বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের যাদুকরী নিম্ন দর

আপডেট : ১৮ ডিসেম্বর ২০১৪, ০০:৫৩

বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম নিয়ামক জ্বালানি তেলের দামের ক্ষেত্রে চলছে জাদুকরী নিম্নগতি। ব্যাপকহারে দরপতন হওয়ায় একদিকে তেল উত্পাদনকারী দেশগুলো বিপাকে পড়েছে, অপরদিকে যেসব দেশের অর্থনীতি আমদানি তেলের উপর নির্ভরশীল তাদের মুখে হাসি ফুটেছে। বিশ্ববাজারে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের দাম এখন ৫৯ মার্কিন ডলারের নিচে নেমে গেছে। গত জুনে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ১১১ ডলার থাকলেও এখন তা প্রায় ৫০ শতাংশ কমে গেছে। ২০০৯ সালের পরে এটি তেলের সর্বনিন্ম দাম। মূলত চাহিদার বিপরীতে উত্পাদন বেড়ে যাওয়া তেলের এ দরপতনের কারণ। জ্বালানি তেলের দাম ক্রমাগত কমে বা পড়ে যাওয়ায় সমস্যায় পড়েছে লিবিয়া, ইরান, আলজেরিয়া, নাইজেরিয়া, ভেনিজুয়েলা, রাশিয়া, সৌদি আরব, ইরাক, ইউএই, কুয়েত এবং কাতারের মতো বড় তেল উত্পাদনকারী দেশগুলো। দেশগুলো তাদের জাতীয় বাজেট মেলাতে হিমশিম খাচ্ছে। তবে মজার বিষয় হচ্ছে, দাম ক্রমাগত পড়ে গেলেও উত্পাদনকারী দেশগুলোর সংগঠন ওপেক তেল উত্তোলন না কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তেলের দাম কমে যাওয়ায় এমনিতে সংগঠনভুক্ত দেশগুলোর অবস্থা বেগতিক। তার ওপর উত্পাদন কমিয়ে দিলে তাদের সমস্যা আরো বাড়বে। কাতারের তেলমন্ত্রী মোহাম্মদ আল-সাদা বলেছেন, তেল উত্পাদন এবং বাজারজাত একটি জটিল বিষয়। আমাদেরকে খুব সাবধানে এগুতে হবে। দেশগুলো যদি উত্পাদন কমিয়ে দেয় তাহলে জাতীয় বাজেটে এর চাপ পড়বে।
তেলের দাম পড়ে গেলেও আরব এবং আফ্রিকার দেশগুলো তা কোনমতে সামাল দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু বেকায়দায় পড়েছে রাশিয়া। দেশটির জাতীয় অর্থনীতি তেলের দামের উপর নির্ভর করে। পশ্চিমা দেশগুলো ইউক্রেন ইস্যুতে রাশিয়ার উপর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করায় পরিস্থিতি দিন দিন জটিল হচ্ছে। ইতিমধ্যে এক বছরের ব্যবধানে দেশটির মুদ্রা রুবল-এর মূল্যমান মার্কিন ডলারের বিপরীতে ৫০ শতাংশ কমে গেছে। সেখানে ব্যাংক থেকে অর্থ তুলে নিচ্ছে সবাই। ব্যাংকে যাতে অর্থ মজুদ থাকে সেজন্য বিকল্প ব্যবস্থা নিয়েছে রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এজন্য ব্যাংক সুদের হার সাড়ে ১০ শতাংশ থেকে একলাফে বাড়িয়ে ১৭ শতাংশ করা হয়েছে।
যেসব দেশের অর্থনৈতিক শক্তি অপরিশোধিত তেলের উপর নির্ভরশীল সেসব দেশ সবচেয়ে বেকায়দায় পড়েছে। বৃটিশ সংবাদ মাধ্যম বিবিসি তাদের এক রিপোর্টে দেখিয়েছে যে, এসব দেশের অর্থনীতি তেলের উপর  কতটা নির্ভরশীল। লিবিয়ার অর্থনীতি ঠিকঠাক রাখতে হলে প্রতি ব্যারেল তেল তাদেরকে ১৮৪ ডলারে বিক্রি করতে হয়। এছাড়া ইরানের অর্থনীতির জন্য তেলের দাম ১৩১, আলজেরিয়ার জন্য ১৩১ ডলার, নাইজেরিয়ার জন্য ১৩১ ডলার, ভেনিজুয়েলার জন্য ১১৮ ডলার, রাশিয়ার জন্য ১০৫ ডলার, সৌদি আরবের জন্য ১০৪ ডলার, ইরাকের জন্য ১০১ ডলার, ইউএইর জন্য ৮১ ডলার, কুয়েতের জন্য ৭৮ ডলার এবং কাতারের অর্থনীতির জন্য প্রতি ব্যারেল তেল ৭৭ ডলারে বিক্রি করতে হবে। এর কম দামে বিক্রি করলে ওইসব দেশের অর্থনীতিতে ঘাটতি দেখা দেবে।
কার লাভ কার ক্ষতি?
সংবাদ মাধ্যমগুলো বলছে, তেলের দাম পড়তে থাকায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে রাশিয়ার অর্থনীতি। দেশটির অর্থনীতি অনেকটাই নির্ভর করে তেলের উপর। মোট রপ্তানি আয়ের ৭০ শতাংশ আসে তেল এবং গ্যাসখাত থেকে। প্রতি ব্যারেল তেলের দাম এক ডলার করে কমলে রাশিয়ার অর্থনীতিতে দুই বিলিয়ন মার্কিন ডলার ঘাটতি থাকে। বিশ্বব্যাংক সতর্ক করে দিয়েছে ২০১৫ সালের মধ্যে তেলের দাম আশানুরূপ না হলে রাশিয়ার অর্থনীতির আকার এক শতাংশের কাছাকাছি কমে যাবে। তেলের দাম পড়ার আগেই বড় উত্পাদনকারী দেশ ভেনিজুয়েলার অর্থনীতি চাপের মধ্যে ছিলো। দেশটির অর্থনীতিতে চরম মন্দাভাব বিরাজ করছে। ইতিমধ্যে মূল্যস্ফীতি ৬০ শতাংশের কাছাকাছি অবস্থান করছে। এরপরও ভেনিজুয়েলা তেলের অভ্যন্তরীণ ব্যবহারের উপর ভর্তুকি দিয়ে যাচ্ছে। এক হিসেবে দেখা গিয়েছে যে, বছরে এ ভর্তুকির পরিমাণ প্রায় সাড়ে ১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। অতীতের সরকারগুলো অনেক চেষ্টা করেও এ ভর্তুকি কমিয়ে আনতে পারেনি। এবার দেশটি ভর্তুকি কমানোর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে।
তেলের দাম কমে যাওয়ায় ওপেক-এর প্রভাবশালী সদস্য সৌদি আরব উত্পাদন কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে তা থেকে আবার ফিরে আসে। এর প্রধান কারণ দেশটির বাজেটের উপর চাপ এবং ওপেক সদস্যভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে শৃংখলা নিয়ে আসা। ২০০৮ সালে দেশটি একবার তেলের উত্পাদন কমিয়ে বিপদে পড়েছিলো। তখন তেল উত্পাদন কমানোর ফলে সৌদি আরবের অর্থনীতির ক্ষতি হয়েছিল বেশি। ওপেকের গাল্ফ অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে ইউএই এবং কুয়েত তেলের দাম কমে গেলেও আগামী কয়েক বছর সমস্যায় পড়বে না। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সন্তোষজনক  থাকায় দেশগুলোর অর্থনীতিতে তেলের দামের প্রভাব খুব কমই পড়বে।
তেলের দাম কমে যাওয়ায় ইউরোপের দেশগুলোর অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে বলে আশা করছেন কেউ কেউ। এক হিসেবে দেখা যায়, তেলের দাম যদি ১০ শতাংশ কমে তাহলে ইউরোপের দেশগুলোর অর্থনীতি শূন্য দশমিক এক শতাংশ বাড়ে। তেলের বড় আমদানিকারক দেশ চীন সস্তা তেলের সুবাদে অর্থনীতি আরো এগিয়ে নিতে পারবে। উত্পাদন খরচ কমে যাওয়ায় দেশটি প্রতিযোগিতামূলক দামে পণ্য রপ্তানি করতে পারবে। ভারত এবং জাপানের ক্ষেত্রেও একই সত্য প্রযোজ্য বলে সংবাদ মাধ্যম দাবি করছে।