মানুষের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে দার্শনিক এ্যারিস্টটল বলেছিলেন, “মানুষ হলো বুদ্ধিবৃত্তিসম্পন্ন জীব” (Man is a Rational Animal)। মানুষের এই সংজ্ঞাটি আজও ব্যাপকভাবে সমাদৃত হলেও বিষয়টিতে আমি একটু দ্বিমতপোষণ করতে চাই। কেননা বুদ্ধিবৃত্তি নামক ক্ষমতা বা গুণের ব্যবহার করে মানুষ এমন কাজও করতে পারে যা মানুষকে পশুর চাইতেও নিকৃষ্ট জীবে পরিণত করে। ভয়ংকর রকমের অশুভ কাজ করার জন্য উচ্চতর বুদ্ধিরই দরকার পড়ে। কোন স্বল্পবুদ্ধির মানুষ অতিমাত্রায় মন্দ কাজ করার যোগ্যতা ধারণ করে না। মানুষ মারার জন্য যে সকল উন্নত প্রযুক্তির অস্ত্র-সরঞ্জাম আবিষকৃত হয়েছে তা কিন্তু উচ্চতর মেধারই অশুভ ফসল। বুদ্ধিবৃত্তি দিয়ে ভালো কাজ করলে তা মানুষের মঙ্গল বয়ে আনে। আসলে বুদ্ধিবৃত্তি হলো এমন একটি হাতিয়ার যার দ্বারা ভালো-মন্দ, মানবীয়-দানবীয় সব কাজই করা যেতে পারে। তাই এ ধরনের একটি গুণকে মানুষ শব্দটির আবশ্যিক শর্ত বলে চিহ্নিত করার বিষয়টি সার্বিকভাবে গ্রহণযোগ্য বলে মনে হয় না।
‘মানুষ’ শব্দটি যাই বোঝাক না কেন, ‘মানবিকতা’ বলতে আমরা কী বুঝি? ‘মানবচিত’ বলতেই বা আমরা কী বুঝিয়ে থাকি? আসলে এই ‘পদ’ বা শব্দগুলি দিয়ে আমরা একক কোন কাজ বা আচরণকে বোঝাই না। তবে এ শব্দ বা পদগুলি যে সকল ক্ষেত্রে ব্যবহূত হয় তার সবগুলোকেই আমরা ‘নৈতিকতা’ বলতে পারি। আমরা কোন দুর্গত মানুষের প্রতি ‘মানবিক’ সহায়তা দানের কথা যখন বলি তখন কিন্তু এর দ্বারা কোন আইনি বাধ্যবাধকতা, বৌদ্ধিক-যৌক্তিক নিয়মনিষ্ট আচরণকে বোঝাই না। বরং এর দ্বারা আমরা এক ধরনের নৈতিক আচরণকে বুঝি। মানবচিত কাজ বলতেও আমরা নৈতিকতাপূর্ণ কোন উত্তম কাজকেই বোঝাই। অমানবিকতা এবং অমানবচিত বলতেও আমরা অনৈতিক কাজকেই বুঝে থাকি। এখন মানবিকতা ও মানবচিত শব্দগুলোর তাত্পর্য যদি হয় নৈতিকতাপূর্ণ বা নৈতিকমানসমৃদ্ধ তাহলে মানুষ বলতে আমরা নৈতিক দায়-দায়িত্বপূর্ণ জীব বোঝাতে পারি। জীবকূলের মধ্যে মানুষ ছাড়া অন্য যত প্রাণি আছে তাদেরকে নৈতিকভাবে দায়বদ্ধ করা চলে না। বাঘে মানুষ খেলে আমরা বাঘকে মন্দ বলে তিরস্কার করতে করি না। এটা বাঘের স্বভাব। মশা বা ছারপোকা কামড়ালে আমরা তাদেরকে দুষ্ট বলে ভর্ত্সনা করি না। কুকুর আমাদের কামড় দিলে আমরা তাদের অসভ্য বলি না। পশুদের স্বভাব পাশবিকই হবে। কিন্তু মানুষ যদি কোন পাশবিক আচরণ করে তাকে কিন্তু আমরা অমানুষ বলেও আখ্যায়িত করি। কোন পশু যদি মানুষের উপকার বা কোন উত্তম কাজও করে আমরা কিন্তু তাকে অপশু বা মানুষ বলে আখ্যায়িত করি না। কেননা পশু ভালো কাজ করুক আর মন্দ কাজ করুক তার ওপর নৈতিক দায়-দায়িত্ব নেই। একমাত্র মানুষেরই নৈতিক দায়-দায়িত্ব রয়েছে। তাই এই বিশেষ গুণটি দিয়েই মানুষকে সংজ্ঞায়িত করা শ্রেয় বলে আমি মনে করি। অর্থাত্ মানুষ হলো ‘নৈতিক দায়-দায়িত্বসম্পন্ন জীব’।
মানুষ যদি নৈতিক দায়-দায়িত্বসম্পন্ন জীব হয় তাহলে যারা অনৈতিক কাজ করে তারা কি আর মানুষ থাকে না? এ ধরনের প্রশ্ন মূলত অবান্তর; কেননা দায়িত্ব থাকা আর দায়িত্ব পালন করা এক কথা নয়। আর একজন মানুষ সারাজীবনে সব কাজই নৈতিক করতে পারবে তারও কোন নিশ্চয়তা নেই। তবে যে ব্যক্তি যত বেশি নৈতিক কাজ করতে পারে তাকে তত মর্যাদাবান মানুষ বা যথার্থ মানুষ বলা যায়। বস্তুত আচরণের নৈতিক মানের ওপরই মানুষের পূর্ণতা নির্ভর করে, মানুষ নামের সার্থকতা নির্ভর করে।
অন্যদিকে মানবাধিকার বলতে সাধারণভাবে বোঝায় মানুষ হিসেবে সবার প্রাপ্য কিছু সাধারণ অধিকারকে। ধর্ম-বর্ণ, ধনী-গরিব নির্বিশেষে সকল মানুষ যে মানবিক অধিকারগুলো কাম্য বলে মনে করে তা-ই মানবাধিকার। যেমন প্রত্যেকের জীবন ও বৈধ সম্পত্তি রক্ষার অধিকার, সম্মান রক্ষার অধিকার ইত্যাদি অধিকারগুলো মানবাধিকারের মধ্যে পড়ে। তবে সমাজ ভেদে এর পরিমাণ ও প্রকরণ কম-বেশি হতে পারে বা ভিন্ন রকমও হতে পারে। তবে মানবাধিকারের এই ধারণা যাইহোক না কেন এই অধিকার অর্জন করতে হলে একে অপরের প্রতি মানবিক দায়িত্ব পালন করতে হবে। অপরের অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ থাকতে হবে এবং তা প্রদানের জন্য এক ধরনের দায়বদ্ধতা ও সচেতনতা থাকতে হবে।
n লেখক :সহকারী অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]
