দীর্ঘ ১১ দিন আলোচনার পর পেরুর লিমায় চলমান জলবায়ু সন্মেলনে একটা সমঝোতায় পৌঁছার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন বিশ্ব নেতারা। বৃহস্পতিবার (স্থানীয় সময়) ১৯৫ দেশের সম্মতিতে ২০২০ সাল থেকে ১০০ বিলিয়ন ডলারের গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড ও লস এন্ড ড্যামেজ ফান্ড গঠন এবং কার্বন নিঃসরণ কমাতে ২০১৫ সালের প্যারিস সন্মেলনে আইনি বাধ্যবাধকতামূলক একটি চুক্তিতে পৌঁছার রূপরেখা চূড়ান্ত করা হয়েছে। তবে গ্রিন ফান্ড গঠনের আগে ২০১৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত স্বল্পোন্নত দেশগুলো বছরে ৬০ বিলিয়ন ডলার দাবি করেছে। অবশ্য এ নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান নিয়েছে শিল্পোন্নত দেশগুলো। গ্রিন ফান্ডে অর্থায়ন নিয়ে মতৈক্যে পৌঁছলেও তারা মধ্যমেয়াদে তহবিলে অর্থের পরিমাণ ও কোন কোন দেশ কি পরিমাণ অর্থ দেবে তা সুনির্দিষ্ট করতে চাচ্ছে না।
এদিকে বাংলাদেশের পরিবেশ ও বন মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু লিমা জলবায়ু সম্মেলনে জাপান ও বিশ্বব্যাংক প্রতিনিধিদের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেছেন। এসব বৈঠকে বাংলাদেশের উন্নয়নে সহায়তার জন্য তিনি জাপান সরকার এবং বিশ্বব্যাংককে ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশ ইতিমধ্যে নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশ নিজস্ব ফান্ড থেকে অর্থায়ন শুরু করেছে। তবে কার্যকরভাবে এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় উন্নয়ন সহযোগীদের অধিক হারে সহায়তার প্রয়োজন রয়েছে। সম্মেলনের সবচেয়ে আলোচিত ইস্যু লস এন্ড ড্যামেজ ফান্ড নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, নিউজিল্যান্ড ও অষ্ট্রেলিয়ার কঠোর বিরোধিতার পরও তা আলোর মুখ দেখেছে। ২০১৫ সালে পর্যালোচনার শর্ত জুড়ে দিয়ে শিল্পোন্নত দেশগুলো লস এন্ড ড্যামেজ ফান্ড বিষয়ে কর্মকৌশলও নির্ধারণ করেছে। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, লিমা সম্মেলনে প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মধ্যে ফারাক অনেকটাই কমে এসেছে।
সুইডেন, পোল্যান্ড ও জার্মানী গ্রিন ফান্ডে অর্থ দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। শেষদিকে ফ্রান্স, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, নিউজিল্যান্ডসহ ২৫টি দেশ এই ফান্ডে অর্থ দেয়ার অঙ্গীকার করতে পারে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০১৫ সাল থেকেই বছরে ৬০ বিলিয়ন ডলার দিয়ে যাত্রা শুরু করে পর্যায়ক্রমে ২০২০ সালে গ্রিনফান্ড ১০০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করতে হবে। তবে ফান্ড চূড়ান্ত হলেও ফান্ড ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে কোনো সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকছে না। এডাপটেশন ও মিটিগেশন খাতে ফান্ডের অর্ধেক অর্থ বরাদ্দ রাখার বিষয়ে সব দেশ একমত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন বেসরকারি খাত থেকে গ্রিন ফান্ডে অর্থায়নের কথা বলেছে। তবে তহবিল নিয়ে একমত হলেও ২০২৫ এর আগে কার্বন নিঃসরণ কমানো ছাড়াও অভিযোজন খাত নিয়ে উদীয়মান অর্থনীতির জোট বেসিক ও জি-৭৭ চায়না এখনও ঐকমত্যে পৌঁছতে পারেনি। তবে পরিবেশবিদরা বলছেন, কানকুনে গ্রিন ফান্ডের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হলেও এর অর্থায়ন নিয়ে স্পষ্ট কোনো নির্দেশনা ছিল না। এবার লিমা সম্মেলনের শুরুতেই আমেরিকা ও চীনসহ কয়েকটি দেশ ১০ বিলিয়ন ডলার অর্থায়নের সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার করেছে। এলডিসির মুখপাত্র ও জলবায়ু বিশ্লেষক ড. মঞ্জুরুল হাসান খান বলেন, লিমা সম্মেলন পুরোপুরি ব্যর্থ হচ্ছে না। এখানে অর্থায়ন ও প্যারিস চুক্তি নিয়ে অগ্রগতি হয়েছে।
১২ দিনব্যাপী এই সম্মেলন শুক্রবার শেষ হওয়ার কথা থাকলেও আরো দুয়েকদিন বাড়তে পারে। বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে লিমা ঘোষণার জন্য একটি খসড়া প্রস্তাব তুলে ধরা হয়। প্রস্তাবটি সবমহল কমবেশি গ্রহণযোগ্য মনে করছে। আফ্রিকান গ্রুপ ও এলডিসির কয়েকটি দেশ প্রস্তাবের কিছু সমালোচনা করেছে। তবে সমঝোতা প্রস্তাবটি পাসের ক্ষেত্রে তারা ভেটো দেবে কিনা সে বিষয়ে স্পষ্ট করে কিছু বলছে না। শেষ মুহূর্তে বিরোধপূর্ণ অবস্থানে থাকা চীন, ভারত, অষ্ট্রেলিয়া, কানাডা, জাপান, সৌদি আরব এমনকি যুক্তরাষ্ট্রও ওই প্রস্তাবকে সমর্থন জানিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছে। সম্মেলনে শিল্পোন্নত দেশগুলোর জোট অ্যানেক্স-১, উদীয়মান অর্থনীতির জোট বেসিক ও স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জোট এলডিসি, ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্রগুলোর জোট এওসিস ও আফ্রিকান ইউনিয়নের সম্মিলিত জোটও খসড়া নিয়ে তেমন দ্বিমত করেনি। তবে শিল্পোন্নত দেশগুলো বলছে, উদীয়মান অর্থনীতির দেশ চীন, ভারত, কাতার, সিঙ্গাপুর ও দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনৈতিক অবস্থা উন্নত অনেক দেশের চেয়ে ভালো। ফলে এসব দেশ এখন উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় থাকতে পারে না। তাদেরকেও জলবায়ু তহবিলে অর্থায়ন ও কার্বন নিঃসরণ কমাতে হবে। অন্যদিকে এলডিসিভুক্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো অভিযোগ করছে, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, সৌদি আরব, কানাডা, ভারত, চীন, ব্রাজিল ও অষ্ট্রেলিয়ার একগুঁয়েমির ফলে সমঝোতায় পৌঁছাতে বিলম্ব হচ্ছে।
জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন, আমেরিকার সেক্রেটারি অব স্টেট জন কেরি, ইউএনএফসিসিসি’র নির্বাহী সেক্রেটারি ক্রিষ্টিয়ানো ফিগুয়াস ও সম্মেলনের সভাপতি ম্যানুয়েল পুলগার ভিডাল প্রভাবশালী দেশগুলোর সঙ্গে একাধিক অনানুষ্ঠানিক বৈঠক করছেন লিমা রোডম্যাপ ঘোষণার সমঝোতায় পৌঁছাতে। জন কেরি বলেছেন, বৈশ্বিক তাপমাত্রা কমাতে আমাদের হাতে বেশি সময় নেই। শুধু উন্নত বিশ্বকে এর জন্য দায়ী না করে সকলে মিলে এর সমাধানে কাজ করতে হবে। উন্নত বিশ্বকে অর্থ দেয়ার ব্যাপারে চাপ দিলে সমস্যার সমাধান হবে না। তিনি শিল্পোন্নত ও স্বল্পোন্নত দেশগুলোর নেতাদের প্যারিস চুক্তির ব্যাপারে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেয়ার আহবান জানান। তিনি কার্বন নিঃসরণরোধে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও গ্রিন ফান্ডে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে অর্থায়ন করার ব্যাপারে রাজি করানোরও আহবান জানান।
এদিকে বাংলাদেশের সম্মিলিত সিভিল সোসাইটির পক্ষে এক সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়েছে, মিটিগেশন না করলে শুধু ফান্ড দিয়ে কোনো লাভ হবে না। ২০২০ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছর হাত-পা গুটিয়ে বসে না থেকে ২০১৫ সাল থেকেই কার্বন নিঃসরণ কমানোর উদ্যোগ নিতে হবে। লিমায় লস এন্ড ড্যামেজ ফান্ড চূড়ান্ত এবং একই সঙ্গে ২০১৫ সালে প্যারিসে আইনগত চুক্তির জন্য একটি রোডম্যাপ ঘোষণারও দাবি জানিয়েছেন তারা। সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন অ্যাকশন এইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবীর, ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের পরিচালক ড. সেলিমুল হক, বিসিএএস’র গোলাম রব্বানী, এনসিসিবি’র মিজানুর রহমান বিজয় প্রমুখ।