সুন্দরবনের শেলা নদীতে এখন তেলের ছড়াছড়ি। সেই সাথে বাতাসে ভেসে আসছে তেলের গন্ধ। মঙ্গলবার ভোরে শেলা নদীর বাদামতলা খালের মুখে ওটি সাউদার্ন স্টার সেভেন নামে তেল বোঝাই ট্যাংকার ডুবে গিয়ে তাতে থাকা তেল নদীতে ভেসে এ অবস্থার সৃষ্টি করেছে। গতকাল সকালে শেলা নদীর ঘটনাস্থলে যাওয়ার পথেই নজরে আসে নদীর পানিতে তেল আর তেল ভাসছে। শুধু শেলা নদী নয়, বনের অভ্যন্তরের বিভিন্ন খাল ও পার্শ্ববর্তী পশুর নদীর বিস্তীর্ণ এলাকায় তেল আর পানি মিলে একাকার।
মংলার প্রায় ২০ কিলোমিটার অদূরে ডুবে যাওয়া ট্যাংকার অবশেষে ৬০ ঘন্টা পর গতকাল সকালে উদ্ধার করা হয়েছে। ট্যাংকার থেকে সুন্দরবনের বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে পড়া তেল আগামী তিন দিনে সরিয়ে নেয়ার পরিকল্পনা করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। এদিকে পুনরায় আদেশ না দেয়া পর্যন্ত শেলা নদী দিয়ে পণ্যবাহী নৌযান চলাচল বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ডুবরিরা তল্লাশি চালিয়ে নিখোঁজ ট্যাংকারের মাস্টার মোকলেসুর রহমানের কোন সন্ধান পাননি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) ও আর্থ এন্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. নাসরীন আহমাদ ইত্তেফাককে বলেন, সুন্দরবনের যে অঞ্চলে ট্যাংকারটি ডুবেছে ওই এলাকা বিপন্নপ্রায় শুশুকসহ বেশ কয়েকটি জলজ প্রাণীর অভয়াশ্রম। এ অঞ্চল দিয়ে জাহাজ চলাচলই নিষিদ্ধ রাখা উচিত। তেল ছড়িয়ে পড়ার কারণে জলজ প্রাণীর স্বাভাবিক জীবন বাধাগ্রস্ত হবে। তিনি বলেন, শুশুক বা ডলফিন জাতীয় প্রাণীগুলো পানির উপরে উঠে শ্বাস-প্রশ্বাস গ্রহণ করে। তেলের গন্ধের কারণে তাদের স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাস বাধাগ্রস্ত হওয়ায় মৃত্যু ঝুঁকিও রয়েছে। সুন্দরবন একটি ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট। এর গাছের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে মূল মাটির নিচে গিয়ে আবার উপরের দিকে উঠে। উপরের দিকে উঠে থাকা মূলের অংশটুকু দিয়ে বাতাস থেকে কার্বন ডাই-অক্সিডাইসহ বেঁচে থাকার উপাদান সংগ্রহ করে। এই মূলগুলোতে তেল আটকে থাকার কারণে গাছগুলোর বৃদ্ধি আটকে যাবে। এমনকি অনেক গাছ মারাও যেতে পারে। তবে সুন্দরবনে এই ধরনের ঘটনা এবারই প্রথম তা এখনই বলা যাচ্ছে না। ক্ষতির পরিমাণ কি রকম হবে তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করলেই আসল চিত্র জানা যাবে।
গতকাল দুপুরে মংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের সভাকক্ষে পোর্ট চেয়ারম্যান কমোডর এসআর ভুঁইয়ার সভাপতিত্বে বন্দর কর্তৃপক্ষ, বনবিভাগ ও বিপিসি’র যৌথ জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভা শেষে বিআইডব্লিউটিএ’র চেয়ারম্যান সামছুদোহা খন্দকার বলেন, পুনরায় আদেশ না দেয়া পর্যন্ত শেলা নদী দিয়ে নৌযান চলাচল বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এদিকে নদীতে ভাসমান তেল অপসারণে চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে আসা জাহাজ কাণ্ডারি-১০ মংলায় পৌঁছেছে। স্থানীয় পদ্ধতিতে ফোম দিয়ে গ্রামবাসীর মাধ্যমে নদী থেকে তেল তোলার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই এই প্রক্রিয়ায় তেল তুলে পানি পরিষ্কার করা সম্ভব হবে বলে আশাবাদ কর্মকর্তাদের।
গতকাল শেলা নদীতেই কথা হয় বন সংলগ্ন জয়মনী এলাকার বাসিন্দা মোতালেব, হারেজ, মোসলেমসহ কয়েকজন জেলের সাথে। তারা বললেন, তেলের গন্ধে টেকাই দায়। সেই সাথে পুরো নদীর পানিতে তেলের আস্তরণ থাকায় জাল ফেলতে পারছি না। কবে নাগাদ এ অবস্থা থেকে উদ্ধার পাওয়া যাবে তা বলা মুশকিল। দুর্ঘটনা কবলিত স্থান বাদামতলা খালের মুখে কথা হয় প্রাথমিক উদ্ধার কাজে নিয়োজিত কয়েকজন ডুবুরির সাথে। মংলার কুমারখালী এলাকার ডুবুরি সবুর, সেলিম, আক্কাস, রফিক জানালেন, তেলের গন্ধে তাদের কাজ অনেকটাই ব্যাহত হচ্ছে।
ঘটনাস্থল সংলগ্ন লোকালয় জয়মনী এলাকার বাসিন্দা আলম গাজী জানালেন, তেলের ছড়াছড়িতে নদীর পানি দূষিত হয়েছে। এ অবস্থায় এলাকার বাসিন্দারা নদীতে গোসলসহ অন্যান্য কাজে নদীর পানি ব্যবহার করতে পারছেন না। এ ছাড়া বাতাসের মাধ্যমে তেলের গন্ধ এসে তাদের নাকে ঢুকছে। এ ছাড়া এ অবস্থায় নদীতে মাছ মারা যাবার আশংকাও করেন তিনি। পাশাপাশি বাতাসে তেলে গন্ধের কারণে সুন্দরবনের জীবজন্তুও মারা যেতে পারে। শ্বাসমূলের বংশ বিস্তারও বন্ধ হতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থ এন্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. এ কিউ এম মাহবুব ইত্তেফাককে বলেন, সুন্দরবনে ভেতরের নদীগুলোতে যেহেতু জোয়ার-ভাটা হয়, তাই পানিতে ভেসে থাকা তেল বিস্তীর্ণ এলাকায় যাতে ছড়িয়ে পড়তে না পারে সে কারণে খালগুলোর মুখে কলাগাছ বা হালকা কিছু দিয়ে বাঁধ দেয়া যায়। বাতাসে তেলের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ার কারণে পাখিসহ জীবজন্তুর শ্বাস-প্রশ্বাস গ্রহণ প্রক্রিয়া ভয়াবহভাবে বাধাগ্রস্ত হবে। তেলের গন্ধের তীব্রতার কারণে পাখির চোখ মুখ বা ডানার পালক পুড়ে যেতে পারে। হরণিসহ কিছু জীবজন্তু নদী বা খালের কিনারে এসে পানি গ্রহণ করে। তেল ছড়িয়ে পড়ার কারণে তারা আর এখন পানি খেতেই পারবে না। ফলে তাদের স্বাভাবিক জীবন চক্রই পাল্টে গেল।
বন সংরক্ষক কার্তিক চন্দ্র সরকার ও পূর্ব সুন্দরবনের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আমির হোসেন চৌধুরী জানান, বিস্তীর্ণ এলাকায় তেল ছড়িয়ে পড়েছে। নদীর পানিতে তেলের গন্ধ। এ তেল অপসারণের আপাতত কোন ব্যবস্থা নেই। উচ্চ পর্যায়ে এ নিয়ে বৈঠকে বসতে হবে। তেল ছড়িয়ে পড়ায় বনসহ গোটা পরিবেশের মারাত্মক দূষণ ঘটেছে। তেল ছড়িয়ে পড়ায় বিলুপ্ত প্রায় ইরাবতী ডলফিনসহ ৬ প্রজাতির ডলফিন ও ম্যানগ্রোভ জীববৈচিত্র্য চরম হুমকির মুখে।
গতকাল সকালে মংলার বেসরকারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স ধলেশ্বরী স্যালভেজ কর্পোরেশনের উদ্ধারকারী নৌযান ডি.বি রাইজিং থ্রি’র সাথে ৩টি নৌযানের সহায়তায় ডুবন্ত ট্যাংকারকে টেনে প্রথমে নদীর কুলে সরিয়ে নেয়া হয়। পরে সেখান থেকে সরিয়ে মংলার জয়মনীর ঘোল এলাকার নদীর চরে রাখা হয়। ট্যাংকারটিকে উদ্ধারকারী নৌযানের মালিক তমিজ উদ্দিন সরকার ইত্তেফাককে জানান, ডুবরি দল ডুবন্ত ট্যাংকারের সাথে লোহার তার পেঁচিয়ে সকাল থেকে উত্তোলনের কাজ শুরু করে। বিআইডব্লিউটিএ’র দুটি উদ্ধারকারী জাহাজ আসার কথা থাকলেও ঘনকুয়াশার কারণে ঘটনার সময় পর্যন্ত তারা ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে পারেনি।
ভাসমান তেল অপসারণে চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে আসা টাগবোট কাণ্ডারি-১০ ফার্নেস অয়েলের ক্রিয়া নষ্ট করার জন্য এক ধরনের রাসায়নিক তরল পদার্থ ছড়াতে শুরু করেছে। মংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের হার্বার মাস্টার কে.এম আকতারুজ্জামান আশা প্রকাশ করেন, এতে ভেসে থাকা তেল পানির নিচে চলে যাবে এবং পানির অক্সিজেন নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা কমবে। এই টাগবোটে ১০ হাজার লিটার তেলের দূষণ কমানোর মতো ‘অয়েল ডিসপারসেন্ট’ রয়েছে।
মংলা বন্দরের চেয়ারম্যান কমোডর হাবিবুর রহমান ভূইয়া জানিয়েছেন, তেল অপসারণে করণীয় নির্ধারণে গতকাল সকালে মংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের সম্মেলন কক্ষে বিআইডব্লিউটিএ’র চেয়ারম্যান শামসুজ্জোহা খন্দকারের সভাপতিত্বে বন্দর কর্তৃপক্ষ, বনবিভাগ, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) এক যৌথ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় স্থানীয় জেলেদের সহায়তা নিয়ে আগামী তিন দিনের মধ্যে তেল অপসারণের একটি পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। বৈঠক শেষে বিআইডব্লিউটিএ’র চেয়ারম্যান বলেন, পুনরায় আদেশ না দেয়া পর্যন্ত শেলা নদী দিয়ে নৌযান চলাচল বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। নদীতে ভেসে থাকা তেল স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় উত্তোলন করা হবে বলেও তিনি জানান। তিনি আরো বলেন, এই চ্যানেল ছাড়াও বিকল্প অনেক চ্যানেল রয়েছে। সেগুলিতে পথ বেশি হবে। একটু বেশি ঘুরতে হবে। সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এ সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।
মংলা নৌবাহিনীর কমান্ডার আবরার জানান, ট্যংকারটি তাদের তত্ত্বাবধানে খানজাহান স্যালভেজ এন্টার প্রাইজ উদ্ধার করেছে। অয়েল ট্যংকারে আরো কয়েক লাখ লিটার ফার্নেস অয়েল থাকতে পারে বলে তাদের ধারণা। আজ পরীক্ষা-নিরীক্ষা হবে।
মঙ্গলবার ভোরে ৩ লাখ ৫৭ হাজার লিটার ফার্নেস তেল বোঝাই ট্যাংকারের ঘনকুয়াশার মধ্যে বিপরীত দিক থেকে আসা অপর একটি জাহাজ ধাক্কা দিলে ট্যাংকার নদীতে ডুবে যায়। জীববৈচিত্র্যর জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর তেল ছড়িয়ে পড়ে সুন্দরবনের প্রায় ৬০ কিলোমিটার এলাকায়।
দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে
পরে : ইউএনডিপি
তেল নিঃসরণের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) বাংলাদেশ। ইউএনডিপির কান্ট্রি ডিরেক্টর পলিন ট্যামেসিস বলেন, তেল নিঃসরণের এলাকাটি চাদপাই অভয়ারণ্য সংলগ্ন যা বাংলাদেশ সরকার ঘোষিত সর্ববৃহত্ সংরক্ষিত জলাভূমি এবং গাঙ্গেয় ও ইরাবতি নামক দুটি বিপদাপন্ন ডলফিন প্রজাতির বিচরণ ক্ষেত্র। গতকাল ইউএনডিপির এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
তিনি বলেন, শেলা নদী পথে সকল প্রকার নৌযান চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধে সরকারি সিদ্ধান্ত প্রশংসার যোগ্য। আমরা মনে করি, এই সিদ্ধান্ত সুন্দরবনের ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার কার্যক্রমকে আরো বেগবান করবে। যদিও এই দুর্ঘটনা আরো একবার সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে সকল প্রকার বাণিজ্যিক নৌযান চলাচল সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করার প্রয়োজনীয়তাকে সামনে নিয়ে এসেছে।
তিনি আরো বলেন, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা থেকে জানি, এই ধরনের দুর্ঘটনা সচরাচর পরিবেশের উপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলে। এ ধরনের পরিবেশের পুনঃসংরক্ষণে বহু প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়ের প্রয়োজন হয়। তাই বৈশ্বিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই প্রাকৃতিক ঐতিহ্যের ক্ষয়ক্ষতি হ্রাস এবং পুনর্বাসনের লক্ষ্যে সরকারি, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সহযোগীদের সঙ্গে কাজ করতে আমরাও আগ্রহী।