এক লাখ হেক্টর বনে ছড়িয়ে পড়েছে তেল

আপডেট : ১৩ ডিসেম্বর ২০১৪, ২৩:৪৭

সুন্দরবনের শেলা নদীতে ট্যাঙ্কার ডুবির ঘটনায় অন্তত এক লাখ হেক্টর ম্যানগ্রোভ বনে ছড়িয়ে পড়েছে তেল। বাগেরহাটের পূর্ব সুন্দরবনের চাঁদপাই ও শরণখোলা রেঞ্জের প্রায় ১শ’ কিলোমিটার বন ও নদীতে এখন তেলের ছড়াছড়ি। এর মধ্যে এ দুটি রেঞ্জের এক লাখ হেক্টর ম্যানগ্রোভ বনের সুন্দরীসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছপালা ও লতাগুল্ম শ্বাসমূলে কালো ফার্নেস অয়েলের আস্তরণ পড়েছে। ম্যানগ্রোভ বনের চরিত্র হচ্ছে গাছ তাদের শ্বাসমূল দিয়ে অক্সিজেন নিয়ে থাকে। গাছের এই শ্বাসমূলে তেলের মোটা আস্তরণ পড়ায় এ বিশাল বন এলাকার গাছের ভবিষ্যত্ নিয়ে উদ্বিগ্ন সুন্দরবন বিভাগ। ইতিমধ্যে কোন কোন গাছ বিবর্ণ হতে শুরু করেছে।

এদিকে সুন্দরবনের আশপাশের এলাকায় দেখা মিলছে না ডলফিনের। তেলের থাবায় আক্রান্ত হচ্ছে করমজলের কুমিরও। কুমিরের মুখে ঘা হয়ে গেছে। ট্যাঙ্কার ডুবির পাঁচ দিন পর অনেক ছোট জীব-জন্তুর মৃত্যুর খবর পাওয়া যাচ্ছে। সাপ, ঘোরেল ও কাঁকড়া মরে থাকতে দেখা যাচ্ছে। অনেক জায়গায় মাছও মরে ভেসে উঠছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী সুন্দরবনে ৪৪৪টি রয়েল বেঙ্গল টাইগার আছে। এর মধ্যে ৬৩টির বসবাস এই শেলা নদী এলাকায়। এখন এ রয়েল বেঙ্গল টাইগারেরও দেখা মিলছে না।
অপরদিকে সুন্দরবন বিভাগের উদ্যোগে সনাতন বা হাতুড়ে পদ্ধতিতে ফার্নেস তেল অপসারণে গতকাল একশ’ নৌকায় করে দুই শতাধিক স্থানীয় শ্রমিক কাজ করছেন। শুক্রবার সকাল থেকে তেল অপসারণে কাজ শুরু করা হয়। সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. আমির হোসাইন চৌধুরী জানিয়েছেন, দ্রুত তেল অপসারণে গতকাল শনিবার থেকে নৌকা ও শ্রমিকের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। গতকাল বিকেল পর্যন্ত সংগ্রহ হয়েছে প্রায় ২৩ হাজার লিটার তেল। এভাবে হাতুড়ে উপায়ে তেল তোলা হলে অন্তত মাস দুয়েক সময় লাগতে পারে বলে   সংশ্লিষ্ট অনেকের ধারণা। এদিকে জোয়ারের সময় খালগুলোতে যেন ফার্নেস অয়েল যেতে না পারে সে জন্য বৃহস্পতিবার ১৮টি খালের মুখে ভাসমান পাইপ দেয়া হয়েছে।
পাঁচ দিনেও দেখা মেলেনি ডলফিনের
কয়েক বছর আগেও প্রাণি বিজ্ঞানীদের কাছে ইরাবতি ছিল হারিয়ে যাওয়া ডলফিন। বিশ্বের সবাই জানতো ইরাবতি ডলফিন পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বাংলাদেশের একদল প্রাণি বিজ্ঞানী কয়েক বছর আগে সুন্দরবনসহ উপকুলে খুঁজে পান হারিয়ে যাওয়া ওই ইরাবতিসহ ৬ প্রজাতির ডলফিন। হারিয়ে যাওয়া ডলফিন ইরাবতি সুন্দরবনে রয়েছে এ খবরে তখন বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। সুন্দরবনে শেলা নদীতে মঙ্গলবার ফার্নেস অয়েল বোঝাই ট্যাঙ্কার ডুবির পর তেল ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। ওই দিন থেকে শেলা নদীতে ডলফিনের অভয়াশ্রমে আর দেখা মিলছে না ডলফিনের। এগুলো হয়ত দূরে কোথাও সরে গেছে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সুন্দরবন বিষয়ে অভিজ্ঞ ও পরিবেশবিদ ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম ইত্তেফাককে জানান, ইরাবতিসহ সুন্দরবনের ৬ প্রজাতির ডলফিন খুবই স্পর্সকাতর। তারা যখন বুঝেছে তাদের অভয়াশ্রম আক্রান্ত হয়েছে তারা দ্রুতই স্থান ত্যাগ করেছে এমনটিই মনে হচ্ছে। সুন্দরবনের বিস্তীর্ণ এলাকায় ফার্নেস অয়েল ছড়িয়ে পড়ায় ডলফিন যদি সুন্দরবন ত্যাগ করে তবে বিচিত্র হবার কিছু নেই। তিনি আরো জানান, সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী সুন্দরবনে ৪৪৪টি রয়েল বেঙ্গল টাইগারের মধ্যে ৬৩টির বসবাস এই শেলা নদী এলাকায়। এ রয়েল বেঙ্গল টাইগারেরও দেখা মিলছে না।
শেলা রুট বন্ধে বিআইডাব্লিউটিএকে ৭টি চিঠি
সুন্দরবনের শেলা নদী দিয়ে নৌচলাচল বন্ধ করতে সুন্দরবন বিভাগ গত ৩ বছরে ৭ বার চিঠি দেয়  বিআইডাব্লিউটিএ’কে। সুন্দরবন বিভাগের ওই সব চিঠিতে জাহাজ চলাচলে শেলা নদীতে ইরাবতি ডলফিনসহ ৬ প্রজাতির ডলফিনের অভয়াশ্রম ও সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যে বিরূপ প্রভাব পড়ছে বলে জাহাজ চলাচল বন্ধ করতে বলা হয়। কিন্তু বছরে এসব চিঠিতে কর্ণপাত না করে অবৈধভাবে জাহাজ চলাচল অব্যাহত রাখে বিআইডাব্লিউটিএ। এ তথ্য জানিয়েছেন, পূর্ব সুন্দরবনের বিভাগের ডিএফও আমির হোসাইন চৌধুরী।
এগিয়ে এসেছে বনের পাশের শত শত মানুষ
সুুন্দরবনকে বাঁচাতে এগিয়ে এসেছে বনসন্নিহিত লোকালয়ের মানুষসহ জেলে ও বনজীবীরা। পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের ব্যবস্থাপনায় দ্বিতীয় দিনে একশ’ নৌকা নিয়ে ২১টি খালে নেমে পড়েছে কয়েকশ’ জেলে-বনজীবী। এতথ্য নিশ্চিত করেছেন রেঞ্জ অফিসার গাজী মতিয়ার রহমান। শুক্রবার বনসন্নিহিত লোকালয়ের মানুষসহ জেলে ও বনজীবীরা খালে ছড়িয়ে পড়া তেল আহরণ করেছে প্রায় ৫ হাজার লিটার। ৩০ টাকা লিটার দরে আহরিত ওই তেল সুন্দরবনে বসেই কিনে নিয়েছে পদ্মা অয়েল কোম্পানি। শনিবার নৌকা নিয়ে নেমে পড়া কয়েকশ’ জেলে-বনজীবী আরো কয়েক হাজার লিটার ভাসমান তেল আহরণ করতে পারবে বলে আসা করছে বন বিভাগ। সর্বশেষ খবরে জানা গেছে, শনিবার বিকাল ৩টা পর্যন্ত এভাবে সর্বমোট ২৩ হাজার লিটার আহরিত তেল কিনেছে পদ্মা অয়েল কোম্পানি। পদ্ম অয়েলের সহকারী ব্যবস্থাপক ইব্রাহিম হামিদুর রহমান এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
করমজলের ৭ কুমির ছানা আক্রান্ত
সুন্দরবনের করমজলে অবস্থিত দেশের একমাত্র কুমির প্রজনন কেন্দ্রটির কুমিরও আক্রান্ত হয়েছে শেলা নদীর ছড়িয়ে পড়া তেলে। প্রজনন কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা করমজল ফরেস্ট রেঞ্জার ও কুমির বিশেষজ্ঞ আব্দুর রব জানান, প্রতিদিনের ন্যায় বৃহস্পতিবারও কুমির খামারের পানি পরিবর্তনের জন্য নদীর পানি তোলা হয়। শুক্রবার বিকেলে কুমির প্রজনন কেন্দ্রের ৭টি কুমিরের বাচ্চার মুখে ক্ষত দেখা  দিয়েছে।
সঙ্কটে সুন্দরবনের ৩৫ প্রজাতির ম্যানগ্রোভ গাছ। সারা বিশ্বে ছড়িয়ে-ছটিয়ে থাকা ৫০ প্রজাতির ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদের মধ্যে ৩৫টি প্রজাতি রয়েছে আমাদের সুন্দরবনে। তবে সুন্দরবনে থাকা ৩৩৪ প্রজাতির গাছপালার মধ্যে মাত্র ৩৫ প্রজাতিই ম্যানগ্রোভ প্রজাতির উদ্ভিদ। সুন্দরবনে ৬ হাজার ১৭ বর্গ কিলোমিটার আয়তনে বাংলাদেশ অংশে স্থল ভাগের পরিমাণ ৪ হাজার ১শ’ ৪৩ বর্গ কিলোমিটার। আর ৪৫০টি ছোট-বড় নদী ও খাল নিয়ে জল ভাগের পরিমাণ ১ হাজার ৮৭৪ বর্গ কিলোমিটার। গাছ চুরি, ঝড়-জলচ্ছ্বাসের কারণে ৩৭ বছরে সুন্দরবনের আয়তন কমেছে ১৪৪ বর্গকিলোমিটার। সুন্দরী গাছ কমেছে ২৮ দশমিক ৭৫ শতাংশ।
আটকা ২ শতাধিক লাইটারেজ জাহাজ 
সুন্দরবনের অয়েল ট্যাংকার ডুবির পর বন্ধ করে দেয়া হয় শেলা নদীর চ্যানেলটি। ফলে মংলা বন্দরে আটকা পড়েছে ২ শতাধিক লাইটারেজ জলযান। এসময় জলযানের মাস্টার ও ক্রুরা কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। সারা দেশের সাথে মংলা বন্দরের নৌ যোগাযোগ কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। মংলা বন্দরে অবস্থানরত ১১টি জাহাজে পণ্য উঠানামার কাজ ব্যাহত হচ্ছে। মংলা বন্দর হারবার মাস্টার খান মোঃ আখতারুজ্জামান এ তথ্য জানান।
নৌ পরিবহন মন্ত্রীর ঘটনাস্থল পরিদর্শন
গতকাল দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শনে এসে নৌ পরিবহন মন্ত্রী শাহজাহান খান বলেন, দ্রুত তেল অপসারণ ও সুন্দরবনের ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনতে রবিবার (আজ) আন্তঃমন্ত্রণালয়ের বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। তেলের প্রভাবে সুন্দরবনের গুরুতর কোনো ক্ষতি হবে না বলে নৌ-পরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান আশাবাদ ব্যক্ত করেন। মন্ত্রী বলেন, আমরা বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা জানিয়েছে যে এতে মারাত্মক ক্ষতি হবে না। চাঁদপাই রেঞ্জ পরিদর্শনকালে দুপুরে সাংবাদিকদের তিনি এসব কথা বলেন। ভাসমান তেল আহরণে সরকারের গৃহিত পদক্ষেপের উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে তেল অপসারণ অত্যন্ত কার্যকর একটি পদক্ষেপ।
নৌ-মন্ত্রী আরও বলেন, তেলের কারণে সুন্দরবনে এখন পর্যন্ত খুব বেশি প্রভাব পড়েনি। জলজ প্রাণির তেমন কোন ক্ষতি হয়নি। ঘষিয়াখালী চ্যানেলটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাধ্য হয়ে শেলা নদীর রুটটি ব্যবহার করতে হয়েছে বলে তিনি জানান। আন্তর্জাতিক টেন্ডারের মাধ্যমে ঘষিয়াখালীর চ্যানেলের খনন কাজ শুরু হয়েছে, আগামী এক বছরের মধ্যে সমস্যার সমাধান হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। পরিদর্শনকালে মন্ত্রীর সাথে ছিলেন পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের তদন্ত টিমের প্রধান মো: নুরুল করিম, মংলা বন্দরের চেয়ারম্যান কমডোর হাবিবুর রহমান ভুঁইয়া, নৌ মন্ত্রণালয়ের তদন্ত টিমের প্রধান যুগ্ম-সচিব নূরুর রহমান, বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক মু: শুকুর আলী, পুলিশ সুপার নিজামুল হক মোল্যা, কোস্টগার্ড মংলাস্থ ঘাটির সিও ক্যাপ্টেন কাজী মেহেদী মাসুদ প্রমুখ।
সুন্দরবনে তেল ছড়িয়ে পড়ার  ঘটনায় ভারতেও সতর্কতা

সুন্দরবনের শেলা নদীতে তেলবাহী ট্যাংকার ডুবে বিস্তীর্ণ এলাকায় ফার্নেস তেল ছড়িয়ে পড়ায় বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনের নিজেদের অংশে সতর্কতা জারি করেছে ভারত। সুন্দরবন অংশের প্রাণি সংরক্ষণ বিভাগের উপপ্রধান প্রদীপ বিশ্বাস রয়টার্সকে এ তথ্য জানিয়েছেন। গত মঙ্গলবার সকালে মংলা বন্দর সংলগ্ন সুন্দরবনের শেলা নদীতে ৭৭ হাজার গ্যালন (প্রায় সাড়ে তিন লাখ লিটার) ফার্নেস তেল নিয়ে ডুবে যায় একটি ট্যাংকার। যা এরই মধ্যে তেল ছড়িয়ে পড়েছে নদীর ৮০ কিলোমিটার এলাকায়। ফলে সুন্দরবনের পরিবেশ ও বন্যপ্রাণির ওপর সরাসরি বিরূপ প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। এ ঘটনায় জাতিসংঘসহ কিছু আন্তর্জাতিক সংগঠন উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।