছে র্যাব। ওই হত্যাকাণ্ডে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ওঠার আট মাস পর বুধবার এই এলিট বাহিনীর পক্ষ থেকে হাইকোর্টে প্রতিবেদন দেয়া হয়। তবে আদালত বলেছেন র্যাবের প্রতিবেদনটি অসম্পূর্ণ।
উচ্চ আদালতের নির্দেশে গঠিত র্যাব সদর দফতরের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন বুধবার হাইকোর্টে দাখিল করা হয়। বিচারপতি মো. রেজাউল হক ও বিচারপতি গোবিন্দ চন্দ্র ঠাকুরের হাইকোর্ট বেঞ্চে এ প্রতিবেদন দাখিল করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। এর আগে অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে প্রতিবেদন জমা দেন তদন্ত কমিটির প্রধান র্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) ডিআইজি আফতাব উদ্দিন।
অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম সাংবাদিকদের জানান, ঘটনার সময় নারায়ণগঞ্জ র্যাবে থাকা তারেক সাঈদ ও আরিফ সাতজনকে অপহরণ থেকে শীতলক্ষ্যায় লাশ ডুবনো পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় জড়িত ছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আর রানা অপহরণে অংশ নিয়ে ঘটনায় আংশিক জড়িত ছিলেন বলে তাদের তদন্তে এসেছে।
এর আগে র্যাব তিনটি অগ্রগতি প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করেছিল। চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করল। আদালত থেকে বেরিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। সেখানে র্যাবের এই প্রতিবেদন অনুসারে অপরাধীদের তালিকাও পড়ে শোনান তিনি। ‘এরা হচ্ছেন, এসআই পূর্নেন্দু বালা, এবি আরিফ হোসেন, নায়েক নাজিম, নায়েক দেলোয়ার, ল্যান্স নায়েক হিরা মিয়া, সৈনিক মহিউদ্দিন মুন্সী, সৈনিক আব্দুল আলিম, সৈনিক আলামিন, সিপাহী তৈয়ব, কনস্টেবল সিহাবুদ্দিন, কনস্টেবল আলামিন, হাবিলদার এমদাদ, ল্যান্স নায়েক বেলাল হোসেন, সৈনিক আসাদ, সার্জেন্ট এনামুল, এএসআই বজলু, হাবিলদার নাসির, সৈনিক তাজুল।’
‘ঘটনার প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত অর্থ্যাত্ অপহরণ থেকে শুরু করে লাশ নদীতে ডুবানো পর্যন্ত লে. কর্ণেল তারেক সাঈদ মোহাম্মদ, কোম্পানী কমান্ডার মেজর আরিফ হোসেন জড়িত ছিলেন বলে এই তদন্তে প্রাথমিকভাবে প্রতীয়মান হয়। কিন্তু লে. কমান্ডার এএম রানা অপহরণ পর্যন্ত অংশ নিয়ে আংশিক জড়িত ছিলেন বলে এই তদন্তে প্রতীয়মান হয়।’ র্যাবের এই প্রতিবেদন তাদের অভ্যন্তরীণ উল্লেখ কর অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, এই তদন্ত প্রতিবেদন কিন্তু বিচারের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না। বিচার হবে ডিবির তদন্ত ও চার্জশিটের ভিত্তিতে।
ঘটনা সম্পর্কে র্যাব সদরদপ্তর জানতো কি-না, এমন প্রশ্নের জবাবে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, আমি এটা দাখিল করেছি, সদরদপ্তর জানতেন কি-না, সম্পূর্ন প্রতিবেদন পড়ার পরই এটা বোঝা যাবে। পুরো প্রতিবেদন আমার পক্ষে পড়া সম্ভব হয়নি।র্যাব সদরদপ্তর জানতো কি-না, সেটা আদালতের নির্দেশনাও ছিলো না।
সার্বিক তদন্ত কমিটির বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘এই মামলায় গণ-তদন্তের জন্য একটি কমিশন ঠিক করা হয়েছিলো। যাতে বেশ কয়েকজন সদস্য ছিলেন, যাতে চেয়ারম্যান হিসাবে ছিলেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়েল একজন অতিরিক্ত সচিব। তখন অতিরিক্ত সচিব ছিলেন শাহজাহান মোল্লা। সমপ্রতি তাকে পাবলিক সার্ভিস কমিশনে বদলি করা হয়েছে। যেহেতু শাহজাহান মোল্লা আগাগোড়া তদন্তের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, গণশুনানিতে অংশ নিয়েছেন। এ কারণে আদালত নির্দেশ প্রদান করেছেন যে, বাকী কাজটুকুও শাহজাহান মোল্লাকেই সম্পূর্ণ করতে হবে। রিপোর্ট দেয়া পর্যন্ত। উনি যেখানেই যান না কেন, রিপোর্ট দেয়া পর্যন্ত তাকেই চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করতে হবে। কতদিনে এই রিপোর্ট দিতে হবে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কতদিনে দিবেন সেটা তাদের বিষয়। যে পর্যন্ত চূড়ান্ত রিপোর্ট না দিতে পারেন, তারা অন্তরবর্তীকালীন রিপোর্ট দিয়েই যাবেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্ষমতার দ্বন্দ্বের কারণেই কাউন্সিলার নজরুল ইসলামকে অপহরণ ও খুনের পরিকল্পনা করেন কাউন্সিলার নূর হোসেন। র্যাব সাবেক কর্মকর্তারা সেটার বাস্তবায়ন করেন।
গত ২৭ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম, আইনজীবী চন্দন সরকারসহ সাতজনকে অপহরণ করা হয়। ৩০ এপ্রিল ও ১ মে শীতলক্ষ্যা নদীতে তাদের মরদেহ পাওয়া যায়।
সাত খুনে জড়িত বলে অভিযোগ আসায় গত ৫ মে বিচারপতি মোহাম্মদ রেজাউল হক ও বিচারপতি গোবিন্দ চন্দ্র ঠাকুরের হাইকোর্ট বেঞ্চ স্ব-প্রণোদিত হয়ে র্যাব-১১ এর ওই তিন কর্মকর্তাকে গ্রেফতারের নির্দেশ দেন।
