যুদ্ধাপরাধী বিচার ও জামায়াত নিষিদ্ধের দাবিতে সাংস্কৃতিক বিজয় উৎসব

আপডেট : ১৬ ডিসেম্বর ২০১৪, ২২:১৫
 
 
 
‘যুদ্ধাপরাধী বিচার দ্রুত সম্পন্ন ও জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার দাবিতে উদ্যাপিত হলো বিজয় উত্সবের ৪৩ বছর। এই দিবসকে ঘিরে মঙ্গলবার রাজধানীর সাংস্কৃতি অঙ্গন ছিল আনন্দমুখর। ভোরের কুয়াশা চিরে, লাল-সবুজের পতাকা বুকে ধারণ করে হাজার হাজার মানুষ ছোটে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, সাভারের স্মৃতিসৌধ অভিমুখে ছিল মানুষের স্রোত। শিশু-কিশোররা ছুটেছে সেগুনবাগিচার মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে। অনেকে ভিড় করেন ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরে। মঞ্চে মঞ্চে ছিল একাত্তরে প্রেরণাদায়ক সঙ্গীত, দেশাত্মবোধক গান, নাচসহ নানা আয়োজন। সেই সঙ্গে আবারও দৃঢ় কণ্ঠে দাবি— যুদ্ধাপরাধী বিচার দ্রুত সম্পন্ন ও  জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার।
            সকালে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে বের হয় সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের বিজয় শোভাযাত্রা। এ শোভাযাত্রার মূল প্রতিপাদ্য ছিল ‘যুদ্ধাপরাধীদের শাস্তি হচ্ছে ধার্য/গণহত্যাকারী সংগঠনের বিচার অনিবার্য’। আনন্দ উত্সবে নানা সংগঠনের সঙ্গে এদিন যুক্ত হয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্লগসম্পৃক্ত ডজনখানেক প্রতিষ্ঠান।
 
সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট:
রাজধানীর ১১টি মঞ্চে একযোগে অনুষ্ঠানের আয়োজন করে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট। সকালে শহীদ মিনারের পাদদেশ থেকে বের হয় শোভাযাত্রা। শোভাযাত্রার উদ্বোধন করেন নাট্যজন রামেন্দু মজুমদার । এ সময় উপস্থিত ছিলেন জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ, সাবেক সভাপতি নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু, সাধারণ সম্পাদক হাসান আরিফ প্রমুখ। শোভাযাত্রা পূর্ব বক্তৃতায় জোট বলেন, ‘যুদ্ধাপরাধী বিচার সম্পন্ন করে দেশ থেকে কলঙ্ক মোচন করতে হবে। বিচার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত যারা এখনও দেশে-বিদেশে ষড়যন্ত্র করে চলেছে তাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে। কোনো অপশক্তির কাছে কিছুতেই মাথা নত করা যাবে না। একই সঙ্গে যুদ্ধাপরাধ সংগঠিত করার সংগঠন হিসেবে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করে এদেশে রাজনীতি থেকে বিতাড়িত করতে হবে।’ শোভাযাত্রায় ১৬টি দেশীয় বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে নেচে-গেয়ে আনন্দ উল্লাস মেতে উঠেন জোটভুক্ত শতাধিক সংগঠনে কয়েক হাজার সংস্কৃতি-কর্মী ও সাধারণ মানুষ। তারা নানা রকম প্লাকার্ড, ব্যানার বহন করে।  শোভাযাত্রাটি কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে শুরু করে শাহবাগ হয়ে পুনরায় শহীদ মিনারে এসে শেষ হবে। এবারের শোভাযাত্রায় মূল মোটিভ হিসেবে উপস্থাপিত হয় সদ্যপ্রয়াত শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরীর আঁঁকা মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক একটি বিখ্যাত ছবি।
            বিজয় উত্সবের চতুর্থ দিন মঙ্গলবার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পাদদেশে ছিল নানা আয়োজন । এ দিন একক সঙ্গীত পরিবেশন করেন মহাদেব ঘোষ, মাফিয়া রহমান দিঠি, জাহিদ চৌধুরী. সফিউল আলম রাজা, এস এম মেসবাহ প্রমুখ। দলীয় সঙ্গীত পরিবেশন করে উদীচী ও সত্যেন সেন শিল্পী গোষ্ঠী। বৃন্দ আবৃত্তি পরিবেশন করে স্বরশ্রুতি, ঢাকা স্বরকল্পন, সংবৃতা ও মুক্তধারা। একক আবৃত্তি পরিবেশন করেন নায়লা তারান্নুম কাকলী প্রমুখ।
অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন মানজার চৌধুরী সুইট। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের শিশু মঞ্চে দলীয় পরিবেশনায় অংশ নেয় কেন্দ্রীয় খেলাঘর আসর, কিশোর-কিশোর মঞ্চ, মানিকগঞ্জ শিশু ফোরাম, মৈত্রী শিশু দল, আমরা করব জয়, সোনার বাংলা সংস্কৃতি ফোরাম, শিল্পকৃত্য, তক্ষশীলাসহ কয়েকটি শিশু সংগঠনের শিশুরা।
 
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর:
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে ছিল শিশু-কিশোরদের পরিবেশনায় বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এতে অংশ নেয় সোসাইটি ফর দি ওয়েলফেয়ার অব অটিস্টিক চিলড্রেন, কল্পরেখা, খেলাঘর, স্পন্দন ও ইউসেপ টুইটা বোট ফিল্ড স্কুলের শিক্ষার্থীরা। বিকেলে কবি গান পরিবেশন করে মংলা বাগেরহাটের মীরা সরকার—কৃষ্ণ কান্ত সরকার ও তাদের দল।
            মিরপুরের জল্লাদখানা বধ্যভূমি স্মৃতিপীঠে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিভিন্ন পরিবেশনায় অংশ নেয় চারুলতা একাডেমি, সপ্তডিঙ্গা শিশু-কিশোর সংগঠন, সে্রাত আবৃত্তি সংসদ,  আমরা কুঁড়ি সাংস্কৃতিক একাডেমি,  বধ্যভূমি সন্তান দল, বুলবুল একাডেমি অব ফাইন আর্টস (বাফা),  মিথস্ক্রিয়া আবৃত্তি পরিষদ, মিরপুর সাংস্কৃতিক একাডেমি। নাটক পরিবেশন করে মিরপুর সাংস্কৃতিক ঐক্য ফোরাম।
 
শিল্পকলা একাডেমি:
একাডেমির জাতীয় নাট্যশালার প্রধান মিলনায়তনে আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়। এতে প্রধান আলোচক ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট মাহবুবে আলম। অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য নূহ উল আলম লেনিন, জনপ্রশাসন সচিব কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী, বিটিভির মহাপরিচালক আসাদ মান্নান। সভাপতিত্ব করেন একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকী। সাংস্কৃতিক পর্বে গণসঙ্গীত পরিবেশন করেন স্বাধীনবাংলা বেতারের কেন্দ্রের শিল্পীরা। সমবেত নৃত্য পরিবেশন করে নন্দন কলা কেন্দ্র ও ধৃতি নর্তনালয়। একক সঙ্গীত পরিবেশন করেন সুবীর নন্দী, মলয় কুমার গাঙ্গুলী, শাকিলা জাফর, সুজিত্ মোস্তাফা, ছায়া কর্মকার, দিনাত জাহান মুন্নী, বুলবুল মহলানবীশ, সালমা চৌধুরী, শাহনাজ বেলী প্রমুখ। কবি কণ্ঠে কবিতা পাঠ করেন নির্মলেন্দু গুণ ও হাবীবুল্লাহ সিরাজী। একক আবৃত্তি করেন সৈয়দ হাসান ইমাম ও মনজুরুর রহমান। অর্কেস্ট্রা পরিবেশন করেন মোহাম্মদ শোয়েব ও শিউলি ভট্টাচার্য। সবশেষে ছিল অ্যাক্রোবেট ও জাদু প্রদর্শনী। 
 
কেন্দ্রীয় কচি-কাঁচার মেলা:
সেগুনবাগিচার কচি-কাঁচা মিলনায়তনে আলোচনা সভা ও আনন্দানুষ্ঠানের আয়োজন করে কচি-কাঁচার মেলা।  অনুষ্ঠানে আলোচক ছিলেন মেলার ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য ডি ডি ঘোষাল, ড. রওশন আরা ফিরোজ, রাশিদুল হাসান জুনায়েদ ও শিশুবক্তা রাহামনি। সভাপতিত্ব করেন মেলার পরিচালক খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ। সাংস্কৃতিক পর্বে অংশ নেয় কথাবিতান, সুরবিতান ও নৃত্যবিতান। সবশেষে দেখানো হয় কথাশিল্পী হুমায়ূন আহমেদ পরিচালিত মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র ‘শ্যামল ছায়া’।
 
‘মোরা ঝঞ্ঝার মত উদ্যাম’-এর প্রদর্শনী:
‘ভিন্ন আয়োজনে মহাকাল’ স্লোগান ধারণ করে ‘মোরা ঝঞ্ঝার মত উদ্যাম শীর্ষক কোরিওগ্রাফি পরিবেশ করে নাট্যদল মহাকাল নাট্যসম্প্রদায়। মীর জাহিদ হাসানের পরিকল্পনায়, আমিনুল আশরাফের নির্দেশনায় এবং ঠান্ডু রায়হান এর আলোক পরিকল্পনায় এ আয়োজনে ছিল মুক্তিযুদ্ধের গান, দেশের গান, ডি. এল. রায়, নজরুল, রবীন্দ্র্রনাথ, লোকজ সঙ্গীত। এ নান্দনিক কোলাজ কোরওিগ্রাফীর উদ্বোধন করেন গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশানের সভাপতিমন্ডলির সদস্য ঝুনা চৌধুরী। কোলাজে অংশ নেন—জাহিদুল কামাল চৌধুরী দিপু, আমিনুল আশরাফ, ইকবাল চৌধুরী, সৈয়দ ফেরদৌস ইকরাম, পলি বিশ্বাস, সামসুল আলম, বিথুন আহমেদ, আরিফ হোসেন, রাসেল আহমেদ, বাহার সরকার, রিফাত হোসেন জুয়েল, তৌহিদুর রহমান শিশির, সোনিয়া ইসলাম, সামিউল জীবন, ইমতু রাতিশ, এনামুল হক, আসাদুজ্জামান রাফিন, রাজিব হোসেন, প্রবীর মিত্র, জানেসার, এস. এম. সুমন, আর্ণিকা, সোয়েব মৃধা বাপ্পি, ইমরান খান দ্বীপ, ফারহা, তন্নি, জীবন আহমেদ, হাসান সাদেক রাসেল, বনি ডি. কস্তা, নিশীতা এবং সাথী।