ইত্তেফাকের বাষট্টি বছর

আপডেট : ২৪ ডিসেম্বর ২০১৪, ১১:৫২




দেখতে দেখতে বুড়িয়ে গেলাম। শহীদ সোহরাওয়ার্দী যখন কখনও কখনও বক্তার অর্থাত্ সভাপতির বক্তব্য রাখতে গিয়ে দেখতে পেতেন সন্ধ্যা পেরিয়ে রাতের আঁধার নেমে এসেছে, তখন খানিকটা প্রবাদ টানার মতো বলে উঠতেন—Time passes so quickly. আসলেই তো সময় কি দ্রুততার সাথে এগিয়ে চলে! আমাদের অলক্ষ্যে সময় এগিয়ে যায় বুঝিবা জেট-গতিতে। এমনিভাবে যখন এক-আধবার সময়ের এই দ্রুত চলা আমাদের নজরে পড়ে তখন মরমী কবি হাছন রাজার মতই নিজের শ্বেত-শুভ্র পক্বকেশ দর্শনে আঁতকে উঠতে হয় বৈকি! মন গেয়ে ওঠে—‘আয়না দিয়া চাইয়া দেখি পাকনা চুল আমার!’
এসব কথা মনে এলো দৈনিক ইত্তেফাকের বাষট্টিতম বর্ষে পদার্পণের ঘটনাকে ঘিরে। দেখতে দেখতে ইত্তেফাক বাষট্টি বছরের পথ পরিক্রমণের মধ্য দিয়ে আজ পুরোহিতের মর্যাদায় আসীন। পেছনে তাকিয়ে দেখছি যে, সময় কত দ্রুত তালে বয়ে গেছে। ব্যক্তিগতভাবে আমার সঙ্গে সম্পর্ক, সখ্য, বন্ধন দুই প্রজন্ম কেন্দ্রিক। আমার পিতা সিরাজুদ্দীন হোসেন পত্রিকাটির সবচাইতে গৌরবোজ্জ্বল পর্বে এর অন্যতম কাণ্ডারী থাকার সুবাদে আমার সেই শৈশব থেকে তারুণ্যে উত্তীর্ণ হবার সময় পর্যন্ত এক নিবিড় ও অচ্ছেদ্য মানসিক বন্ধন তৈরি হয়েছিল। এ হচ্ছে আমার পূর্ববর্তী প্রজন্মের অর্থাত্, পিতার ভাবনা-চিন্তা-চেতনা ইত্যাদি যা তার জীবদ্দশায় ইত্তেফাকে প্রতিদিন প্রতিফলিত হতো—এর সঙ্গে রচিত এক অটুট সম্পর্ক। আর দ্বিতীয় প্রজন্ম, অর্থাত্ আমি, নিজে এই পত্রিকাটির সঙ্গে শারীরিকভাবে যুক্ত হলাম সেই নভেম্বর ১৯৭৩-এ। তখন রচিত হলো আর-এক বন্ধন। পিতৃচেতনার ধারাবাহিকতাকে বয়ে নিয়ে যাওয়ার আকুলতা তৈরি হয়েছিল মনে তারুণ্যের সেই প্রথম প্রদোষে। ’৭১ এ আব্বা ঘাতক আলবদর-আলশামসের হাতে নির্মমভাবে নিহত হবার কারণে ইত্তেফাকের মালিক ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন, আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এবং তদানিন্তন বার্তা সম্পাদক আসাফ উদ দৌলা রেজার স্নেহানুকূল্যে ’৭৩ এর ১০ নভেম্বর হাটখোলাস্থ ইত্তেফাক ভবনে আমার ভীরু পদচারণার সূচনা ঘটে। দেশ তখন সদ্য স্বাধীনতা লাভ করেছে। একাত্তরের ২৬ মার্চ ভোরে হানাদার বাহিনী (স্মৃতিতে এখনও অমলিন সেই কাঠের সিঁড়ির পুরনো দ্বিতল বাড়িটি) ইত্তেফাকে কামানের গোলা নিক্ষেপ করেছে আর অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে পুরো ভবনটিকেই একেবারেই আক্ষরিক অর্থে ছাইয়ে রূপান্তরিত করেছে। সেই অবিশ্বাস্য নারকীয় আক্রমণের মধ্যে থেকেও আব্বা, রেজা চাচা, হাবিবুর রহমান মিলন চাচা, এহিয়া বখত চাচা, আবেদ খান প্রমুখ বিধাতার অদৃশ্য ইঙ্গিতে প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলেন। সে যাক। সে সব অন্য কথা।
এই মুহূর্তে চিকিত্সার্থে দেশের বাইরে অবস্থানকালে ৬২ বছর বয়সী ইত্তেফাক সম্পর্কে কিছু লেখার জন্য মনের মধ্যে কেমন যেন এক আবেগ উথলে উঠছে। রবীন্দ্রনাথের সেই— ‘প্রাণের বেদনা প্রাণের আবেগ রুধিয়া রাখিতে নারি’ অবস্থা আর কী!
সত্যিইতো! ইত্তেফাক সম্পর্কে লিখতে গেলে এ আবেগ রোধ করা সম্ভব নয়। এত কথা, এত স্মৃতি, এত ঘটনা, এত ইতিহাস এই পত্রিকাটির সঙ্গে জড়িত যা উদ্ধার করতে হলে একদল একনিষ্ঠ গবেষককে দশকের পর দশক গভীর অভিনিবেশ সহকারে কাজ করতে হবে। বাংলাদেশের রাজনীতির, বিশেষত, পাকিস্তান পর্বের রাজনীতির বদখত চেহারা এবং শাসকদের ইতর উদ্দেশ্যের বিরুদ্ধে এ অঞ্চলের মানুষকে অজেয় সংগ্রামী কাফেলায় রূপান্তরিত করার যে কাহিনী তা-ই লিপিবদ্ধ আছে পঞ্চাশ ও ষাট দশকের রাজনীতির পাতায় পাতায় এবং এতে প্রকাশিত সব প্রতিবেদন, সম্পাদকীয়-উপসম্পাদকীয়, নিবন্ধ-প্রবন্ধের ছত্রে ছত্রে। মনে রাখতে হবে দেশবিভাগ পূর্বকালে বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগ রাজনীতির ত্রিমুখী উপধারার মধ্যে শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বাধীন উপধারায় ইত্তেফাকের অবস্থান। শহীদ সোহরাওয়ার্দীর চিন্তা ও চেতনার ধারাটিই  বিভাগ-পূর্ব এবং বিভাগ-পরবর্তী মুসলিম রাজনৈতিক মানসে অসাম্প্রদায়িক এই আধুনিক রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক চেতনা সঞ্চারে সবচাইতে কার্যকর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। অক্সফোর্ড ফেরা সোহরাওয়ার্দীর রাজনৈতিক জীবনের সূত্রপাত ঘটে কলকাতার খিদিরপুর ডকইয়ার্ডের শ্রমিক এবং কলকাতার ধাঙরসহ বিভিন্ন অবহেলিত-দুর্দশাগ্রস্ত শ্রমিকদের নিয়ে। পরে তাঁকে আমরা উপমহাদেশের অন্যতম প্রধান অসাম্প্রদায়িক চেতনাসমৃদ্ধ ব্যক্তিত্ব দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের স্বরাজ পার্টির প্রধানতম এক নেতা হিসেবে পাচ্ছি। মোদ্দাকথা, ভারতের জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের বলিষ্ঠ সৈনিকরূপেও দেখা যাচ্ছে তাঁকে। বঙ্গীয় মুসলিম লীগের রাজনীতিতে খাজা নাজিমুদ্দীন, মওলানা আকরাম খাঁ প্রমুখ কট্টর দক্ষিণপন্থি নেতাদের বিপরীতে তিনি উদারনৈতিক গণতান্ত্রিক ধারায় যে অবস্থান গ্রহণ করেন তাতে বাংলার নবাব-নাইট প্রভাবিত মুসলিম লীগ রাজনীতিতে তাঁকে উজানে নাও বাওয়ার কাজই করে যেতে হয় দীর্ঘদিন। এই সংগ্রামকালে তিনি যেসব তরুণ তুর্কীকে নিজ ভাবাদর্শে উজ্জীবিত করতে পেরেছিলেন তাঁদের মধ্যে দৈনিক ইত্তেফাকের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন অন্যতম। তাছাড়া কলকাতার ইসলামিয়া কলেজ তখন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। ঐ কলেজেরই ছাত্র ও শেখ মুজিবুর রহমানের সহপাঠী সিরাজুদ্দীন হোসেন, শামসুদ্দীন মোল্লা, খালেক নেওয়াজ খান, এম এ সালেহ, আনোয়ার হোসেন, আসাফ উদ দৌলা রেজা প্রমুখ তার ভাবশিষ্য হিসেবে স্ব স্ব কর্মক্ষেত্র থেকে পরবর্তীতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনীতে ঐ সময়ের বঙ্গীয় মুসলিম রাজনীতির ক্ষেত্রে শহীদ সোহরাওয়ার্দীর পথ-বিপথের রাজনীতিকদের চিত্র পাওয়া যায়।
ইত্তেফাকের কথা বলতে গেলে অনিবার্যভাবে শহীদ সোহরাওয়ার্দীর কথা এসে যায়। কেননা, ইত্তেফাক তারই ভাব-ভাবনা ও চিন্তা-চেতনাকে নিষ্ঠার সঙ্গে লালন করেছে স্বাধীনতার পূর্ব লগ্ন পর্যন্ত। এই চেতনা সর্বোতভাবে অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক চেতনা। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে শাসকবর্গ যে অন্যায় ও বিমাতাসুলভ আচরণ করে তা সকল বিচারেই হিংসাশ্রয়ী। এই নিবন্ধে আমি স্বাধীনতা-পূর্ব পর্যন্ত ইত্তেফাকের ভূমিকা বিষয়েই বলতে চাই। সময়ে-সুযোগে স্বাধীনতা-উত্তর ইত্তেফাকের কথা আলোচনা করা যাবে বৈকি! চল্ল্লিশ ও পঞ্চাশ দশকের রাজনীতির গতি-প্রকৃতির উপর ঘনিষ্ঠদৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে এ অঞ্চলের বঞ্চিত-শোষিত মানুষের মনে বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার পুনঃউন্মেষ এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনায় তাদের উদ্বুদ্ধ করতে ইত্তেফাক সকল রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে নিজেকে ব্যাপৃত রেখেছে। এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার গণতন্ত্রের প্রতি কমিটমেন্ট, পূর্ব-পাকিস্তানের শোষিত-বঞ্চিত মানুষের স্বাধিকার ও অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য অকুতোভয়ে ও নিরলস কলম-চালনা আর সার্বিকভাবে গণমানুষের প্রত্যাশা ও মনের আকুতিকে সোচ্চার কণ্ঠে তুলে ধরার মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনা অত্যন্ত দ্রুতলয়ে বিকাশলাভের পথ খুঁজে পায়। মানিক মিয়ার নেতৃত্বে একটি মিশনারি টিম নিয়ে এর তাবত্ সাংবাদিক, কর্মীরা সকল প্রকার বাধা অতিক্রম করে গেছেন সেসব দিনগুলিতে। সে সময়ের ইত্তেফাককে কেউ কেউ আওয়ামী লীগের মুখপত্র বলে প্রচার করেন। কিন্তু আওয়ামী লীগের সঙ্গে যে চলনে-বলনে অনেক ব্যবধান ছিল তা নিশ্চয়ই অনুসন্ধিত্সু পাঠক বা গবেষকের দৃষ্টি এড়ায় না।
যা হোক, ইত্তেফাক যখন সাপ্তাহিক ছিল তখন এই দেশে ভাষা আন্দোলন হয়। ভাষা আন্দোলনের পক্ষে সাপ্তাহিক ইত্তেফাকের অনবদ্য ভূমিকা ইত্তেফাককে গণমানুষের স্বার্থের হাতিয়ার হিসেবে প্রথম প্রতিষ্ঠা এনে দেয়। অতঃপর দৈনিক হিসেবে মুসলিম লীগের অগণতান্ত্রিক ও স্বৈরতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এক প্রচণ্ড-প্রবল প্রতিবাদী পত্রিকারূপে আত্মপ্রকাশ করে। জনস্বার্থ হয়ে ওঠে ইত্তেফাকের উপজীব্য এবং বঞ্চিত মানুষের আর্তনাদ ও হাহাকার ক্রন্দসী বাংলার ফরিয়াদরূপে প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে এর পাতায় পাতায়। তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার অনন্যবৈশিষ্ট্যে ভাস্বর ‘রাজনৈতিক মঞ্চ’ বা ‘রাজনৈতিক ধোঁকাবাজি’ হতদরিদ্র, শোষিত মানুষের তথা আর্তপীড়িতের যন্ত্রণা-চিত্কার হিসেবে সাড়া জাগানো, অন্যদিকে, বার্তা সম্পাদক সিরাজুদ্দীন হোসেনের অসাধারণ মুন্সিয়ানায় প্রস্তুতকৃত এর জনস্বার্থ-সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনসমূহে, সংবাদ পরিবেশনার অভিনবত্বে মতপ্রকাশের দুরন্ত সাহস প্রদর্শনে এবং অনন্যসাধারণ শিরোনামে ইত্তেফাক অনন্য বৈশিষ্ট্য লাভ করে। ’৬৪ সালে আইয়ুব আমলে উদ্দেশ্যমূলকভাবে দাঙ্গা সৃষ্টির পাঁয়তারার বিরুদ্ধে ইত্তেফাকের ‘পূর্ব বাংলা রুখিয়া দাঁড়াও’ শীর্ষক ব্যানার হেডলাইন যেন যুদ্ধক্ষেত্রে সেনাপ্রধানের নির্দেশরূপে পূর্ব বাংলার মানুষের কর্তব্য-কর্ম নির্ধারণ করে দেয়। ঐ দাঙ্গা প্রতিরোধ কমিটি গঠিত হয় মানিক মিয়ার সভাপতিত্বে। ’৫৪ এর নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের বিজয়লাভ যে গুটিকয় কারণে সম্ভব হয়েছিল তার অন্যতম একটি যে ইত্তেফাকের প্রচারণা কৌশল— এ সত্য আজ ইতিহাসের অন্তর্গত বিষয়। ’৫৪ এর বিজয়ের জন্য এবং বিশ্বাসঘাতকতামূলক যুক্তফ্রন্টের পতন ঘটানোর বিরুদ্ধে ইত্তেফাক যে কলমযুদ্ধ পরিচালনা করেছে তা এদেশের সংবাদপত্রের ইতিহাসে অন্যতম গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়।
মুসলিম লীগ নেতা ফজলুল কাদের চৌধুরীর ‘ভ্যানগার্ড’ ও শুক্কুইয্যাকে কেন্দ্র করে রচিত সিরাজুদ্দীন হোসেনের অবিসংবাদিত সেই ‘শুক্কুইয্যা কডে’ বা আইয়ুবের বিডি চেয়ারম্যানকে ষাঁড় কর্তৃক আক্রমণের খবর পরিবেশনে—‘চিনিল কেমনে’ শিরোনাম জনমনে কী দারুণ আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল তা ভাবতেও বিস্মিত হতে হয়।
একইভাবে ঊনসত্তরে দেশব্যাপী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহে ছাত্রলীগের জয়-জয়কার সম্পর্কে ‘এ যৌবন জলতরঙ্গ রোধিবি কি দিয়া বালির বাঁধ’— শীর্ষক শিরোনাম কী লাগসই-ই না হয়েছিল! মিথ্যা আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে বঙ্গবন্ধুর মুক্তিসম্পর্কিত মূল প্রতিবেদনে সিরাজুদ্দীন হোসেন লিখেছিলেন, ‘অবশেষে বাংলার মাটিতে বাস্তিলের কারাগার ধ্বসিয়া পড়িয়াছে। জনতার জয় হইয়াছে।’ ঊনসত্তরের এক রাতে ঢাকায় প্রথম কারফিউ ভঙ্গ করতে লাখো মানুষ রাস্তায় বেরিয়ে পড়েছিল। সেদিন শিরোনাম হয়েছে— ‘বিক্ষুব্ধ নগরীর ভয়াল গর্জন।’ মোদ্দাকথা, যুক্তফ্রন্ট এবং এর পরবর্তী সকল অধ্যায়ে ইত্তেফাকের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া আর সিরাজুদ্দীন হোসেনের নেতৃত্বে এক অনবদ্য বুদ্ধির লড়াই করে গেছে ইত্তেফাক গণবিরোধী কুচক্রীদের বিরুদ্ধে। এক্ষেত্রে কোন ভয়-ভীতি বা প্রলোভন পারেনি তাদের আদর্শ বিচ্যুত করতে। এমনিভাবে পূর্ব পাকিস্তানের গণমানুষের স্বাধিকার ও স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে ইত্তেফাক সংগ্রামের যে পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছে তা ভাবাও কঠিন। স্বৈরাচারী শাসকগোষ্ঠী এজন্য বারবার ইত্তেফাকের কণ্ঠরোধ করতে চেয়েছে; এর প্রেস বাজেয়াপ্ত করেছে; সকল সাংবাদিক-কর্মচারীকে চাকুরিচ্যুত করেছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও প্রায় তিন বছর মিথ্যা অহমিকায় আইউব-মোনেম ইত্তেফাকের প্রকাশনা নিষিদ্ধ রাখলেও জনদাবির চাপে পুনরায় আত্মপ্রকাশের অনুমতি দিতে বাধ্য হয়েছে তারা।
প্রকৃতপ্রস্তাবে, সে-সময়ের ইত্তেফাক সাধারণভাবে এ অঞ্চলের রাজনীতির পথ-প্রদর্শক আর আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগ রাজনীতির দার্শনিকের ভূমিকা পালন করেছে। এগুলো কোনো কথার কথা নয়, নিরেট ঐতিহাসিক সত্য। চল্লিশের দশকে বাংলায় মুসলমানদের কাছে আজাদ পত্রিকাটি খুবই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। পরে শহীদ সোহরাওয়ার্দীর পৃষ্ঠপোষকতা ও অর্থানুকূল্যে কলকাতা থেকে ইত্তেহাদ প্রকাশিত হয়। আবার ঢাকা থেকে মিল্লাত, ইনসাফ ইত্যাদি পত্রিকাগুলিও প্রকাশিত হয় বিভাগোত্তর পর্বে। ফলে এইসব পত্রিকার মাধ্যমেই আমাদের এই অঞ্চলে সাংবাদিকতার সূত্রপাত ও সুযোগ ঘটে। এবং তখন অনেক তরুণ এই পেশায় আকৃষ্ট হতে থাকে। কলকাতার আজাদে বা ইত্তেহাদে কাজ করার অভিজ্ঞতা-সম্পন্ন অনেকেই বাংলা ভাগ হয়ে গেলে বা পাকিস্তান অর্জিত হলে ঢাকায় চলে আসেন। এদের মধ্যে বার্তাবিভাগে কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্নদের মধ্যে জহুর হোসেন চৌধুরী, কাজী মোহাম্মদ ইদ্রিস, খায়রুল কবির, সিরাজুদ্দীন হোসেন, খন্দকার আবু তালেব, খন্দকার মহম্মদ ইলিয়াস, কেজি মুস্তফা, রুহুল কুদ্দুস প্রমুখ ছিলেন। অন্যদিকে সম্পাদকীয় বিভাগে আবুল কালাম শামসুদ্দীন, মুজিবুর রহমান খাঁ, আবুল মনসুর আহমদ, আবু জাফর শামসউদ্দীন ছিলেন উল্লেখযোগ্য। তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া কলকাতায় সোহরাওয়ার্দী সাহেব প্রতিষ্ঠিত ইত্তেহাদের ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে নিয়োজিত থাকার সুবাদে এই পেশার প্রতি আকৃষ্ট হন। সোহরাওয়ার্দী সাহেবের সান্নিধ্য আর পত্রিকার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা তাঁর প্রখর রাজনৈতিক চেতনাকে অতিসত্ত্বর শাণিত করতে সহায়ক হয় এবং পরবর্তীকালে ঢাকায় প্রথমে সাপ্তাহিক ও পরে দৈনিক ইত্তেফাকে কলামিস্ট-সম্পাদক হিসেবে তার আত্মপ্রকাশ ঘটে। আমাদের সাংবাদিকতার ইতিহাসে মানিক মিয়ার ঐ রাজনৈতিক কলামের ধারে-কাছে ঘেঁষার মতো কোনো কলাম সেদিন যেমন, আজও তেমনই সৃষ্টি হয় নি। অস্বীকার করা যাবে না যে, ইত্তেফাকের জনপ্রিয়তা লাভের পেছনে তার ‘রাজনৈতিক মঞ্চ’ ছিল অন্যতম প্রধান কারণ।
পাকিস্তান অর্জিত হবার পরপরই জিন্নাহ সাহেবের মৃত্যুর (অনেকেই মনে করেন ষড়যন্ত্রমূলকভাবে তাকে একপ্রকার হত্যাই করা হয়েছিল) মধ্য দিয়ে পাকিস্তানে এমন এক শাসনধারা প্রবর্তন করা হয় যা ছিল সর্ববিচারে বৈষম্যমূলক এবং অগণতান্ত্রিক। উপরন্তু একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের পরিবর্তে প্রচ্ছন্নভাবে একটি মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার নামে এক ধরনের জগাখিচুড়ি অবস্থা সৃষ্টি করা হয়। পাকিস্তানের প্রধান স্রষ্টা শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে ‘ভারতের লেলানো কুকুর’ আখ্যা দিয়ে পাকিস্তানে প্রবেশে বাধা দেয়া হয়। তাছাড়া সামরিক-বেসামরিক  আমলাতন্ত্র অসত্ ও গণবিরোধী রাজনীতিকদের সহায়তায় ক্ষমতার কেন্দ্রে অবস্থান নিতে থাকে। প্রতিশ্রুত লাহোর প্রস্তাব-ভিত্তিক সাংবিধানিক কাঠামোর পরিবর্তে দেশবাসীর ওপর শোষণ-বঞ্চনা চাপিয়ে দেবার সকল আয়োজন শুরু হয়। বাংলাভাষার ওপর আক্রমণ, রবীন্দ্রনাথকে নির্বাসনে প্রেরণ, জাতীয় জীবনের সকল ক্ষেত্রে পূর্ব পাকিস্তানবাসীর প্রতি বিমাতাসুলভ ও বৈষম্যবাদী আচরণ, স্বৈরতন্ত্র ও সাম্প্রদায়িকতার বিষ ছড়ানো— ইত্যাদি হয়ে ওঠে নিত্যদিনের চিত্র।
একটি আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের পরিবর্তে একটি শোষণবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থা ক্রমান্বয়ে জনগণের বুকের ওপর জগদ্দল পাথরের মতো জেঁকে বসতে থাকে। এই গণবিরোধী শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে পূর্বাঞ্চলে শোষিত-বঞ্চিত মানুষকে অধিকার সচেতন ও সংগ্রামী চেতনায় বলীয়ান করার জন্য মানিক মিয়ার ইত্তেফাক জান কবুল করে নামে। সোহরাওয়ার্দী-শেরে বাংলা-ভাসানী-মুজিবের নেতৃত্বে আন্দোলন গড়ে তুলতে পত্রিকাটি সকল ভয়-ভীতিকে অগ্রাহ্য করে দৃঢ় পদক্ষেপে এগিয়ে গেছে। এদেশের স্বাধিকার থেকে সায়ত্ত্বশাসন এবং সায়ত্ত্বশাসন থেকে স্বাধীনতায় উত্তরণপর্বে ইত্তেফাকের অবিসংবাদিত ভূমিকার কথা বলে শেষ করা যাবে না। বাঙালির মুক্তির সনদ ছয় দফার ওপর যখন স্ট্রং ম্যান আইউব অস্ত্রের ভাষা প্রয়োগ করেছেন, তখন মানিক মিয়ার কলম গর্জে উঠেছে, ইত্তেফাক ভিসুভিয়াসের মতো অগ্নিস্রাব বর্ষণ করেছে দুঃশাসনের চোখে-মুখে, ফলে ইত্তেফাকের প্রেস বারবার বাজেয়াপ্ত করেছে শাসকরা এবং মানিক মিয়াকে জেল-জুলুম নির্যাতন সইতে হয়েছে। আর সিরাজুদ্দীন হোসেনের বিরুদ্ধে জারি করা হয়েছে হুলিয়া। পাকিস্তান-পর্বে (১৯৫১-’৭১) গণমানুষের অধিকার আদায়ের আর বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার নব-উন্মেষ ও তার বিকাশের ব্যাপারে ইত্তেফাক যে সংগ্রামী আলেখ্য রচনা করেছে তা অনন্যসাধারণ গৌরববাহী বিষয়ই বটে। নির্ভীক ও আপোষহীন এই দুটি শব্দের মধ্যে মানিক মিয়া বা তাঁর ইত্তেফাককে ব্র্যাকেটবন্দী করা চলে বটে। কিন্তু এটুকুর মধ্যেই এর সকল পরিচয় ফুঠে ওঠে না। রাশিয়ায় ইসক্রা যেমন স্ফুলিঙ্গ থেকে দাবানল জ্বালিয়ে দিয়েছিল, ইত্তেফাকও তেমনি সেই সময়ে তূর্যবাদক নকীবরূপে তন্দ্রাচ্ছন্ন জাতির মনে মহাজাগরণের আকাঙ্খা সৃষ্টি করে দিয়েছে। এসব সম্ভব হয়েছে মানিক মিয়ার নেতৃত্বে সেদিনের সাংবাদিকদের জনগণের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে নিষ্ঠা-সাহস-সততা আর বুদ্ধিমত্তার অপূর্ব সমন্বয় ও সংমিশ্রণ গড়ে ওঠার কারণে।
ইত্তেফাকের সেদিনের সম্পাদকীয় দপ্তরের দিকে তাকালে একঝাঁক উজ্জ্বল নক্ষত্রের চেহারা নজরে পড়ে। মানিক মিয়া বামপন্থী ছিলেন না, কিন্তু তাঁর সম্পাদকীয় বিভাগে বামপন্থীদের ভিড় ছিল লক্ষ্যণীয়। এর মানে এই নয় যে, বামপন্থীদের মনোবাঞ্ছা পূরণের ক্ষেত্র ছিল ইত্তেফাক। বরং এর মানে এই যে, রাজনৈতিক চেতনামনষ্ক প্রগতিবাদী বামধারার রাজনৈতিক লেখক-কর্মীদের জন্যও তিনি ছিলেন ভরসা ও আশ্রয়স্থল। চাকরিতে নিয়োগ দিয়ে শাসকদের রোষবহ্নি থেকে এদের খানিক নিরাপদ দূরত্বে রাখার এ ছিল তাঁর এক মানবিক কৌশল। আব্দুল আউয়াল, মঈদুল হাসান, আলী আকসাদ, কে জি মুস্তফা, শামসুল হক, আহমেদুর রহমান, নির্মল সেন প্রমুখ এদের অন্যতম। তাছাড়া, আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী, খন্দকার আব্দুল হামিদ, রাহাত খান, আখতারুল আলম, হাবিবুর রহমান মিলন, জিয়াউল হক, মহাদেব সাহা-সহ অনেকেই সম্পাদকীয় বিভাগে কাজ করেছেন।
দেখা যাবে, বাংলাদেশের বর্তমান সময়ের প্রথিতযশা সম্পাদক ও সাংবাদিকদের এক বৃহত্ সংখ্যকই কোনো না কোনো সময়ে ইত্তেফাকের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এদের মধ্যে গোলাম সারওয়ার, আবেদ খান, আহসানউল্লাহ, জাহীদুজ্জামান ফারুক, আমির হোসেন প্রমুখ বিভিন্ন দৈনিকের সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন।
সিরাজুদ্দীন হোসেন, আসাফ-উদ-দৌলা রেজা, নূরুল ইসলাম পাটওয়ারী, এহতেশাম হায়দার চৌধুরী, ফয়েজ আহমদ, এম আর আখতার মুকুল, কামাল লোহানী, নূরুল ইসলাম ভান্ডারি, খন্দকার আবু তালেব, মোহাম্মদউল্লাহ চৌধুরী, মিজানুর রহমান, রোকনুজ্জামান খান, বজলুর রহমান, আল মাহমুদ, আমিরউদ্দীন আহমদ, তাহেরউদ্দীন ঠাকুর, টিএম গিয়াসউদ্দীন, তোহা খান, জহিরুল আলম, শফিকুল কবির, নজরুল ইসলাম, হাসান ইকবাল, নাজিমুদ্দীন মোস্তান, আব্দুল বাতেন, শাহাবুদ্দীন ভুঁইয়া, প্রশান্ত ঘোষাল, মীর আফতাবউদ্দীন আহমদ, সিরাজুল হক, লুত্ফর রহমান, সৈয়দ শাহজাহান, আলমগীর হোসেন, ইয়াসিন আহমদ, মীর মুস্তাফিজ আহমদ, এমএ রব, এহিয়া বখত, আব্বাসউদ্দীন আফসারী, সাইদুল ইসলাম, শেখ গোলাম মুস্তাফাসহ আরও অনেকেই ইত্তেফাকে সাংবাদিকতা করেছেন। তাঁদের খ্যাতি এবং প্রতিষ্ঠা ঘটেছে এই ইত্তেফাকের সুবাদেই।
এখানে এই মুহূর্তে যাঁদের নাম বাদ পড়ে গেছে তাঁদের কাছে আমি ক্ষমাপ্রার্থী। স্বাধীনতা-উত্তরকালে ইত্তেফাকের আঙ্গিকে সংবাদ পরিবেশনা-সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনেক আধুনিকতার ছাপ লক্ষণীয়। একই সঙ্গে ইত্তেফাক আজও তার গৌরববাহী লিগ্যাসি বহন করে চলেছে; আর তা এই জন্য যে, ইত্তেফাক জনস্বার্থের বিষয়টিকেই সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করে। সেই ঐতিহ্যের ধারায় ইত্তেফাক পথ চলবে, চলতেই থাকবে।
লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক ইত্তেফাক