কেউ এসেছেন সন্তান, কেউ এসেছেন ভাই আবার কেউ এসেছেন স্বামী হারানোর বেদনা নিয়ে। এদের কেউ না কেউ বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে গুম বা অপহরণের শিকার হয়েছেন। স্বজন হারানোর বেদনা নিয়ে তারা বলেছেন, এমন পরিস্থিতি যেন কারো জীবনে আর কখনো না আসে। হারানো স্বজনদেন দ্রুত ফিরে পেতে এবং বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনার বিচার পাওয়ার আশায় তারা প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
গতকাল বুধবার আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবস উপলক্ষে জাতীয় প্রেসক্লাব মিলনায়তনে মৌলিক অধিকার সুরক্ষা কমিটি আয়োজিত আলোচনা সভায় এসব স্বজন হারানো পরিবারের সদস্যরা একত্রিত হন। তাদের মধ্য থেকে ১৮টি পরিবারের সদস্যরা তাদের স্বজন হারোনোর দুর্বিষহ অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। অভিজ্ঞতা তুলে ধরার পর এসব ঘটনার তদন্তে বিচার বিভাগীয় দুটি কমিশন গঠনের দাবি জানায় মৌলিক অধিকার সুরক্ষা কমিটি। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক আগামী ২১ ফেব্রুয়ারির মধ্যে সরকারকে এ তদন্ত কমিশন গঠনের দাবি জানিয়ে বলেন, গুম-খুন-অপহরণের ঘটনায় একটি এবং আদিবাসী ও সংখ্যালঘুদের উপর নির্যাতন ও ভূমির বেদখলের ঘটনা তদন্তে আরেকটি কমিশন গঠন করতে হবে। আমরা আশা করি এই সময়ের মধ্যে কমিশন গঠন করে কাজ শুরুর নির্দেশ দেয়া হবে।
তিনি বলেন, জনগণের অধিকার হরণের কথা শোনার জন্য এই দেশ সৃষ্টি হয়নি। এই মানবাধিকার লংঘনের ঘটনার বিরুদ্ধে আমাদের সকলকে রুখে দাঁড়াতে হবে।
‘মানবাধিকার হরণ:এ কি পরিস্থিতিতে দেশ!’ শীর্ষক এ আলোচনা সভা তিনটি পর্বে বিভক্ত ছিলো। প্রথম পর্বে বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী পরিচয়ে গুম ও অপহরণের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যরা তাদের অভিব্যক্তি তুলে ধরেন। বিরোধী রাজনৈতিক নেতা মাহবুব হাসান সুজন নারায়ণগঞ্জ এলাকা থেকে এক বছর পূর্বে অপহূত হন। তার স্ত্রী তানজিনা আক্তার এসেছিলেন তার দুর্বিষহ অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে। তিনি বলেন, ‘এক বছর পূর্বে ডিবি পুলিশ পরিচয়ে আমার স্বামীকে অপহরণ করা হয়। এরপর থেকে আজ পর্যন্ত তার কোন সন্ধান পাইনি। আমার দুটি সন্তান রয়েছে। কিভাবে তাদের নিয়ে আমার দিন কাটছে আল্লাহতায়ালা ছাড়া কেউ বলতে পারবেন না। সন্তান দুটি তাদের পিতার আশায় পথ চেয়ে বসে আছে। কিন্তু আমি উত্তর দিতে পারি না। এ সময় তিনি কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন।
সাজেদুল ইসলাম সুমন ৬২নং ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক। গত বছরের ৪ জানুয়ারি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী পরিচয়ে তিনি গুম হয়ে যান। তাকে নিয়ে অনুষ্ঠানে কথা বলেছেন তার শিক্ষক আমেনা খাতুন। তিনি বলেন, ‘খুবই ভালো ছিলো সে। সমাজ সেবামূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকত সে। কিন্তু তাকে আজ অবধি পাওয়া যায়নি। তার আশায় পথ চেয়ে বসে আছে মা, স্ত্রী ও সন্তানেরা। সুমনের মা আজ শয্যাশায়ী। আমেনা খাতুন বলেন, সুমন যদি কোন অপরাধ করে থাকে তাহলে তাকে আইনের আওতায় আনুন। নইলে তাকে মুক্তি দিন। শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণার হাত থেকে পরিবারের সদস্যদের মুক্তি দিন।’
মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব কাজী আব্দুল মতিন বঙ্গবন্ধুর দেহরক্ষী ছিলেন। তার ছেলে কাজী রকিবুল হাসান শাওন যুবলীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। আব্দুল মতিন বলেন, ‘গত ২৯ মার্চ র্যাব পরিচয়ে আমার ছেলেকে অপহরণ করা হয়। আট মাস অতিবাহিত হতে চলল আজও তার কোন খোঁজ পাইনি। আমি কি এজন্য মুক্তিযুদ্ধ করেছি। আমাকে আপনারা এই মঞ্চের মধ্যে হত্যা করুন। আমার স্ত্রী অসুস্থ। সন্তান ফিরে আসবে সে আশায় তার মা পথ চেয়ে বসে আছে। শাওনের একটি সন্তান আছে। সে প্রতিনিয়ত আমাকে জিজ্ঞাসা করে, ‘দাদু আমার বাবা কোথায় ? কেন সে আমার কাছে আসছে না। তুমি আমার বাবাকে নিয়ে আস। ’
শুধু শাওনের সন্তানই নয়, ছেলের পথ চেয়ে বসে আছেন গুমের শিকার জহিরের মা হোসনে আরা, অপহূত সূত্রাপুর থানা ছাত্রদল সভাপতি সেলিম রেজা পিন্টুর ভাই ইসমাইল রেজাসহ এক বছর ধরে নিখোঁজ আসাদুজ্জামান রানা, আব্দুল কাদের ভুঁইয়া মাছুম, মাজহারুল ইসলাম রাসেল, জাহিদুল করিম তানভীরসহ অনেকের পরিবারের সদস্যরা। এছাড়া চিকিত্সক ফয়েজ আহমেদের স্ত্রী মার্জিয়া আক্তার তার স্বামীর, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার শাহানুর আলমের ছোট ভাই মেহেদী হাসান, নারায়ণগঞ্জের প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামের ভাই আব্দুস সালাম তার ভাইয়ের বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবি জানান। স্বজনদের বক্তব্য শেষে আলোচনায় অংশ নেন মানবাধিকার কর্মীরা।
কলামিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, গুম ও বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এক ধরনের মৌনতা লক্ষ্য করা যায়। এ জন্য সংঘাতময় রাজনীতি দায়ী। এই রাজনৈতিক সংস্কৃতি বড়ই নির্মম।
নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন বলেন, সাত খুনের সঙ্গে নূর হোসেনই নয়, অনেক গডফাদার জড়িত। নূর হোসেনকে দেশে ফিরিয়ে আনা হোক। তাহলে অনেক নেপথ্য কাহিনী বেরিয়ে আসবে।
নাগরিক ঐক্যের আহবায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ৫ জানুয়ারির নির্বাচন করে ১৬ কোটি মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেয়া হয়েছে। সভায় আরো বক্তব্য দেন ব্যারিস্টার সারা হোসেন ও মানবাধিকার কর্মী শাহনাজ হুদা প্রমুখ।
সভা শেষে জাতীয় পতাকা ও কালো পতাকা হাতে নিয়ে এবং হারানো স্বজনদের ছবি গলায় ঝুলিয়ে প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করা হয়।
