ভাষা বোধগম্য না হওয়ায় বিচারের বাণী নিভৃতে কাঁদে

আপডেট : ২১ ডিসেম্বর ২০১৪, ০০:০১

 “আমাদের সমাজে প্রচলিত একটি প্রবচন আছে ‘বাঙালিকে হাইকোর্ট দেখানো’। সময়ের পরিবর্তন হয়েছে কিন্তু বাঙালিকে হাইকোর্ট দেখানোর প্রবণতা এখনো পরিবর্তন হয়নি। যা অত্যন্ত দুঃখের এবং বেদনার।”

মো. জুয়েল শিকদার বনাম রাষ্ট্র মামলায় হাইকোর্ট সমপ্রতি এ পর্যবেক্ষণ দিয়েছে। হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, “বিচারপ্রার্থী জনগণ নিজ বোধগম্য ভাষায় বিচার না পাওয়ায় এবং বোধগম্যতার অভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিভ্রান্ত হওয়ায় বাংলাদেশের আদালতসমূহে এত মামলার জট। এই জট নিরসন হতে পারে শুধুমাত্র বিচার প্রার্থীদের বোধগম্য ভাষায় তাদের বিচারের বাণী প্রকাশ ও প্রচার করা। এটি করা না গেলে সেই ‘বিচারের বাণী নিভৃতে কাঁদে’ এই মর্মবেদনার বাণী বারবারই প্রতিধ্বনিত হবে।”
এদিকে, সংবিধান এবং প্রচলিত আইনে অফিস-আদালতের কার্যক্রম বাংলা ভাষায় পরিচালনার নির্দেশনা থাকলেও হাইকোর্টের অপর একটি রায়ের কারণে উচ্চ আদালতে বাধ্যতামূলকভাবে বাংলা ভাষার প্রচলন করা যাচ্ছে না। তবে কয়েকজন বিচারক বাংলা ভাষায় রায় দিয়ে ইতিমধ্যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
পর্যবেক্ষণে হাইকোর্ট বলেছে, বিচারপ্রার্থীর বোধগম্য ভাষায় বিচারকাজ পরিচালনা না হওয়ায় এখনো ভাষার বোধগম্যতার অভাবে বাঙালি স্বাধীনতার এত বছর পরেও হাইকোর্ট দেখার করুণ অভিজ্ঞতার নাগপাশ হতে বের হতে পারেননি। এখনও হয় কথায় নয় কথায় বাঙালিকে হাইকোর্ট দেখানোর মত অবস্থার শিকার হতে হয়। আর এই শিকারের টোপ হিসেবে তারাই ব্যবহূত হন যাদেরকে বাংলাদেশের সংবিধানের ৭ নম্বর অনুচ্ছেদে প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। তাই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১৯৭১ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমির অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী ভাষণের কথা আজও জাতিকে চরমভাবে নাড়া দেয়। ওইদিন বঙ্গবন্ধু ঘোষণা দিয়েছিলেন:‘আমি ঘোষণা করছি, আমাদের হাতে যেদিন ক্ষমতা আসবে সেদিন থেকেই দেশের সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু হবে। বাংলা ভাষার পণ্ডিতেরা পরিভাষা তৈরি করবেন তারপর বাংলা ভাষা চালু হবে, সে হবে না। পরিভাষাবিদরা যতখুশি গবেষণা করুন। আমরা ক্ষমতা নেয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাংলা ভাষা চালু করে দেব। সে বাংলা যদি ভুল হয়, তবে ভুলই চালু হবে, পরে তা সংশোধন করা হবে।’
ইতিমধ্যে পেরিয়ে গেছে দীর্ঘ সময়। কিন্তু এখনো বাধ্যতামূলকভাবে উচ্চ আদালতে বাংলা ভাষা চালু করা যায়নি।
প্রসঙ্গত, ২০০৮ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর ৫০ বোতল ফেনসিডিলসহ জুয়েল সিকদারকে আটকের ঘটনায় বরিশাল কোতয়ালি মডেল থানায় একটি মামলা দায়ের করে পুলিশ। এই মামলায় ২০০৯ সালের ২৬ নভেম্বর আসামিকে বিশেষ ক্ষমতা আইনের ২৫বি(২) ধারায় তিন বছর সশ্রম কারাদণ্ড ও এক হাজার টাকা জরিমানা করে রায় দেয় বরিশালের বিশেষ ট্রাইব্যুনাল-৪। এই রায় বাতিল চেয়ে জুয়েল সিকদার ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৬১(ক) ধারায় হাইকোর্টে আবেদন দাখিল করেন। প্রাথমিক শুনানি নিয়ে হাইকোর্ট বিচারিক আদালতের সাজার রায় কেন বাতিল করা হবে না এই মর্মে রুল জারি করে। রুলটি নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ২০১০ সালের ২১ জুলাই আসামিকে জামিন দেয় আদালত। আসামি হাইকোর্টে নিম্ন আদালতের সাজার বিরুদ্ধে আপিল না করে ওই রায় বাতিল চেয়ে আবেদন করেন। বিচারপতি একেএম ফজলুর রহমান ও বিচারপতি শেখ মো. জাকির হোসেন ২০১১ সালে ২৬ মে জারিকৃত ওই রুল খারিজ করে রায় দেন। রায়টি লিখেছেন বিচারপতি জাকির হোসেন।
বাংলায় লিখিত এ রায়ে বলা হয়, বরিশালের বিশেষ ট্রাইব্যুনাল যে রায় দিয়েছেন তা অত্যন্ত তথ্য সমৃদ্ধ ও বস্তুনিষ্ঠ উত্কৃষ্ট রায়। আর এই রায়টি যদি দরখাস্তকারীর (আসামি) বোধগম্য ভাষায় প্রদান করা হত, তাহলে তাকে হাইকোর্ট দেখতে হত না বা তাকে কেউ হাইকোর্ট দেখানোর দু:সাহস করত না। দরখাস্তকারী যদি নিজে তার এই দণ্ডাদেশ নিজেই অনুধাবন বা হূদয়াঙ্গম বা সর্বোপরি বুঝতে পারতেন তাহলে রায় চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে মামলা দায়ের করা হতে বিরত থাকতেন বলে আমাদের বিশ্বাস।
সংবিধানের তৃতীয় অনুচ্ছেদে উল্লেখ রয়েছে, প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা। সংবিধানের ওই অনুচ্ছেদের আলোকে ১৯৮৭ সালে বাংলা ভাষা প্রচলন আইন প্রণয়ন করা হয়। ওই আইনে বলা হয়, ‘এই আইন প্রবর্তনের পর বাংলাদেশের সর্বত্র তথা সরকারি অফিস, আদালত, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান কর্তৃক বিদেশের সাথে যোগাযোগ ব্যতীত অন্যান্য সকল ক্ষেত্রে নথি ও চিঠিপত্র, আইন আদালতের সওয়াল জবাব এবং আইনানুগ কার্যাবলী অবশ্যই বাংলায় লিখতে হবে। উল্লেখিত কোনো কর্মস্থলে যদি কোনো ব্যক্তি বাংলা ভাষা ব্যতীত অন্য কোনো ভাষায় আবেদন বা আপিল করেন, তাহলে তা বেআইনি ও অকার্যকর বলে গণ্য হবে।’ কিন্তু ১৯৮৭ সালের এই আইনটি হাশমত-উল্লাহ বনাম আজমেরী বিবি মামলায় হাইকোর্টের দেয়া রায়ের কারণে তা অকার্যকর রয়ে গেছে। ওই রায়ে বলা হয়েছে, আদালতের ভাষা যেহেতু সংকীর্ণতম, তাই রাষ্ট্রভাষা বলতে আদালতের ভাষা বোঝাবে না। এছাড়া আদালত বলতে নিম্ন আদালতকে বোঝানো হয়েছে। তবে আইন কমিশন আদালতের ভাষা বাংলা মর্মে ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৫৮ ও দেওয়ানি কার্যবিধির ১৩৭ ধারার অধীনে পৃথক দুটি ঘোষণাপত্র জারির জন্য সরকারের কাছে সুপারিশ করেন। এতে বলা হয়, প্রস্তাবিত ঘোষণাপত্র দুটি জারি করা হলে আদালতে তা অবিলম্বে কার্যকর করা সম্ভব। ইংরেজিতে রচিত বিদ্যমান আইনসমূহ বাংলায় অনুবাদ ত্বরান্বিত করা জরুরি

এর আগে সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক, বিচারপতি কাজী এবাদুল হকসহ হাতেগোনা কয়েকজন বিচারক বাংলা ভাষায় রায় দিয়েছেন।