দেশে প্রতি ২৫ লাখ লোকের জন্য একজন বিশেষজ্ঞ

আপডেট : ১৮ ডিসেম্বর ২০১৪, ২৩:৩০

দেশে কিডনি রোগের ভয়াবহ বিস্তারে মানুষের মৃত্যুর হার বেড়েই চলেছে। কিডনি রোগীদের মধ্যে দরিদ্র, অসহায় লোকের সংখ্যাই সর্বাধিক। গতকাল বৃহস্পতিবার কিডনি রোগ সংক্রান্ত ১০ম জাতীয় সম্মেলনে অংশ নেয়া প্রখ্যাত কিডনি বিশেষজ্ঞরা দেশের কিডনি রোগের ভয়াবহ বিস্তার ও চিকিত্সা সেবার বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন। অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম আগামী ২৮ ডিসেম্বর মন্ত্রণালয়ের বৈঠকে কিডনি সম্পর্কিত আইনের খসড়া চূড়ান্ত করা হবে বলে ঘোষণা দেন। বিশ্বের অন্যান্য দেশে কিডনির ব্যাপক বিস্তারের তথ্যও তুলে ধরা হয় সম্মেলনে। প্রতিবছর সারাবিশ্বে প্রায় ১০ লাখ লোক কিডনি রোগে মারা যাচ্ছেন এবং দুই কোটি লোক অসুস্থ জীবন যাপন করছেন। বাংলাদেশে কিডনি রোগের বিস্তার সবচেয়ে বেশি। এর কারণ হিসাবে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, পরিবেশগত, বিষাক্ত, ভেজাল ও কেমিক্যাল সংমিশ্রণে তৈরি খাদ্য সামগ্রী, ফল, মাছ, দুধ ইত্যাদিতে ফরমালিনের ব্যাপক ব্যবহার এবং এন্টিবায়োটিকের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার কিডনি রোগের ব্যাপক বিস্তারের অন্যতম কারণ। বাংলাদেশে প্রতি ৭ জনে একজন কিডনি রোগে আক্রান্ত, যেখানে আমেরিকায় প্রতি ৯ জনে একজন। বাংলাদেশে ২৫ লাখ রোগীর জন্য একজন করে কিডনি বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক রয়েছেন।

অপরদিকে আমেরিকায় ৫ হাজার রোগীর জন্য রয়েছেন একজন কিডনি বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক। বাংলাদেশে প্রতি বছর ৪০ হাজার মানুষ কিডনি রোগে মারা যায়। কিডনি রোগের চিকিত্সা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। সাধারণ কিংবা মধ্যবিত্তের পক্ষে এ রোগের চিকিত্সার ব্যয়ভার বহন করা সম্ভব হয় না। ধনীদের মধ্যেও মাত্র তিন মাস এ রোগের ব্যয়ভার বহন করার পর তাদের পক্ষে চিকিত্সা চালিয়ে যাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে। বিশেষজ্ঞদের গবেষণায় এসব তথ্য বেরিয়ে এসেছে।
কিডনি বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এ দেশে ১০ শতাংশ মানুষ কিডনি রোগের চিকিত্সা করাতে পারেন। গড়ে ৯০ ভাগ মানুষ অর্থের অভাবে কিডনি রোগের চিকিত্সা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। আল্লাহর ওপরই তাদের একমাত্র ভরসা। জনসাধারণকে এ রোগ সম্পর্কে সচেতন করা ছাড়া কোন বিকল্প নেই। প্রাথমিক পর্যায়ে কিডনি রোগ ধরা পড়লে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এ রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব বলে প্রখ্যাত কিডনি বিশেষজ্ঞরা জানান।
কিডনি ফাউন্ডেশন হাসপাতাল ও রিসার্চ ইন্সটিটিউটের উদ্যোগে আয়োজিত এ সম্মেলনে অংশ নেয়া বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা এ রোগের বিস্তার ও প্রতিকারসহ বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরেন। কিডনি ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি অধ্যাপক ডা. হারুন অর রশিদের সভাপতিত্বে সম্মেলনে প্রধান অতিথি ছিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম, বিশেষ অতিথি ছিলেন জাতীয় অধ্যাপক ও প্রখ্যাত শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এম আর খান ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. দ্বীন মোহাম্মদ নুরুল হক। সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন কিডনি ফাউন্ডেশনের সহ-সভাপতি অধ্যাপক ডা. এম এ ওয়াহাব, মহাসচিব অধ্যাপক ডা. মুহিবুর রহমান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক টিনি ফেরদৌস রশিদ প্রমুখ।
যারা ফেল করেছে তারা মেডিক্যালে
ভর্তি হতে পারবে না:স্বাস্থ্যমন্ত্রী
স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেছেন, যারা এমবিবিএস ভর্তি পরীক্ষায় ফেল করেছে, তারা মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হতে পারবে না। যারা ভর্তি পরীক্ষায় পাস করেনি তাদের ভর্তি হওয়ার সুযোগ আমি কি করে দিব? যারা পাস করেনি তারা কিভাবে ডাক্তার হবে? যারা ফেল করেছে তাদের ভর্তি করার মানসিকতা তার নেই বলে মন্ত্রী উল্লেখ করেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, কিডনি সংযোজন নিয়ে অতীতে অনেক দালাল দরিদ্র মানুষকে প্রতারিত করেছে। এ জন্য আইন করা হচ্ছে, তারা আর সে সুযোগ পাবে না। আমরা চাই স্বাস্থ্য সেবার উন্নয়ন। ভেজাল হাসপাতাল চাই না। স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোগ থাকতে হবে। আমরা বারডেম, শিশু স্বাস্থ্য ফাউন্ডেশন ও কিডনি ফাউন্ডেশনের মতো উদ্যোক্তাদের সহযোগিতা করতে চাই।
অধ্যাপক এম আর খান বলেন, ২৫ লাখ রোগীর জন্য বাংলাদেশে একজন কিডনি বিশেষজ্ঞ, যা নিতান্তই অপ্রতুল। সে হিসাবে প্রয়োজনীয় সেবিকাও নেই। দেশের স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়নে এসব সমস্যা দ্রুত সমাধান করা দরকার বলে তিনি উল্লেখ করেন।

অধ্যাপক হারুন অর রশিদ বলেন, কিডনি রোগের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো প্রথম দিকে এর কোন উপসর্গ থাকে না কিন্তু যখন উপসর্গ ধরা পড়ে ততক্ষণে কিডনির প্রায় ৭৫ ভাগই বিকল হয়ে যায়। জনসাধারণকে সচেতন করা গেলে এ রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব। ডায়ালাইসিস করার মতো প্রশিক্ষিত নার্সেরও তীব্র সংকট রয়েছে। এক্ষেত্রে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।