‘মধ্য আয়ের দেশ হতে বাধা নেই বাংলাদেশের’

আপডেট : ২৩ ডিসেম্বর ২০১৪, ১৬:৪৫
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ প্রফেসর মুশতাক এইচ খান বলেছেন, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির নীতি গ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশ দ্রুতই সাত থেকে আট শতাংশে প্রবৃদ্ধির হার উন্নীত করতে পারে। বাংলাদেশের বর্তমান বার্ষিক প্রবৃদ্ধিকে অল্প সময়ের মধ্যেই সাত থেকে আট শতাংশে  উন্নীত করা সম্ভব এবং দেশটি ‘২১ সালের আগেই মধ্য আয়ের দেশে পরিণত হতে পারে। বৈশ্বিক মন্দা-খাদ্য ঘাটতি, তেলের মূল্য বৃদ্ধির ধকল সহ্য করেও দেশটির সামষ্টিক অর্থনীতির গতি প্রকৃতি শক্ত অবস্থানে রয়েছে।
তিনি বলেন, দেশটিতে ১৬০ মিলিয়নেরও বেশি জনসংখ্যা। তাদের প্রতিদিনই জীবন-জীবীকার তাগিদে কাজ করতে হয়। সামাজিক নিরাপত্তামূলক কোন ব্যবস্থা নেই। অতএব প্রত্যেককে বেঁচে থাকার জন্য ন্যূনতম চাহিদা মেটাতে প্রতিনিয়ত নিজ প্রয়োজনে উৎপাদন বাড়াতে হচ্ছে। ফলে বার্ষিক পাঁচ থেকে ছয় শতাংশ প্রবৃদ্ধি স্বাভাবিক। এতোটুকু অর্জনের ক্ষেত্রে সরকারি উদ্যোগ খুব উল্লেখযোগ্য নয়। সরকারি পর্যায় থেকে অর্গানাইজেশনাল ক্যাপাবিলিটি পলিসি গ্রহণের মাধ্যমে সুদৃঢ় পদক্ষেপ নিলে স্বল্পমেয়াদে সাত থেকে আট শতাংশ হারে বার্ষিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানো সম্ভব। বাংলাদেশ দ্রুত গ্রোথ বর্ধক দেশ। এতে আন্তর্জাতিক মূলধারার অর্থনীতিবিদদের মধ্যে কোন বিতর্ক নেই।
বাংলাদেশ বারবার রাজনৈতিক বৈধতা সংকটের মুখোমুখি হয়েছে এবং দুর্নীতি ও আইনের শাসনের সূচক অত্যন্ত খারাপ পর্যায়ে রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, তা সত্ত্বেও প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর তুলনীয় প্রবৃদ্ধির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ অনেক ধাপ এগিয়েছে। আইনের শাসন নিয়ে বিতর্ক তুলে আর্ন্তজাতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন নিশ্চিত উন্নয়নের ক্ষেত্র বলে বাংলাদেশের উচ্চ প্রবৃদ্ধি হচ্ছে ঠিকই তবে এটা টেকসই নয়। তিনি বলেন, আমিও তাদের সঙ্গে একমত যে এটা দীর্ঘমেয়াদী টেকসই নয়।
মুশতাক খান বলেন, এই প্রবৃদ্ধির স্থিতিশীলতা ধরে রেখে টেকসই করতে হলে গভর্নেন্সে পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। উৎপাদনক্ষমতা বাড়াতে হলে রাষ্ট্রকে সহযোগী ভূমিকা পালন করতে হবে এবং অসৎ ব্যবসায়ীরা যাতে সম্পদের অপব্যবহার না করতে পারে তা তদারকির জন্য রাষ্ট্রের বাস্তবায়ন সক্ষমতা অর্জন জরুরি।
তিনি বলেন, আমাদের মত দেশে যেহেতু এই বাস্তবায়ন ক্ষমতা সীমিত তাই এই সহযোগীতা শুধু নির্দিষ্ট খাত এবং উৎপাদনশীল উদ্যোক্তাদের জন্য হতে পারে। এই ধরনের নীতিমালা বাস্তবায়ন করতে হলে অবশ্যই রাজনৈতিক স্থীতিশীলতা দরকার। তাই রাজনৈতিক সমোঝাতার সংস্কৃতি এবং স্থায়ী নীতিমালা প্রণয়ন অবশ্যই প্রয়োজন। এতে নতুন নতুন খাতে আরো চমৎকার প্রতিযোগিতা তৈরি হবে। ফলে অর্থনীতি আরো ধাবমান হবে।
তিনি আন্তর্জাতিক তথ্য উল্লেখ করে বলেন, ১৯৬০-৮০ পর্যন্ত বার্ষিক ভারতের প্রবৃদ্ধি হার ছিলো ৩.৫ শতাংশ। পাকিস্তানের ৫.৫ শতাংশ এবং বাংলাদেশের ১.৭ শতাংশ। ‘৮০-‘৯০ দশকে তা বেড়ে যথাক্রমে ৫.৬, ৬.১ ও ৩.৬ শতাংশে পৌঁছে। ‘৯০-০০০ দশকে ৫.৮, ৩.৭, ৪.৭ শতাংশে দাঁড়ায়। ২০০০-০৫ সাল পর্যন্ত ভারতের ৬.৭, পাকিস্তানের ৪.৯ ও বাংলাদেশের ৫.৩ শতাংশ ছিলো। ২০০৫-‘১০ সালে ভারতের ৭.৮, পাকিস্তানের ৩.৯ এবং বাংলাদেশের ৬.০ শতাংশ হয়। ‘১০-‘১২ সালে ভারতের ৫.৫, পাকিস্তানের ৩.৩ শতাংশে অবনতি হলেও বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির হার ৬.৩ শতাংশে উন্নীত হয়।
তিনি জানান, ১৯৬০-‘৮০ পর্যন্ত মাথাপিছু জিডিপিতে প্রবৃদ্ধির হার ছিলো ভারতে ১.২ শতাংশ, পাকিস্তানের ২.৬ শতাংশ, বাংলাদেশের মাইনাস ০. ৮ শতাংশ। সেখান থেকে ২০১০-১২ সালে বাংলাদেশের ৫.১ শতাংশ, পাকিস্তানের ১.৬ শতাংশ ও ভারতের ৪.৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এখানে উল্লেখযোগ্য যে এই অর্থনৈতিক সূচকগুলো প্রতিবেশী দেশগুলোতে কখনো ঊর্ধ্বমুখি আবার কখনো নিম্নমুখি দেখা গেলেও বাংলাদেশের সব সময়েই ঊর্ধ্বমুখি রয়েছে।
২০১০ সালের তুলনামূলক বৈশ্বিক অর্থনৈতিক স্ট্রাকচারে দেখা যায় বাংলাদেশে জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান ১৮.৮ শতাংশ, চীনের ৪.৫ শতাংশ, ভারতের ১৬.২শতাংশ, পাকিস্তানের ২১.৮ শতাংশ। বাংলাদেশে সেবা খাতের অবদান ৫২.৬ শতাংশ, চীনে ৪৫.৯ শতাংশ, পাকিস্তানে ৫৪.৬শতাংশ, ভারতে ৫৫.৪ শতাংশ। বাংলাদেশের উন্নয়নে শিল্প খাতের অংশগ্রহণ ২৮.৫ শতাংশ, ভারতে ২৮.৪ শতাংশ এবং চীনে ৪৪.৬ শতাংশ।
অপরদিকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিবর্তন স্ট্রাকচারে দেখা যায় অর্থনীতিতে শিল্পের অংশগ্রহণ ক্রমেই বাড়ছে এবং কৃষি খাতের কমছে। একটি সফল উন্নয়নশীল দেশে এভাবেই কাঠামোগত পরিবর্তন হবার কথা। বাংলাদেশেও সেটাই লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
১৯৮০ সালে জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান ছিলো ৩১.৬ শতাংশ, শিল্প খাতের ২০.৬ শতাংশ, সেবা খাতের ৪৭.৮ শতাংশ। ‘৯০ দশকে কৃষি খাতের ৩০.৩ শতাংশ, শিল্প খাতের ২১.৫ ও সেবা খাতের ৪৮.৩ শতাংশ। ২০০০ সালে যথাক্রমে ২৫.৫ কৃষি খাত, ২৫.৩ শিল্প খাত এবং ৪৯.২ শতাংশ সেবা খাত। ২০১০ সালে কৃষি খাত ১৮.৬, শিল্প খাত ২৮.৫ এবং সেবা খাতে বেড়ে দাঁড়ায় ৫২.৯ শতাংশ। এসব সূচকে প্রতীয়মাণ হয় যে বাংলাদেশের অর্থনীতি ক্রমউন্নতির পথে এগিয়ে যাচ্ছে।
মুশতাক খান বলেন, বাংলাদেশে বেশ কয়েকটি খাতে প্রতিযোগীতামূলক উন্নয়নের ফলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। ফলে মানুষের মাথাপিছু আয় বেড়েছে ও জীবনমানেও ব্যাপক ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটেছে।
তবে  পোশাক শিল্পের বাইরে নতুন শিল্প খাত তৈরি করার ক্ষেত্রে সরকারের যথেষ্ট কার্যকর নীতি এখনো প্রত্যক্ষ হচ্ছে না। এ জন্য দরকার ইলেক্ট্রনিক্সের মত নতুন সেক্টরে প্রতিযোগীতামূলক কারখানা স্থাপন করার জন্য সরকারি সাহায্য। বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের অনেকেরই যথেষ্ট মূলধন আছে এবং দক্ষ শ্রমিকও রয়েছে। কিন্তু একটি প্রযোগীতামূলক কারখানা কীভাবে সাজাতে হয় তা তাদের জানা নেই। এটা রপ্ত করার একমাত্র উপায় হচ্ছে এসব কারখানা স্থাপন করে তার ভেতরের কার্যক্রম এবং সংস্থাপনের ডিজাইন ক্রমশঃ রদবদল করে উৎপাদনকে প্রতিযোগীতামূলক জায়গায় নিয়ে যাওয়া।
তিনি বলেন, এটা হচ্ছে ‘করে শেখা’ বা ‘লার্নিং বাই ডুইং’। মূলত এখানেই সম্পূরক সরকারি নীতিমালা প্রয়োজন। যেমন চীন থেকে যেমন ইলেক্ট্রনিক্স শিল্প সরে যাচ্ছে তাদের যন্ত্রপাতিসহ ওইসব কারখানার উদ্যোক্তাদের বাংলাদেশ সরকারের তরফ থেকে উৎসাহ দেয়া উচিৎ যাতে তারা বাংলাদেশে শুধু যন্ত্রপাতি বিক্রয় ছাড়াও এখানে এসে বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের বিশেষ ধরনের কারখানা চালাতে লার্নিং বাই ডুইংয়ের মাধ্যমে শিখিয়ে দেন। এই সমস্যাটি সমাধান না করলে অন্যান্য সমস্যা যেমন দুর্বল অবকাঠামো, কম শিক্ষা-দক্ষ শ্রমিক, সুশাসনের অভাব, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দুর্বলতা ইত্যাদি সমস্যা সমাধান করতে পারলেও যথেষ্ট হবে না।
প্রফেসর খান বলেন, বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে দেখা যায় বাংলাদেশে শ্রমিকের নিন্ম মজুরি সত্ত্বেও অনেক নতুন শ্রম ঘন শিল্প খাতেও বাংলাদেশের উৎপাদন খরচ আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় অনেক গুণ বেশি। এজন্যই ইলেক্ট্রনিক্স বা যন্ত্রাংশ তৈরির মত শিল্পের দ্রুত বিকাশ ঘটছে না। ধারণা করা হতে পারে এটা উন্নত যন্ত্রপাতির অভাবের কারণে। প্রকৃতপক্ষে তা নয়। এটা অর্গানাইজেশনাল ক্যাপাবিলিটির অভাবে হয় বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, ১৯৭৮ সালে সমপ্রযুক্তি ব্যবহার করে দেখা গেছে ভারতের একজন শ্রমিকের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের একজন শ্রমিক ৭.৪ গুণ বেশি উৎপাদনে সক্ষম। ১৯৫৯ সালের সমমানের মেশিন ও প্রযুক্তি দিয়ে ভারতের একজন টেক্সটাইল শ্রমিক যুক্তরাষ্ট্রের একজন শ্রমিকের চেয়ে ২৫ শতাংশ কম উৎপাদন করে। এখানে অর্গানাইজেশনাল ক্যাপাবিলিটির অভাব রয়েছে। এই উৎপাদনশীলতার ব্যবধানের কারণ এই নয় যে ভারত বা বাংলাদেশের শ্রমিকরা বেশি অলস বা অদক্ষ। আসল কারণটি হলো আমাদের উদ্যোক্তারা তাদের সংস্থাগুলোকে কীভাবে সাজাতে হবে, সংগঠিত করতে হবে, তা তারা এখনো জানেন না। এছাড়া, লার্নিং বাই ডুইং পদ্ধতির ক্ষেত্রে সরকারি সহায়তা-সমর্থন যথেষ্ট নয়।
তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশের নিজস্ব উদ্যোক্তাদের শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিতে হবে। প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) নির্ভরতার চেয়ে দেশীয় বিনিয়োগকারীদের উৎসাহিত করা প্রয়োজন। বিশ্ব সংস্থাগুলোর তথ্যে দেখা যায় যে বাংলাদেশে নিজস্ব বিনিয়োগ ক্যপিটালের কোন ঘাটতি নেই। ব্যাংকগুলোতে প্রচুর অলস টাকা পড়ে আছে। রির্জাভও বেশ ভালোই রয়েছে। এছাড়া পৃথিবী জুড়ে ৯৭ লাখ বাংলাদেশী ওয়েজ আর্নার রয়েছে। তারা প্রতিদিনই বৈদেশিক মুদ্রা দেশে পাঠাচ্ছে। এটা একটি শক্তিশালী নেয়ামক। তাদের মধ্যেও অনেক উদ্যোক্ততা  রয়েছেন। উপযুক্ত পরিবেশ ও সাহায্য পেলে তারাও বিনিয়োগে আগ্রহী হবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের সরকারের উদ্যোগে অর্গানাইজেশনাল ক্যাপাবিলিটি বিল্ডিংয়ের কাজ শুরু করা প্রয়োজন। যদি উদ্যোক্তারা জানেন যে কীভাবে একটি ফ্যাক্টরি তৈরি করে সফল হওয়া যায় তাহলে অনেক নিজস্ব বিনিয়োগকারী বেরিয়ে আসবে। এরমধ্যে প্রযুক্তিগত দক্ষতা, ম্যানেজারিয়াল দক্ষতা বৃদ্ধিসহ ভোক্তা ও ক্রেতাদের প্রতি যত্নশীল হওয়ার ব্যাপারে প্রশিক্ষণ দরকার। এছাড়া, কোয়ালিটি কন্ট্রল, বিপণন ব্যবস্থা এবং কীভাবে ফ্যাক্টরির উৎপাদনে সিস্টেম লস কমানো যায় তার উপরে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দরকার। এটা কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে এমবিএ কোর্স করে শেখা সম্ভব নয়। এটা করতে হবে ‘লার্নিং বাই ডুইং’ পদ্ধতিতে। এপদ্ধতিতেই উন্নত বিশ্ব আজ  এগিয়ে গেছে।
তিনি বলেন, সাধারণত লার্নিং বাই ডুইং পদ্ধতি শুধুমাত্র প্রাইভেট উদ্যোগে গড়ে ওঠা সম্ভব নয়। তবে পার্টনারশিপের ভিত্তিতে গড়ে উঠতে পারে। অবশ্যই সরকারি পর্যায়ে এজন্য সাপোর্ট প্রয়োজন। উন্নত বিশ্বসহ সমকালীন যে দেশগুলো মধ্যম আয়ের দেশ কিংবা তারচেয়েও উন্নত হয়েছে তারা সকলেই এই পদ্ধতি গ্রহণ করেছে। এটা খুব অল্প সময়ের মধ্যে কার্যকর পদ্ধতি। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, ওয়ালটন, রহিম আফরোজ এবং এর অনেক আগে দেশ গার্মেন্টসসহ বাংলাদেশের অনেক সফল কোম্পানি এ পদ্ধতির মাধ্যমেই সফলতা লাভ করেছে। দুর্নীতি এবং দেশ থেকে টাকা পাচার হওয়ার মতো ব্যাধি সব উন্নয়নশীল দেশেই হয়ে থাকে। এগুলো অবশ্যই রোধ করতে হবে। কিন্তু নতুন প্রতিযোগিতামূলক খাত তৈরি করতে পারলে ধনিক শ্রেণী উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ করতে বেশি আগ্রহী হবে।
তিনি বলেন, দুর্নীতি পৃথিবীর কম-বেশি সকল দেশেই রয়েছে। দেশের উন্নয়নের জন্য একটি পরিপক্ক গাইড লাইন বা পলিসি জরুরি মনে করেন প্রফেসর খান।