কার্বন নিঃসরণ কমানো, জলবায়ু তহবিল গঠনে একটি বৈশ্বিক সমঝোতায় পৌঁছাতে লিমা জলবায়ু সম্মেলনে শেষ মুহূর্তে জোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন ১৯৫ দেশের নেতারা। সমঝোতার জন্য আনুষ্ঠানিক আলোচনার বাইরে গিয়ে বৈঠক করছেন প্রভাবশালী দেশের র্শীষ নেতারা। সম্মেলনে বিরোধপূর্ণ অবস্থানে থাকা আমেরিকা ও চীন শেষ মুহূর্তে এসে বেশ নমনীয় মনোভাব দেখাচ্ছে।
প্ল্যানারি সেশনে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরে বক্তব্য দেন পরিবেশ ও বন মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু। তিনি বিশ্ব নেতৃবৃন্দকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, ‘বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী না হয়েও ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর র্শীষে রয়েছে। সমুদ্রপৃষ্টের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশের এক-চতুর্থাংশ সাগরে তলিয়ে যেতে পারে। এতে প্রায় চার কোটি লোক উদ্বাস্তু হবে। এ সব মানুষকে রক্ষা করতে হলে আমাদের অবশ্যই আগে থেকে ব্যবস্থা নিতে হবে।’
বাংলাদেশের নিজস্ব উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেন, ‘সৌরশক্তির ব্যবহারে বাংলাদেশ সামনের দিক থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছে। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে ৩২ লাখ সোলার প্যানেল স্থাপন করা হয়েছে। প্রায় দেড় কোটি লোককে সৌরবিদ্যুতের আওতায় আনা গেছে।’
পরিবেশ ও বন মন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশ কারো দিকে তাকিয়ে না থেকেই নিজস্ব অর্থায়নে অভিযোজন ও প্রশমন খাতে ৪০০ মিলিয়ন ডলারের প্রকল্প নিয়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিশ্বে উদাহরণ তৈরি করেছে বাংলাদেশ।’ এ সময় উন্নত বিশ্বকে তিনি লস অ্যান্ড ড্যামেজ তহবিলে অর্থায়ন করার আহ্বান জানান।
বছরে ১০০ বিলিয়ন ডলারের সবুজ জলবায়ু তহবিলে উন্নত বিশ্ব লিমায় ১০ বিলিয়ন দেয়ার ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়ে আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেন, ‘লিমায় আগামী বছরের প্যারিস চুক্তির রূপরেখাসহ কার্বন নিঃসরণ রোধে আইনি বাধ্যবাধকতার খসড়া চূড়ান্ত করতে হবে।’ এ সময় তিনি গ্রিন ফান্ডে কোন দেশ কী পরিমাণ অর্থ দেবে তা লিমায় সুনির্দিষ্ট করে ঘোষণার দাবি জানান।
এ দিকে জলবায়ু তহবিল, লস অ্যান্ড ড্যামেজ, কার্বন নিঃসরণ কমাতে প্যারিস চুক্তির রূপরেখা চূড়ান্ত করার বিষয়ে ইতিবাচক ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে আমেরিকা ও চীন। অভিযোজন ও প্রশমন খাতে বরাদ্দের অর্ধেক অধের্ক রাখার বিষয়েও তারা একমত হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কানাডা, রাশিয়া, ব্রাজিল, অস্ট্রেলিয়া—একটা মতৈক্যে পৌঁছানোর চেষ্টা শেষ পর্যন্ত সফল হবে বলে মনে করছে সম্মেলনের আয়োজক দেশ পেরু।
লিমা সম্মেলনে আমেরিকা, চীন, সুইডেন, জার্মানিসহ কয়েকটি দেশ ২০২০ সালের আগেই জলবায়ু তহবিলে বছরে ১০ বিলিয়ন ডলার দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। যদিও স্বল্পোন্নত দেশগুলো ২০২০ সালে বছরে ১০০ বিলিয়ন ডলারের তহবিল গঠনের আগের চার বছরে প্রতিবছর ৬০ বিলিয়ন দাবি করে আসছিল। ২০১৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত এ অর্থ দাবি করা হয়।
গত দুই দিন ধরে জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন, পেরুর রাষ্ট্রপতি, ইউএনএফসিসিসির নির্বাহী সেক্রেটারি ক্রিশ্চিয়ানো ফিগুয়াস ও সম্মেলন আয়োজক কমিটির প্রধান ম্যানুয়েল পুলগার ভিডাল প্রভাবশালী দেশগুলোর সঙ্গে একাধিক অনানুষ্ঠানিক বৈঠক করছেন একটি রোডম্যাপ ঘোষণার সমঝোতায় পৌঁছাতে। একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে সম্মেলনের ভেতরে ছোট ছোট গ্রুপে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ চলছে। দক্ষিণ আমেরিকার দেশ পেরুর রাজধানী লিমায় গত ১ ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়া এ সম্মেলন ১২ ডিসেম্বর শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের পরিচালক ড. সেলিমুল হক বলেন, ‘লিমা সম্মেলনে সিদ্ধান্ত নিতে খুব বেশি সময় হাতে নেই। তবে এখনো বিরোধপূর্ণ মেরুতে রয়েছে শিল্পোন্নত ও স্বল্পোন্নত দেশগুলো।’ তিনি আশাবাদ করে বলেন, ‘ল্যাটিন আমেরিকার জোট, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, এলডিসি ও দ্বীপরাষ্ট্রগুলোর চাপে হয়তো শেষ মুহূর্তে একটা সমঝোতা হবে।’
সম্মেলনে শিল্পোন্নত দেশগুলোর জোট অ্যানেক্স-১, উদীয়মান অর্থনীতির জোট বেসিক ও স্বল্পোন্নত রাষ্ট্রগুলোর জোট এলডিসি, ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্রগুলোর জোট এওসিস ও আফ্রিকান ইউনিয়নের সম্মিলিত জোটের নেতারা এখনো কোনো আশার আলো দেখছেন না বরং যে যার অবস্থানে অনড় রয়েছেন।
এ বিষয়ে এলডিসির মুখপাত্র ড. মঞ্জুরুল হান্নান খান বলেন, ‘সব সময় শেষ মুহূর্তেই একটা সমাধান আসে। আমরা আশা করি—এবারো হয়তো এমনটি ঘটবে।’
ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন এবারে সমঝোতায় নেতৃত্ব দেওয়ার চেষ্ঠা করছে। ইউই এ জন্য এলডিসি ও দ্বীপরাষ্ট্রগুলোর জোটের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে একই সুরে কথা বলতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছে। একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের প্রতিনিধিরা পৃথকভাবে আমেরিকা, জার্মানি, রাশিয়া, কানাডা ও চীনের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের পক্ষে জার্মানিও দেনদরবারে নেমেছে। তারাও একটি চুক্তিতে আসতে চাপ দিচ্ছে।
বাংলাদেশের সংবাদ সম্মেলন:
পরিবেশ ও বন মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু লিমায় বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরে সংবাদ সম্মেলন করেন। সংবাদ সম্মেলনে তিনি জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি মোকাবিলায় সবুজ তহবিলে ২০১৫ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত উন্নয়নশীল দেশগুলোকে আর্থিক সহযোগিতা প্রদানের বিষয়টিকে অর্থায়নের ব্যাপারে নেয়ার জন্য আহ্বান জানান। এ ছাড়া, ডারবান রোডম্যাপের আলোকে কার্বন নির্গমন রোধ, অর্থায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি মোকাবিলায় উন্নয়নশীল ও গরিব দেশগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য যে সব উদ্যোগ নেয়ার কথা বলা হয়েছিল, সেগুলোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে বিশ্ব নেতাদের তিনি স্মরণ করিয়ে দেন।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন— পরিবেশ ও বমন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি ড. হাছান মাহমুদ এমপি, গোলাম রব্বানী এমপি, ইয়াহিয়া চৌধুরী এমপি, টিপু সুলতান এমপি, পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের সচিব নজিবুর রহমান, জাতিসংঘ মিশনের বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি এম আব্দুল মোমেন।
