নগরের বিভক্ত রাজনীতি, শাটল ট্রেনের বগিভিত্তিক সংগঠন, ছাত্র সংগঠনগুলোর আধিপত্য বিস্তার ও অভ্যন্তরীণ কোন্দলে রক্তাক্ত হচ্ছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। নিভে যাচ্ছে মেধাবীর পথচলা। না ফেরার দেশে চলে যাচ্ছেন বাবা মায়ের অবলম্বন। জ্ঞান নিতে এসে লাশ হয়ে ঘরে ফেরার দৃশ্য যেন থামছেই না। হত্যাকাণ্ড আর সংঘর্ষের পর দিনের পর দিন বন্ধ থাকছে ক্যাম্পাস। এতে শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শহরের দূরত্ব ২২ কিলোমিটার। তবে এখানকার ছাত্ররাজনীতি নিয়ন্ত্রিত হয় চট্টগ্রাম মহানগর থেকে। মহানগরের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের মধ্যে কোন বিভক্তি থাকলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ দুইভাগে বিভক্ত। এক পক্ষের নিয়ন্ত্রণ করেন চট্টগ্রাম মহানগরের সভাপতি ও সাবেক মেয়র এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী। অপর পক্ষের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছিরের। এছাড়া একই গ্রুপের রয়েছে বিভিন্ন উপগ্রুপ।
মূলত চারটি গ্রুপে বিভক্ত বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ। এর মধ্যে শাটল ট্রেনের বগিভিক্তিক সংগঠন ভার্সিটি এক্সপ্রেস (ভিএক্স), চুজ ফ্রেন্ড উইথ কেয়ার (সিএফসি) ও ক্যাম্পাস ছাত্রলীগ মহিউদ্দিন চৌধুরীর অনুসারী। অন্যগ্রুপটি ‘নাছির গ্রুপ’ নামে পরিচিত। এটি নিয়ন্ত্রণ করেন আ জ ম নাছির।
রবিবার ক্যাম্পাসে দুই পক্ষের সংঘর্ষে নিহত হন ছাত্রলীগ কর্মী তাপস সরকার। তাপস সংস্কৃত বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্র ছিলেন। কথা কাটাকাটির জের ধরে শাটল ট্রেনের বগিভিত্তিক সংগঠন ভার্সিটি এক্সপ্রেস (ভিএক্স) ও চুজ ফ্রেন্ড উইথ কেয়ারের (সিএফসি) সদস্যরা সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়লে নিহত হন তাপস।
বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালেও মহানগরের মাধ্যমেই নিয়ন্ত্রিত হতো বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদল। একটি গ্রুপের নিয়ন্ত্রণ করতেন আবদুল্লাহ আল নোমান অন্যগ্রুপটি নিয়ন্ত্রণ করতেন সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী।
ছাত্রশিবির, ছাত্রফ্রন্ট, ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্র ফেডারেশন, ছাত্রমৈত্রী, জাতীয় ছাত্রদল-এসব সংগঠগুলোর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব খুব একটা চোখে না পড়লেও ছাত্রলীগের দ্বন্দ্ব সব সময়ই দৃশ্যমান। ক্যাম্পাসের পাঁচ দশকে আধিপত্য বিস্তারে ছাত্রলীগ-ছাত্রশিবির, ছাত্রদল-ছাত্রলীগ, ছাত্রদল-ছাত্রশিবিরের মধ্যে শতাধিক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে প্রতিপক্ষের ও স্বপক্ষের আঘাতে প্রাণ হারিয়েছে ১৮ শিক্ষার্থী।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য অধ্যাপক আব্দুল মান্নান বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোই এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করছে। এখানকার সবকিছু চট্টগ্রাম মহানগর থেকেই বলে দেয়া হয়। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বা প্রশাসনের কিছুই করার নেই।
কোন বিচার নেই
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পাঁচ দশকে ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক সহিংসতায় বলি ১৮ জন হলেও কোনোটিরই বিচার হয়নি। এইসব হত্যাকাণ্ডসহ সহিংসতা ও সংঘর্ষের ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে বরাবর তদন্ত কমিটি করা হলেও বেশিরভাগ কমিটির প্রতিবেদন আলোর মুখ দেখে না।
একটু পেছনে ফেরা
ক্যাম্পাসে হত্যাকাণ্ডের বেশির ভাগই ঘটেছে জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র শিবিরের নেতাকর্মীদের হাতে। আর ছাত্রলীগের নিয়ন্ত্রণাধীন শাটল ট্রেনের বগিভিত্তিক সংগঠনের কোন্দলেও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।
১৯৮৩ সালে জাতীয় ছাত্র সমাজের কর্মী হামিদের হাত কেটে ক্যাম্পাসে সহিংসতা শুরু করে শিবির। ১৯৮৮ সালের এপ্রিলে শিবির কর্মীদের হামলায় নিহত হয় পরিসংখ্যান বিভাগ দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র আমিনুল ইসলাম।
১৯৯০ সালের ২৩ ডিসেম্বর স্বৈরাচার পতনের পর ক্যাম্পাসে ছাত্র-শিক্ষকদের আনন্দ মিছিলে শিবিরের হামলায় নিহত হন ছাত্র মৈত্রীর নেতা ফারুকুজ্জামান ফারুক। আহত হন তত্কালীন উপাচার্য আলমগীর মোহাম্মদ সিরাজ উদ্দিনসহ অনেক শিক্ষক-শিক্ষার্থী।
১৯৯৪ সালের ২৭ অক্টোবর শিবিরের হামলায় আহত হয়ে ৯ নভেম্বর চিকিত্সাধীন অবস্থায় মারা যান বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক ও ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক (পরবর্তীতে কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য) অধ্যাপক এনামুল হকের ছেলে নূরুল হুদা মুছা।
১৯৯৭ সালে ক্যাম্পাসের মোজাম্মেল কটেজে ও পরের বছরের ৬ মে শাহ আমানত হলে শিবিরের হামলায় নিহত হয় দুই ভর্তি পরীক্ষার্থী বরিশাল থেকে আসা আমিনুল ইসলাম বকুল ও আইয়ুব আলী। অবশ্য ছাত্রলীগ ও শিবির নিহত দু’জনকে তাদের কর্মী বলে দাবি করে।
চবি ছাত্রলীগ মহানগরী আওয়ামী লীগের
সাথে সম্পৃক্ত নয়
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৪ ডিসেম্বর সংঘটিত ঘটনা প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম মহানগরী আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ.জ.ম নাছির উদ্দিন ইত্তেফাককে বলেন, এই সংগঠনটি মহানগরী আওয়ামী লীগের সাথে সম্পৃক্ত নয়। সংবিধান অনুযায়ী ছাত্রলীগ আওয়ামী লীগের অঙ্গ সংগঠন নয়, সহযোগী সংগঠন। তাদের একটি আলাদা সাংগঠনিক কাঠামো আছে। কাজেই তাদের কর্মকাণ্ডে সরাসরি হস্তক্ষেপ নগর আওয়ামী লীগের এখতিয়ারে পড়ে না।
