মৌলবাদ নির্মূল করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশ গড়ার অঙ্গীকার

আপডেট : ১৪ ডিসেম্বর ২০১৪, ২৩:৪৫

যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের মধ্য দিয়ে প্রাথমিকভাবে যে কাজ শুরু হয়েছে মৌলবাদকে নির্মূল করার মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশ গড়ে তা পূর্ণতা দেবার অঙ্গীকার জানিয়ে পালিত হলো শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। বাংলার বিজয়ের ঊষালগ্নে পাকিস্তানি বাহিনী তাদের দোসরদের সহায়তায় এ দেশের যে মেধাবী সন্তানদের হত্যা করেছিল, সেই শহীদ বুদ্ধিজীবীদের শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেছে দেশবাসী।

যথাযোগ্য মর্যাদায় গতকাল দেশজুড়ে সবাই শ্রদ্ধা জানালো জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের। শোকসন্তপ্ত লাখো মানুষের স্রোত এসে মিলেছিল স্মৃতিসৌধে। আবালবৃদ্ধবনিতা শহীদ বেদীতে শ্রদ্ধা জানিয়ে যুদ্ধাপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির পাশাপাশি মৌলবাদ ও প্রতিক্রিয়াশীল চক্রকে প্রতিহত করার আহ্বান জানান। ভোর থেকেই মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ আর রায়ের বাজার বধ্যভূমিতে মানুষের ঢল নেমেছিল।
শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষে গতকাল রবিবার সকালে রাজধানীর মিরপুর বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনসহ সর্বস্তরের মানুষ শহীদদের স্মরণে বেদীতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করে। সকাল ৮টা ১ মিনিটে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষে শহীদদের স্মরণে স্মৃতিসৌধের বেদীতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। শ্রদ্ধা নিবেদনের পর রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী শহীদ বেদীর সামনে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে নীরবতা পালন করেন। এ সময় বিউগলে করুণ সুর বাজানো হয়। শহীদদের সম্মানে সশস্ত্র বাহিনীর একটি চৌকস দল গার্ড অব অনার প্রদান করে। শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ বুদ্ধিজীবী পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন। পরে শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসাবে দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে নিয়ে শহীদ বেদীতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এ সময়ে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ ও সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য বেগম মতিয়া চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ, ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বীর বিক্রম, নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান, আফম বাহাউদ্দিন নাসিম, সাবেক খাদ্যমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাকসহ দলীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
এরপর জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরিন শারমিন চৌধুরী এবং ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বী মিয়া শহীদ বেদীতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এদিকে বিরোধীদলীয় নেতা বেগম রওশন এরশাদের পক্ষে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন জাপার সংসদ সদস্য নোমান মিয়া, সেলিম উদ্দিন। পরে একে একে শহীদ বেদীতে শ্রদ্ধা জানায় কেন্দ্রীয় ১৪ দল, শহীদ পরিবারের সন্তান ও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধারা। তিন বাহিনী প্রধান, মন্ত্রিসভার সদস্য ও সংসদ সদস্যরা এ সময় উপস্থিত ছিলেন।
ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি বেসরকারি বিমান ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন, জাসদের সভাপতি তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু ও সাম্যবাদী দলের দিলীপ বড়ুয়ার নেতৃত্বে ১৪ দলের পক্ষ থেকেও বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা জানানো হয়।  পরে ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, যুব মহিলা লীগসহ ছাত্রলীগ ও বিভিন্ন শাখার পক্ষ থেকে বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়।
প্রধানমন্ত্রী শহীদ বেদী প্রাঙ্গণ ত্যাগ করার পর সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধের দ্বার উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। এসময় জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ দলের শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দদের নিয়ে পুষ্পস্তবক দিয়ে শহীদ বেদীতে শ্রদ্ধা জানান।
অন্যদিকে, একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদ বুদ্ধিজীবীদের প্রতি ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। গতকাল সকাল নয়টা ৫০ মিনিটে রাজধানীর মিরপুরের শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে তিনি এ শ্রদ্ধা জানান। এসময় তার সঙ্গে ছিলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, ড. মঈন খান, এমকে আনোয়ার, ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া, মির্জা আব্বাস, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন, বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব বরকতউল্লাহ বুলু, সালাহউদ্দিন আহমেদ, ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন, আমানউল্লাহ আমান, বিএনপির শিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক খায়রুল কবির খোকন, ঢাকা মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল, ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি সুলতান সালাহউদ্দিন টুকুসহ দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ।
স্বাধীনতা অর্জনের আগ মুহূর্তে ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর এ দিনে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকাররা জাতিকে মেধাশূন্য করতে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান বরেণ্য শিক্ষাবিদ, গবেষক, চিকিত্সক, প্রকৌশলী, সাংবাদিক, কবি ও সাহিত্যিকদের রাতের আঁধারে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে। পরে শরীরে নিষ্ঠুর নির্যাতনের চিহ্নসহ জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের লাশ পাওয়া যায় মিরপুর ও রায়েরবাজার এলাকায়। পরে তা বধ্যভূমি হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠে। নির্মম এ হত্যাকাণ্ডের মাত্র দুই দিন পর ১৬ ডিসেম্বর পাক বাহিনী আত্মসমর্পণ করে এবং স্বাধীন-সার্বভৌম দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে।
চট্টগ্রামে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস পালন
চট্টগ্রাম অফিস জানায়, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায় কার্যকর ও স্বাধীনতা বিরোধী সকল ধরনের কর্মকাণ্ড প্রতিহত করার শপথ গ্রহণের মধ্যদিয়ে চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন সংগঠন শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস পালন করেছে। শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের শ্রদ্ধা জানানো হয়। গতকাল এ উপলক্ষে বিভিন্ন সংগঠন আলোচনা সভা, রক্তদান কর্মসূচি, শীতবস্ত্র বিতরণসহ নানা কর্মসূচি পালন করে।
শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষে গতকাল রবিবার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার চত্বরে চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগ আয়োজিত আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের সভাপতি ও সাবেক সিটি মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী।
আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখেন মহানগর আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দীন, আওয়ামী লীগ নেতা শফিকুল ইসলাম ফারুক, খোরশেদ আলম সুজন, আলতাফ হোসেন চৌধুরী বাচ্চু, নঈমউদ্দিন চৌধুরী, অ্যাড. সুনীল কুমার সরকার, বদিউল আলম, এমএ রশিদ, নোমান আল মাহমুদ, শফিক আদনান, চৌধুরী হাসান মাহমুদ হাসনী, অ্যাড. শেখ ইফতেখার সাইমুল চৌধুরী প্রমুখ।
এদিকে, শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষে গতকাল নগরীর থিয়েটার ইনস্টিটিউটে চট্টগ্রাম মহানগর জাতীয়তাবাদী যুবদলের উদ্যোগে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন বিএনপির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান।

মহানগর যুবদলের সভাপতি কাজী বেলালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান বক্তা ছিলেন সিটি মেয়র এম মনজুর আলম। বক্তব্য রাখেন ড. মোহাম্মদ ইনাম উল হক, ড. সিদ্দিক আহমেদ চৌধুরী, ডা. খুরশীদ জামিল চৌধুরী, সাংবাদিক জাহিদুল করিম কচি, মোহাম্মদ শাহনেওয়াজ, ডা. কামরুন্নাহার দস্তগীর, মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিন প্রমুখ। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের উদ্যোগে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষে কর্পোরেশন মিলনায়তনে এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।