শাহজালালে ড্রোন হামলার পরিকল্পনা ছিল,তদন্তে আসবে এফবিআই

আপডেট : ১৯ ডিসেম্বর ২০১৪, ২২:১২
 
মানুষবিহীন আকাশযান ‘ড্রোন’ তৈরিকারী জঙ্গি সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলাটিমের এক সদস্যকে খুঁজছে এফবিআই। এ ব্যাপারে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ওই জঙ্গি সদস্যের ব্যাপারে বিস্তারিত তথ্য যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআইয়ের ( ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন) কাছে পাঠাবে।
সম্প্রতি ডিবির হাতে গ্রেফতার হওয়া আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের তানজিল হোসেন বাবু ও গোলাম মাওলা মোহনের কাছ থেকে তাদের ড্রোন তৈরির মূল পরিকল্পনাকারী হিসাবে রেজাউল কবীরের নাম জানিয়েছে।
এই রেজাউল কবীরকে ডিবির হাতে গ্রেফতার অবস্থায় ২০১০ সালে ঢাকায় এফবিআইয়ের টিম জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল। পরে ঢাকা কেন্দ্রিয় কারাগার থেকে রেজাউল কবীর জামিনে মুক্তি নিয়ে আত্মগোপন করে। ঐ সময় রেজাউল কবীর হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরে হামলার পরিকল্পনা করেছিল।
ডিবির হাতে গ্রেফতার হওয়া এই দুই জঙ্গি জানিয়েছে, ড্রোন চালিয়ে হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরে হামলা করে সারা বিশ্বে বিষয়টি নিয়ে হৈ চৈ ফেলে দেয়ার পরিকল্পনা ছিল। বিষয়টি তদন্ত করতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে এফবিআইয়ের একটি টিম বাংলাদেশে আসার কথা বলে ডিবির একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন। 
এ ব্যাপারে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেন, রেজাউল কবির ডিবির হাতে গ্রেফতার হয়েছিল। এরপর বেশি কিছুদিন কারাগারে ছিলেন তিনি। সম্প্রতি তিনি জামিনে থেকে আগের মতই জঙ্গিদের সংগঠিত করার চেষ্টা করছেন। ‘ড্রোন’ তৈরির পরিকল্পনার ব্যাপারে গ্রেফতারকৃত দুই জঙ্গি সদস্যের সাথে রেজাউলের যোগাযোগ ছিল।
ডিবি সূত্র জানায়, ২০১০ সালে  রেজাউল কবিরকে গ্রেফতার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। সে সময় আমেরিকার গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআইয়ের তিন সদস্যের টিম বাংলাদেশে এসে রেজাউল কবিরকে তারা কয়েকদফা জিজ্ঞাসাবাদ করে। ঐ সময় এফবিআই রেজাউলের সঙ্গে মিশর, তুরস্ক, সিরিয়া ও পাকিস্তান ভিত্তিক কয়েকটি জঙ্গি সংগঠনের নিম্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকার তথ্য পায়। ঢাকার বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা কয়েক দফা জিজ্ঞাসাবাদ করে তাকে কারাগারে পাঠায়। রেজাউল কবির জামিনে থেকে ফের একই কাজ করছে বলে তথ্য পেয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ।
ডিবি’র একজন কর্মকর্তা জানান, আনসারুল্লাহ বাংলাটিম ‘ড্রোন’ নিয়ে কাজ কাজ করার আগে রেজাউল কবির বিষয়টি নিয়ে অনেক গবেষণা করেছেন। সে সময় তাকে গ্রেফতারের পর জিজ্ঞাসাবাদের তথ্যের উদ্বৃতি দিয়ে ঐ কর্মকর্তা আরো জানান, ‘ড্রোন’ নিয়ে কাজ করার আগে রেজাউল তত্কালীন জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পিছনে উত্তরা এলাকার একটি তিন তলা বাড়ির চিলেকোঠার ঘরে ভাড়া নিয়ে অবস্থান করেছিলেন। মাস তিনেক সেখানে অবস্থান করার পর মালেয়েশিয়া পাড়ি জমায়। সেখানে একটি বিমানবন্দরে কাছে বাসাভাড়া নিয়ে অবস্থান করেন। মূলত বিমান উড্ডয়ন ও নামার বিষয়টি ভালভাবে পরখ করার জন্যই বিমানবন্দর এলাকায় অবস্থান নেন। কিছুদিন সেখানে থাকার পর তিনি মধ্যপ্রাচ্যের একটি দেশে পাড়ি জমান। সেখানে একমাস অবস্থান শেষে দেশে ফেরার পর ডিবির হাতে গ্রেফতার হয়।
ঐ কর্মকর্তা আরো জানান, গ্রেফতারকৃত আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের দুই সদস্যের কাছ থেকে ‘ড্রোন’ বা কোয়াড হেলিকপ্টারের মতো রিমোর্ট কন্ট্রোল চালিত ‘ফ্লাইং মেশিন’ সরঞ্জাম পাওয়া গেছে। এতে ধারনা করা হচ্ছে,  ড্রোন বা কোয়াড হেলিকপ্টার তৈরি করে দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার ছবি তুলে সেসব স্থাপনায় হামলার পরিকল্পনা করছে জঙ্গিরা। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে  তানজিল  হোসেন বাবু ও তার সহযোগি  গোলাম মওলা  মোহন পলাতক রেজাউল কবির সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে। যাত্রাবাড়ির একটি বাসায় তারা ছয়জন মিলে ‘ড্রোন’ তৈরির কাজ করতেন। ডিবির অভিযানে চারজন পালিয়ে যায়।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতাকৃতরা ডিবিকে জানায়, তারা আনুমানিক ২শ’ ফুট উচ্চতায় উড়ে নির্দিষ্ট লক্ষ্যে হামলা করার সক্ষমতা সম্পন্ন কোয়াড  হেলিকপ্টার বা  ড্রোন তৈরির সক্ষমতা অর্জনের জন্য তারা কাজ করে যাচ্ছিল। কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার কারণে তারা ভূমি  থেকে ভূমিতে আক্রমণ কষ্টসাধ্য বলে এরূপ আকাশ পথে আক্রমণের পরিকল্পনা করছিল। কমপক্ষে ৩০  কেজি ওজনের  কোন  বোমা বহনে সক্ষম এরূপ একটা  কোয়াড  হেলিকপ্টার তৈরির দ্বারপ্রান্তে পৌঁছানোর চেষ্টা করছিল।
ডিবির আরো একজন কর্মকর্তা বলেন, জামিনে মুক্তি পাওয়া রেজাউলকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। তবে জামিনে বের হওয়ার পর সে বর্তমানে কোথায় আছে তা এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বাংলাদেশে জঙ্গিরা ‘ড্রোন’ তৈরির চেষ্টা করছে-এমন খবর এফবিআই জানার পর তার এ বিষয়ে খোঁজ নিচ্ছে। প্রয়োজনে এফবিআইয়ের সদস্যরা বাংলাদেশে আসারও চিন্তাভাবনা করছে।
২০০৮ সালে আবির্ভাব ঘটে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের। এ সংগঠনে জেএমবি ও হরকাতুল জিহাদের  নেতাকর্মীরা রয়েছে।
২০০৮ সাল থেকে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের নাম সাংগঠনিক কার্যক্রম শুরু হলেও এই জঙ্গি সংগঠনের সদস্যরা প্রথম আলোচনায় আসে গত বছর শেষ দিকে। গত বছরের আগস্টে বরগুনা থেকে এ সংগঠনের প্রধান মুফতি জসীম উদ্দিন রাহমানীসহ ৩১ জনকে  গ্রেফতার করে পুলিশ। পরদিন ঢাকার মোহাম্মদপুরে জসীমের বাসা ও অফিসে অভিযান চালিয়ে কম্পিউটার, ল্যাপটপ, সিডিসহ জঙ্গি সংশ্লিষ্ট বিপুল সংখ্যক পুস্তক উদ্ধার করে।