শোকের নয়, শপথের দিন

আপডেট : ১৪ ডিসেম্বর ২০১৪, ১১:৫২

বয়স যখন বিয়াল্লিশের দিকে যাচ্ছিল, তখন কী এক শঙ্কা চেপে বসেছিল আমার মনে। এই বয়সেই একাত্তর সালে আমার বাবা সিরাজুদ্দীন হোসেনকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও আল বদরের সদস্যরা। তিনি আর ফিরে আসেননি। দিনটি ছিল ১০ ডিসেম্বর, ১৯৭১।
ভালোয় ভালোয় আমার বিয়াল্লিশ বছর বয়সের জন্মদিন এল। দিনটি চলে গেলে মনে মনে বলেছি, ‘বাবা, আমি এখন আপনার চেয়ে বয়সে বড়’।  এরপর আরো কয়েক বছর কেটে গেছে। আস্তে আস্তে গোঁফে আর চুলে পাক ধরছে। মাথার চুল পাতলা হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আমি এখনও যখন আমার বাবার ছবির দিকে তাকাই; দেখি, সেখানে সিরাজুদ্দীন হোসেনের বয়স স্থির হয়ে আছে। বাড়ছে না একদম।
সিরাজুদ্দীন হোসেনের বয়স আর বাড়বে না। বাড়বে না আলতাফ মাহমুদ, শহীদুল্লা কায়সার, মুনীর চৌধুরীর বয়স। বাড়বে না জিসি দেব, জ্যোতির্ময় গুহ ঠাকুরতা, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, রাশীদুল হাসানের বয়স। বাড়বে না নাজমুল হক, নিজামুদ্দীন আহমেদ, আনোয়ার পাশা, শহীদ সাবেরের বয়স। বাড়বে না আজহারুল হক, ডা. আলীম চৌধুরী, ডা. ফজলে রাব্বির বয়স। এই তালিকা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর করা যায়। একাত্তরের মৃত্যুর মিছিল ছিল এত বিশাল যে, শহীদদের নামগুলো লিখতে শুরু করলে তা বাংলাদেশের একপ্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত পর্যন্ত ছড়িয়ে যাবে।
১৪ ডিসেম্বর দিনটি আসে শীতের কাঁপন নিয়ে। স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি, ১০ ডিসেম্বর থেকে ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত ঢাকা শহরে যে বুদ্ধিজীবীদের ধরে নিয়ে গিয়েছিল আলবদর বাহিনী, তাদের অনেকেরই পরনে ছিল শুধু লুঙ্গী আর গেঞ্জি। কনকনে শীতের রাতে তাঁরা পাঞ্জাবি আর চাদর পরতে চাইলেও ঘাতকরা সে সুযোগ তাঁদের দেয়নি। আরো স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি, ডিসেম্বরের শুরু থেকেই পরাজয়ের স্বাদ পেতে শুরু করেছিল পাকিস্তানিরা। ডিসেম্বরের ৯ আর ১০ তারিখে আল বদরদের দেয়া তালিকা নিয়ে পিলখানায় (তত্কালীন ইপিআর হেডকোয়ার্টার) বৈঠক করেছিল লেফটেন্যান্ট জেনারেল নিয়াজী, মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী এবং মেজর জেনারেল জামশেদ। তাদের হাতে থাকা বুদ্ধিজীবীদের তালিকা অনুযায়ী যথাবিহিত ব্যবস্থা গ্রহণ বিষয়ে তারা আলোচনা করেন। সেই রাত থেকেই কাদা মাখা মাইক্রোবাসগুলো যেতে থাকে নিরস্ত্র বুদ্ধিজীবীদের বাড়িতে। মাফলারে মুখ বেঁধে আল বদররাই গিয়েছিল বুদ্ধিজীবীদের কাছে। এরপর মোহাম্মদপুরের শারীরিক শিক্ষা কেন্দ্র বা মিরপুরের কোন এলাকায় এঁদের অমানবিক নির্যাতন করা হয়। এই বুদ্ধিজীবীদের কারো কারো লাশ পাওয়া যায় রায়েরবাজার, কাটাসুর কিংবা মিরপুরের বধ্যভূমিতে।
ড. আলীম চৌধুরীর মেয়ে নুজহাত চৌধুরীর কথা শুনে চমকে উঠি! বাবার লাশ যেদিন নিয়ে আসা হলো বাড়িতে, সেদিন বাড়ির কেউ ২ বছর বয়সী নুজহাতের দিকে নজরও দেয়নি। নুজহাত বাবার বুকে ঘুমাতো। জড়ো হওয়া নির্বাক মানুষদের মাঝ দিয়েই নুজহাত বাবার লাশ দেখে ফেলে। যে বুকে নুজহাতকে বুকে তুলে নিতেন ডা. চৌধুরী, সেই বুকের জায়গাটায় সাদা কাপড় ভেদ করে রক্ত এসে ছড়িয়ে পড়েছে। নুজহাত জীবনে এই দৃশ্য ভোলেনি। চঞ্চল মেয়েটা এরপর একেবারে অন্যরকম শান্ত হয়ে গিয়েছিল। শহীদুল্লা কায়সারের মেয়ে শমী কায়সার কিংবা মুনীর চৌধুরীর ছেলে আসিফ মুনীর কিংবা সিরাজুদ্দীন হোসেনের ছেলে তৌহিদ রেজা নূর ফিরে পায়নি তাঁদের প্রিয়জনের লাশ। জীবনের একটা বড় সময় ধরে তাঁরা আশায় বুক বেঁধে থেকেছে, ভেবেছে, কোনো একদিন হয়ত অলৌকিকভাবে ফিরে আসবে বাবা। কিন্তু তারা খুব দ্রুতই বুঝে ফেলে যে এই আশাবাদের কোনো বাস্তব ভূমি নেই। শূন্যতায় শোকসভা করাই তাঁদের নিয়তি। দিনের পর দিন চলে যেতে থাকে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ফিকে হতে থাকে। এরই মধ্যে রাজনীতির মাঠে শুরু হয় এক অদ্ভুত খেলা। সব কিছু বদলে যায়। ১৯৭৫ সালে হত্যা করা হয় বঙ্গবন্ধুকে। তারপর দেশকে সুকৌশলে উল্টোদিকে নিয়ে যাওয়া শুরু হয়। পাকিস্তানি দালাল শাহ আজিজ হন দেশের প্রধানমন্ত্রী। মশিউর রহমান জাদু মিয়া, মওলানা মান্নানেরা হন মন্ত্রী। এ ছিল স্বৈরাচারী সামরিক দুই একনায়ক জিয়াউর রহমান ও হোসাইন মোহাম্মদ এরশাদের আমল। এরপর তো গণতান্ত্রিক খালেদা জিয়ার শাসনামলে আল বদর বাহিনীর দুই চাঁই নিজামী ও মুজাহিদ মন্ত্রী বনে গেলেন! এ দেশে আর কোনোদিন মানবতাবিরোধীদের বিচার হবে, সে কথা বিশ্বাস করতেও ভুলে যাচ্ছিল দেশের মানুষ। এই দুইয়ের মাঝেই বিগত শতাব্দীর নব্বইয়ের দশকের শুরুতে হঠাত্ দেখা যায় শহীদ জননী জাহানারা ইমামকে। ঘাতক দালালদের নির্মূল করার কথা বলে তিনি শুকিয়ে যাওয়া মনগুলোয় জলসিঞ্চন করেন। গোলাম আজমের প্রতীকী বিচার সেদিন সারা বাংলার মানুষের মনে আশার সঞ্চার করেছিল। তারপর আবার গণতন্ত্রের নামে রাজাকার-আল বদর নেতাদের তোষণ নীতিই চলল। আমরা যারা মুক্তির মন্দির সোপান তলে লাখ লাখ প্রাণ বলিদান হতে দেখলাম, তারা বুঝলাম, এ দেশ আজ হায়েনার, এ দেশ আজ শকুনের। কিন্তু এ দেশের তরুণেরা সেই হতাশা কাটিয়ে আবার আশার আলোয় নিয়ে এল দেশের জনগণকে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে তাঁরা ঐক্যবদ্ধ হলো। দেখিয়ে দিল, দেশপ্রেম মরে যাওয়ার মতো নয়। তরুণেরা নেশার রাজ্যে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে না কিংবা স্মার্টফোন আর ফেসবুকেই নিজেদের ব্যস্ত রাখছে না, দেশের প্রয়োজনে তারা দেশের মানুষকে ঠিক পথে আসতে বাধ্য করছে।
এইটেই আশার কথা। তেতাল্লিশ বছর অপেক্ষার পর আমরা প্রমাণ পেলাম, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ কখনো তামাদি হয় না। আমরা জানলাম, তরুণেরাই বদলে দিতে পারে সবকিছু। আমাদের হাতে রিলে রেসের যে ‘ব্যাটন’টা রয়েছে, সেটি আমরা তরুণদের হাতে দিয়ে দিলাম। জানি, ওরা পিছু হটবে না। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘উত্তরাধিকার’ কবিতায় নবীন কিশোরকে সবকিছু দিয়ে দিচ্ছিলেন কবি। এবং একেবারে শেষ পংক্তিতে এসে বলেছিলেন, ‘তোমাকে আমার তোমার বয়সী সবকিছু দিতে বড় সাধ হয়।’ আমি এবং স্বজন-হারানো আমার বন্ধুরাও তরুণদের সবকিছু দিতে প্রস্তুত। কেবল চাইব, আমাদের পূর্বসূরীরা যে দেশের জন্য জীবন দিয়ে গেছে, সে দেশের মাটিকে যেন কেউ কলুষিত করতে না পারে, তার দায়িত্ব নিতে হবে এই তরুণদের। মন বলছে, তরুণরা সে শপথ নেবে। আমরা বুঝব, ১৪ ডিসেম্বর শোকের নয়, শপথের দিন।    
 লেখক : সাংবাদিক [email protected]