ক্ষতি নিরূপণে বিশেষজ্ঞ দল সুন্দরবনে, তেল সংগ্রহে স্থানীয়রাই ভরসা

আপডেট : ২০ ডিসেম্বর ২০১৪, ২০:১৯
 
 
 
 
সুন্দরবনের শ্যালা নদীতে ছড়িয়ে পড়া তেলের কারণে ওই এলাকার জলজ ও পরিবেশগত ক্ষতি নিরুপণে ঢাকা থেকে একটি বিশেষজ্ঞ দল সুন্দরবনে গেছে। তারা ক্ষয়ক্ষতি নিরুপনে কাজ করবে। এ দিকে, নদীতে ভেসে থাকা তেল উত্তোলনের জন্য এখন পর্যন্ত স্থানীয় জনগণের ওপর ভরসা করছে সরকার। ইতিমধ্যে স্থানীয় জনগণ হাঁড়ি, বড় বালতি, গামলা নিয়ে সংগ্রহ করছে। এই সংগ্রহ করা তেল শুক্রবার থেকে রাষ্ট্রীয় তেল সংস্থা পদ্মা প্রতি লিটার ৩০ টাকা দরে কিনছে। তেল কেনার জন্য ৪টি বুথও খোলা হয়েছে সেখানে। তবে রাসায়নিক পদ্ধতিতে তেল নিঃসরণের সিন্ধান্তে গ্রহণ করা হলেও সুন্দরবনের ক্ষয়ক্ষতির কথা বিবেচনা করে আপতত তা স্থগিত রাখা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেছেন, স্থানীয় জনগণের সাহায্যে পুরোনো এই পদ্ধতিতে তেল যতটা সরানো সম্ভব হবে, তারপর বাকি তেলের কার্যকারিতা নষ্ট করতে নদীতে জাহাজ দিয়ে স্প্রে করা হবে।
কর্মকর্তারা বলেছেন, ডুবে যাওয়া ট্যাংকারটিকে তিন দিন পর উদ্ধার করা হলেও নদীতে ৬০ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে তেল ছড়িয়ে থাকার বিষয়টিই ডলফিনসহ জলজ প্রাণী এবং সুন্দরবনের জন্য বড় সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে।
খুলনা অফিস  থেকে রেজাউল করিম জানান, সুন্দরবনে ছড়িয়ে পড়া ফার্নেস অয়েল এখন থালা-বাসন, ফোম ও কলা পাতা দিয়ে সনাতন পদ্ধতিতে অপসারণের কাজ শুত্রুবার সকাল থেকে শুরু হয়েছে। সুন্দরবন সন্নিহিত লোকালয়ের মানুষ ও জেলে-বনজীবীরা এভাবেই শ্যালা নদীসহ বিভিন্ন খাল থেকে তেল অপসারনের  কাজ শুরু করেছে। বৃহস্পতিবার বিকালে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বন সংলগ্ন লোকালয়ে মাইকিং করে ভাসমান তেল তুলে নেয়ার আহ্বান জানানোর পর শুক্রবার থকে এই কাজ শুরু হয় । ভাসমান তেল সুন্দরবনে ছড়িয়ে পড়া রোধে ও তেল  তোলার সুবিধার জন্য জোয়ারের সময় খালগুলোতে ফার্নেস অয়েল যাতে বের হতে না পারে সে জন্য বৃহস্পতিবারই  খালগুলোর মুখে নেট দিয়ে ব্যরিকেড দেয়া হয়।
বিআইডাব্লিউটিএর জাহাজ কাণ্ডারি-১০ এসে পৌঁছালেও সেটি এখনো রাসায়নিক ছিটানোর কাজ শুরু করেনি। তারা পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমতির অপেক্ষায় রয়েছে। এ ব্যাপারে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানিয়েছে বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক মু. শুকুর আলী। আপাতত ডিসপারসেন্ট ফোম কেমিক্যাল ছিটানোর কাজ বন্ধ রয়েছে।
এ বিষয়ে পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের ডিএফও আমির হোসাইন চৌধুরী জানান, কোন অবস্থায়ই সুন্দরবনের ভাসমান তেল আপসারণে রাসায়নিক কেমিক্যাল ফোম ব্যাবহার করা হবে না। রাসায়নিক কেমিক্যাল ফোম ব্যাবহার করলে ডলফিনসহ জলজ প্রাণী ও সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যে আরো অনেক বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হবে বলে বিশেষজ্ঞরা মতামত দিয়েছেন। পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় এ বিষয়টিকে গুরুত্বের সাথে দেখছে।
এ দিকে, মংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের হারবার মাস্টার কে এম আকতারুজ্জামান জানান, ডুবে যাওয়া ট্যাংকারে ছিল প্রায় সাড়ে তিন লাখ লিটার ফার্নেস অয়েল। জাহাজ কাণ্ডারিতে মাত্র ১০ হাজার লিটার তেলের তেজস্ক্রিয়তা কমানোর মতো রাসায়নিক রয়েছে।
বন বিশেষজ্ঞদের মতে তেলের কারণে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির স্বীকার হতে পারে ম্যানগ্রোভ সুন্দরবন। আর জোয়ার ভাটার প্রভাবে ফার্নেস ওয়েল পানিতে দ্রবির্ভূত অক্সিজেন হ্রাস পেয়ে সেখানকার  জ্বলজ প্রাণীর জীবনকে সংকটাপন্ন করে তুলেছে। এ ছাড়া, নদী তীরবতী এলাকায় গুল্ম ও উদ্ধিদের শ্বাসমূল ভারী ফার্নেস অয়েলে জড়িয়ে যাচ্ছে। যদিও ঠিক এ মুহূতের্ই উদ্ভিদ জত্গতের ক্ষতির বিষয়টি ছোখে পড়বে না। তবে ১৫-২০ দিনের পর গুল্ম গুচ্ছ ও উদ্ভিদদের রং বিবর্ণ হয়ে মারা যেতে পারে বলে তাদের রয়েছে  উদ্বিগ্নতা।
সুন্দরবন বিষয়ে অভিজ্ঞ ও পরিবেশবিদ ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, সুন্দরবনের ব্যাপক এলাকাজুড়ে তেল ছড়িয়ে পড়ায় পানিতে দ্রবিভূত অক্সিজেন স্বাভাবিক ভাবেই কমে গেছে। এ কারণে ডলফিনসহ অন্য প্রাণীকুল ক্ষতিতে পড়তে বাধ্য । উদ্ভুত পরিস্থিতিতে সেখানকার নদীতে থাকা ডলফিন যদি অনত্র্য সরে গিয়ে থাকতে পারে তবে এ ধরনের থ্রেট থেকে নিজেরাই তাদের রক্ষার করতে সক্ষম হবে। বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিবকে প্রধান করে গঠিত ৯ সদস্যের উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি শুক্রবার দুপুরে ঘটনাস্থল সুন্দরবন পরির্দশন করেছেন। পরিদর্শনকালে তদন্ত  কমিটির কোনো সদস্য সাংবাদিকদের কাছে মতামত ব্যক্ত করেনি। এই কমিটি আগামী  ১৫ দিনের মধ্যে মন্ত্রণালয়ে তাদের রিপোর্ট পেশ করবে।
উল্লেখ্য, বাগেরহাটের পূর্ব সুন্দরবনের শ্যালা নদীর চাঁদপাই রেঞ্জের মালবাহী ট্যাংকার জাহাজের ধাক্কায় ‘ওটি সাউদার্ন স্টার সেভেন’ নামের একটি তেলবাহী ট্যাংকার মঙ্গলবার ভোরে ডুবে যায়। ট্যাংকারটি গোপালগঞ্জের একটি বিদ্যুত্ কেন্দ্রের জন্য খুলনার পদ্মা অয়েল ডিপো থেকে ৩ লাখ ৫৭ হাজার ৬৬৮ লিটার ফার্নেস অয়েল নিয়ে যাচ্ছিল।