কারাবন্দী শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমনের নির্দেশেই পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয় সাবেক এমপি ও বিএনপি নেতা নাসিরউদ্দিন আহমেদ পিন্টুর বডিগার্ড ও যুবদল নেতা আফজাল হোসেন ওরফে গালকাটা সাত্তারকে। আর হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নিয়েছিল ৬ জন। প্রথম গুলি ছোঁড়ে ধানমন্ডি এলাকার চিহ্নিত সন্ত্রাসী আব্দুল গনি। পুলিশ এবং র্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে এ তথ্য জানিয়েছে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেফতার হওয়া ইব্রাহিম হোসেন বুলু ও মাসুদ হাসান।
হত্যার কারণ সম্পর্কে তারা জানিয়েছেন, এলাকার আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ এবং ইমনের গোপন তথ্য ফাঁস হওয়ার আশংকায় তাকে হত্যা করা হয়। শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমন বর্তমানে কাশিমপুর-১ কারাগারে রয়েছে।
গত ১৪ ডিসেম্বর হাজারীবাগ তিন মাজার মসজিদ এলাকায় সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হন সাত্তার। তিনি ছিলেন ৪৮ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের সাবেক সভাপতি। বাসা ৮২ নম্বর মনেশ্বর রোড। এ ঘটনায় ঐদিনই নিহত সাত্তারের মা ফিরোজা বেগম বুলু, মাসুদসহ ৬ জনের নাম উল্লেখ করে হাজারীবাগ থানায় মামলা করেন।
হাজারীবাগ থানা পুলিশ গত মঙ্গলবার রায়েরবাজার শেরেবাংলা রোড এলাকা থেকে বুলুকে গ্রেফতার করে। পুলিশ তাকে তিনদিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে। গতকাল ছিল রিমান্ডের প্রথম দিন। অপরদিকে র্যাব-২-এর একটি টিম গতকাল বৃহস্পতিবার ভোরে মাসুদ হাসানকে শেওড়াপাড়া থেকে গ্রেফতার করে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা হাজারীবাগ থানার সাব-ইন্সপেক্টর জমসেদ আলম জানান, র্যাবের হাতে গ্রেফতার হওয়া মাসুদ হাসান মামলার এজাহারভুক্ত পাঁচ নম্বর আসামি। তিনি আরো জানান, পুলিশের হাতে গ্রেফতারকৃত বুলু সরাসরি হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেছে। তবে সে ঘটনা সম্পর্কে বিস্তারিত অবহিত ছিল। নিহত সাত্তার ছিল বুলুর ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তারা একইসঙ্গে ইমনের হয়ে এলাকায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়েছে।
র্যাব-২ এর সহকারী পুলিশ সুপার মারুফ আহমেদ জানান, র্যাবের হাতে গ্রেফতারকৃত মাসুদ হাসান একজন তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী এবং ইমনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে মাসুদ হাসান সরাসরি হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয়ার কথা স্বীকার করেছেন। র্যাবের কাছে মাসুদ জানায়, ইমন মোবাইল ফোনে নির্দেশ দিয়েছিলেন। হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নেয় মাসুদ হাসান, আব্দুল গনি, মনির হোসেন, রজ্জত, রানা ও তাপস। ঘটনার সময় প্রত্যেকের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র ছিল। তবে প্রথম গুলি করে গনি। মৃত্যু নিশ্চিত করে হত্যাকারীরা ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। জিজ্ঞাসাবাদে মাসুদ জানায়, ১৯৯৬ সালে গালকাটা সাত্তার তার বড় ভাইকে পুরনো ঢাকার নবাবগঞ্জ এলাকায় কুপিয়ে হত্যা করেছিল। এ নিয়ে সাত্তারের ওপর তার ক্ষোভ ছিল। হত্যার পরিকল্পনা তদারকি করে পুলিশের হাতে গ্রেফতার হওয়া বুলু। র্যাব কর্মকর্তা আরো জানান, মাসুদ হাসানকে থানায় সোপর্দ করে আজ রিমান্ডের জন্য আদালতে পাঠানো হবে।
কে এই শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমন
সানজিদুল ইসলাম ইমন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজকল্যাণে অনার্স ও মাস্টার্স পাস করেন। তার সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড শুরু হয় ১৯৯৯ সালে ধানমন্ডি এলাকার গালকাটা জব্বার নামে এক প্রতিবেশীর সঙ্গে পারিবারিক দ্বন্দ্বের জের ধরে। পরবর্তীতে তিনি হয়ে ওঠেন ধানমন্ডি এলাকার ত্রাস। পর্যায়ক্রমে ইমনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের পরিধি বিস্তৃত হয় ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, রমনা, বাড্ডা, কোতোয়ালি, লালবাগ, উত্তরা, তেজগাঁও ও হাজারীবাগ এলাকায়। তার বিরুদ্ধে নগরীর বিভিন্ন থানায় তিরিশটির অধিক হত্যা মামলা রয়েছে। যার মধ্যে চিত্রনায়ক সোহেল চৌধুরী ও আওয়ামী লীগ নেতা মঞ্জুরুল ইসলাম অশ্রু হত্যাকাণ্ড রয়েছে। ২০০০ সালের শেষদিকে গ্রেফতার এড়াতে ইমন ভারতে আত্মগোপন করেন। ২০০১ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চার দলীয় জোট সরকার গঠনের পর দেশে ফেরেন ইমন। আবার শুরু হয় তার সন্ত্রাসী তত্পরতা। তবে ২০০৫ সালে র্যাবের ক্রসফায়ারের ভয়ে আবার ভারতে পালিয়ে যান ইমন। পরবর্তীতে ২০০৭ সালের শেষদিকে সিআইডির সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ আরোফের (বর্তমানে পুলিশ সুপার) নেতৃত্বে একটি টিম ইমন, তাজ, ইব্রাহিম, লম্বু সেলিমসহ সাত সন্ত্রাসীকে দেশে ফেরত আনে। এরপর থেকে ইমন কারাগারে রয়েছে। কিন্তু কারাবন্দী থেকেও থেমে নেই ইমনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড। তার বাহিনী এখনও ধানমন্ডি, হাজারীবাগ এলাকায় সক্রিয় রয়েছে।