আন্দোলনের ডাকের সঙ্গে বিএনপিতে নানা আশংকা

আপডেট : ১৮ ডিসেম্বর ২০১৪, ২৩:২৬

দশম সংসদ নির্বাচনের একবছর পূর্তির দিন পাঁচ জানুয়ারিকে কেন্দ্র করে রাজনীতিতে এরমধ্যে শুরু হয়েছে এক ধরনের মৃদু উত্তেজনা। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি-দু’পক্ষই মাঠ নিজেদের দখলে রাখার পাল্টাপাল্টি হুংকার ছাড়ছে। তবে দশম সংসদ নির্বাচনের বর্ষপূর্তির দিন এবং পূর্বের ঘোষণা-ইঙ্গিত অনুযায়ী জানুয়ারিতে বিএনপি আন্দোলনের কি ধরনের কর্মসূচি দিতে যাচ্ছে, এ ব্যাপারে এখন পর্যন্ত বলতে গেলে পুরোপুরিই অন্ধকারে বিএনপিসহ দলটির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট নেতারা। সবারই এক কথা-খালেদা জিয়া ছাড়া অন্যদের কেউ এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত স্পষ্ট কিছু জানেন না। আন্দোলনের এই আওয়াজের পাশাপাশি বিএনপি শিবিরে দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তার বা গৃহবন্দী করার, দলে ও জোটে ভাঙন সৃষ্টি এবং নেতা-কর্মীদের ধরপাকড়ের শঙ্কা-ভীতিও রয়েছে।  

এই শঙ্কার বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, ‘সরকার এসব অপচেষ্টা করতে পারে, সেই শঙ্কাতো আমাদের আছেই। তবে এসব অপচেষ্টা অতীতেও সফল হয়নি, এবারও হবে না।’
বিএনপির একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পাঁচ জানুয়ারিকে এরইমধ্যে তারা ‘গণতন্ত্র হত্যা দিবস’ হিসাবে আখ্যায়িত করেছেন। দিনটিকে কেন্দ্র করে বড়রকম কোনো কর্মসূচিতে যাওয়ার এখন পর্যন্ত কোনো দলীয় সিদ্ধান্ত নেই। তবে প্রাথমিকভাবে একাধিক বিকল্প কর্মসূচির বিষয়ে অনির্ধারিত কিছু কথাবার্তা হয়েছে দলীয় চেয়ারপারসনের সঙ্গে। সম্ভাব্য কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে-পাঁচ জানুয়ারি রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে সমাবেশ করা। সমাবেশে খালেদা জিয়া প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখবেন। পাঁচ জানুয়ারির নির্বাচনের পর এখন পর্যন্ত খালেদা জিয়া রাজধানীতে কোনো সমাবেশের অনুমতি পাননি, এই বিষয়টিও দলের মাথায় রয়েছে। এবারও সমাবেশের অনুমতি পাওয়া না গেলে ওইদিন হরতাল কর্মসূচি দেয়ার চিন্তা-ভাবনা আছে। বিকল্প কর্মসূচি হিসাবে ওইদিন রাজধানীতে কালো পতাকা মিছিল বের করার বিষয়েও কথা হচ্ছে। সম্ভাব্য এসব কর্মসূচির বাইরে ওইদিন ঢাকায় একটি প্রতিবাদ সমাবেশ করার বিকল্প চিন্তাও করছেন বিএনপির নীতিনির্ধারকরা।
পাঁচ তারিখ ছাড়াও জানুয়ারি মাসে সরকারবিরোধী আন্দোলন কর্মসূচি নিয়েও বিএনপি ও ২০ দলের ভেতরে আলোচনা আছে। কবে কখন ও কি ধরনের কর্মসূচি দেয়া হবে কিংবা জানুয়ারিতে আদৌ সরকারবিরোধী উল্লেখযোগ্য আন্দোলনে যাবে কিনা-এ ব্যাপারে দল ও জোট নেতারা এখনও অন্ধকারে।
বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, ‘দল থেকে এখনও কোনো কর্মসূচি দেয়া হয়নি। তবে পাঁচ জানুয়ারি কালো দিবস। স্বাভাবিক কারণেই দিনটিতে বিএনপির কর্মসূচি থাকবে।’
বিএনপিসূত্রে জানা গেছে, কর্মসূচির বিষয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন এবার কৌশলি গোপনীয়তা রক্ষা করছেন। পাঁচ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে নেয়া কর্মসূচিসহ বিভিন্ন বিষয়ে যখনই তিনি কোনো সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, সঙ্গে সঙ্গেই সেই তথ্য সরকারপক্ষের কাছে পৌঁছে গেছে বলে দলের ভেতরেই অভিযোগ রয়েছে। এ নিয়ে দলীয় চেয়ারপারসনের আশপাশের লোকজন পরস্পরকে সন্দেহ-অবিশ্বাসের দায়েও দুষছেন। মূলত আস্থা সংকটের কারণেই এবার কর্মসূচির বিষয়ে আগে থেকে কাউকে স্পষ্ট কিছু বলছেন না খালেদা জিয়া। সবাইকে শুধু বলছেন, ‘প্রস্তুত থাকুন, সময়মতো সবকিছু জানবেন।’ অবশ্য দলের নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র জানায়, ২৭ ডিসেম্বর গাজীপুরের সমাবেশে কর্মসূচির বিষয়ে কিছু ইঙ্গিত দেবেন খালেদা জিয়া।
২০ দলের একাধিক শরিক দলের শীর্ষ নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, খালেদা জিয়ার পক্ষ থেকে তাদেরকে এমন ধারণা দিয়ে রাখা হয়েছে যে, এবার কর্মসূচি হবে টানা এবং অল্পদিনের। ১৫ থেকে ২০ দিনের টানা আন্দোলনে সরকারকে পরবর্তী সংসদ নির্বাচন দিতে বাধ্য করানোর পরিকল্পনা রয়েছে। উল্লেখ্য, সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জের কাঁচপুর ব্রিজের কাছে অনুষ্ঠিত ২০ দলের সমাবেশে খালেদা জিয়াও বলেছেন, ‘সরকারকে ১২ মাস সময় দিয়েছি। যথেষ্ট, আর সময় নয়। এবার টানা কর্মসূচি দেয়া হবে।’ সেই কর্মসূচিতে রাজপথে নেমে আসার জন্য তিনি দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান।
জামায়াতের এক কেন্দ্রীয় নেতা ইত্তেফাককে জানান, সরকারবিরোধী আন্দোলন কর্মসূচির বিষয়ে তাদের সঙ্গে বিএনপির এখনও আনুষ্ঠানিক কোনো আলোচনা হয়নি। তবে জানুয়ারিতে কর্মসূচি দেয়া হবে, এরকম প্রাথমিক ধারণা দেয়া হয়েছে। সংক্ষিপ্ত তবে জোরালো কর্মসূচি দেয়া হবে বলেও ইঙ্গিত দেয়া আছে বলে জানান এই নেতা।
খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তারের শঙ্কা
খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তার বা গৃহবন্দী করা হতে পারে, এটি এখন বিএনপি ও ২০ দলের ভেতরে অন্যতম আলোচনার বিষয়। দলটির নেতারা জানান, আন্দোলন ঠেকানোর লক্ষ্যে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্টে অনিয়মের মামলায় খালেদা জিয়াকে জেলে যেতে হতে পারে-এমন শঙ্কা খোদ দলীয় চেয়ারপারসনেরই রয়েছে। শঙ্কা ও অনাস্থা থেকে খালেদা জিয়া নিম্ন আদালতে আর নাও যেতে পারেন।
খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তারের আশঙ্কার বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ইত্তেফাককে বলেন, এ নিয়ে আমরা ভীত নই।
ভাঙন এবং ধরপাকড়ের আশঙ্কা

দলীয় চেয়ারপারসনকে গ্রেপ্তার বা গৃহবন্দী করা হলে তখন বিএনপিকে ভাঙার চেষ্টা করা হতে পারে, দলটির নেতা-কর্মীদের মধ্যে এই আশঙ্কাও ভর করেছে। এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে দলের কতিপয় নেতা যুক্ত রয়েছেন বলে তাদের নামও নিজেদের মধ্যে বলাবলি করছেন। তাদের মতে, পাঁচ জানুয়ারির নির্বাচনের আগেও এই ধরনের চেষ্টা করা হয়েছিল, তবে প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্তরা সফল হয়নি। ওয়ান-ইলেভেনের সময়ও বিএনপিকে ভাঙার চেষ্টা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়। এছাড়া সামনের সম্ভাব্য আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দেশব্যাপী নেতা-কর্মীদের ধরপাকড়ের আশঙ্কা করছেন বিএনপি ও ২০ দলের নেতারা। তাদের দাবি, এরইমধ্যে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সহস াধিক নেতা-কর্মীর তালিকা করেছে। বিএনপির পাশাপাশি ২০ দলীয় জোটেও নতুন করে ভাঙন সৃষ্টির চেষ্টা করা হতে পারে বলেও আশঙ্কা করছেন তারা।