নব্বইয়ে ক্ষমতা ছাড়ার প্রায় ২৪ বছর পর দলীয়ভাবে রাজধানী ঢাকায় সবচেয়ে বড় সমাবেশ করার উদ্যোগ নিয়েছে এইচএম এরশাদের জাতীয় পার্টি (জাপা)। দলের ২৯তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর উছিলায় আগামী পহেলা জানুয়ারি ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মহাসমাবেশ করতে যাচ্ছে দলটি। এতে ১০ লাখ লোকের সমাগম ঘটানোর কথা বলা হচ্ছে। এজন্য চলছে ‘মহাআয়োজন’। ১২ লাখের বেশি রঙ্গিন পোস্টার, দুই হাজার ফেস্টুন, পাঁচশ ব্যানার ও পাঁচশ বিলবোর্ড লাগানোর এবং ১৪ লাখ প্রচারপত্র বিলির কাজ চলছে। পাঁচ কোটি টাকারও বেশি বাজেটের এই সমাবেশের অর্থ সংস্থানের উত্স নিয়ে যেমন অস্পষ্টতা রয়েছে, তেমনি দলের সাধারণ নেতা-কর্মীদের ভেতরেই রয়েছে কৌতূহল। এনিয়ে চলছে কানাঘুষা।
জাপার ভেতর-বাইরের একাধিক সূত্রের দাবি, দেশ-বিদেশের সামনে জাপাকে একটি ‘শক্তিশালী বিরোধী দল’ হিসেবে উপস্থাপনের লক্ষ্যে দলটির এই মহাসমাবেশে পেছন থেকে পৃষ্ঠপোষকতা দিচ্ছে সরকার। দশম সংসদ নির্বাচনের প্রথম বর্ষপূর্তির দিন পাঁচ জানুয়ারিকে ঘিরে বিএনপি যখন রাজধানীর মাঠ দখলের কথা বলছে, এর আগেই জাপার মাধ্যমে জনদৃষ্টি অন্যদিকে ঘুরানোর লক্ষ্যেও জাপার মহাসমাবেশে উত্সাহ ও সমর্থন রয়েছে ক্ষমতাসীনদের। লক্ষ্য অর্জনে মহাসমাবেশে ব্যাপক জনসমাগম ঘটাতে সরকারি দল জাপাকে অর্থ ও লোকজন দিয়েও সহযোগিতা করছে বলে সূত্রগুলো দাবি করেছে।
এ ব্যাপারে জাপার মহাসচিব ও পহেলা জানুয়ারির মহাসমাবেশ প্রস্তুতি কমিটির আহ্বায়ক জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, ‘এই সমাবেশের সঙ্গে সরকারের কোনো সম্পর্ক নেই। তাদের থেকে আমরা লোকও নিচ্ছি না, কোনো টাকাও নিচ্ছি না। জাপা সংসদ ও রাজপথের সত্যিকারের বিরোধী দল—এটি প্রমাণ করতেই আমরা এই মহাসমাবেশ করছি। সমাবেশ থেকে আমরা বিএনপির নেতিবাচক রাজনীতির পাশাপাশি সরকারের অনিয়ম-দুর্নীতি-দুঃশাসনের বিরুদ্ধেও বক্তব্য রাখবো। তখনই প্রমাণ হবে, এই সমাবেশে সরকারের কোনো পৃষ্ঠপোষকতা নেই।’
সরকার কিংবা সরকারি দল থেকে আর্থিক ও লোকসংখ্যার সহযোগিতা নেয়ার কথা অস্বীকার করলেও প্রশাসনিক আনুকূল্য পাওয়ার বিষয়টি এড়াতে পারেননি জিয়াউদ্দিন বাবলু। তিনি নিজেই জানালেন, পহেলা জানুয়ারি মহাসমাবেশের জন্য এরইমধ্যে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) অনুমতি দিয়েছে। মহাসমাবেশের দিন আশপাশের কয়েক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ১৬০টি মাইক ব্যবহারেরও ‘শর্তহীন’ অনুমতি দিয়েছে পুলিশ। মহাসমাবেশ প্রস্তুতি কমিটির যুগ্ম-আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট রেজাউল ইসলাম ভুঁইয়াও ডিএমপি’র এই অনুমতির কথা স্বীকার করেছেন।
প্রসঙ্গত, বর্তমান সরকারের সময় বিএনপির মত দলকেও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশ করার সময় ২০-২২টির বেশি মাইক ব্যবহারের অনুমতি দেয়া হয়নি। এমনকি সমাবেশ করতে বিএনপি বা ২০ দলকে কখনও ১১, কখনও ১৩ আবার কখনও ২০টি পর্যন্ত শর্ত জুড়ে দিয়েছিল ডিএমপি। জাপাকে কোনো শর্ত দেয়া তো দূরের কথা, বরং প্রশাসনের আনুকূল্যই দৃশ্যমান। মহাসমাবেশের প্রচারণার অংশ হিসেবে ইতিমধ্যে ঢাকা মহানগরীর দক্ষিণের ২৪টি ও উত্তরের ২৭টি থানার বিভিন্ন ওয়ার্ডে প্রতিদিনই মিছিল ও পথসভা করছেন স্থানীয় নেতা-কর্মীরা। উত্তরা, তেজগাঁও, মুগদা, বাসাবো, মোহাম্মদপুরসহ ১১টি স্থানে গতকাল রাতেও মিছিল-পথসভা হয়েছে। এসব মিছিল-সভার জন্য পুলিশের কোনো অনুমতি লাগছে না। এমনকি ঢাকাজুড়ে পোস্টার, ফেস্টুন, ব্যানার ও বিলবোর্ড লাগানোর জন্যও দলটির কোনো অনুমতির দরকার হয়নি।
মহাসমাবেশ আয়োজনের সঙ্গে জাপার সংশ্লিষ্টরা প্রচার-প্রচারণাসহ প্রস্তুতির যাবতীয় বিবরণ তুলে ধরে ইত্তেফাককে জানান, দল থেকে কেন্দ্রীয়ভাবে ১০ লাখ রঙ্গিন পোস্টার ছাপানো হয়েছে। এরমধ্যে ঢাকায় আট লাখ ও বাইরে দুই লাখ লাগানো হচ্ছে। দুই হাজার ফেস্টুন লাগানো হবে, ইতিমধ্যে এক হাজার লাগানোর কাজ শেষ। ঢাকা মহানগরীতে পাঁচশ বিলবোর্ড লাগানো হবে, এরমধ্যে দুইশ লাগানো হয়ে গেছে। ব্যানারও লাগানো হবে পাঁচশটি, ইতিমধ্যে সাড়ে তিনশটি লাগানো হয়েছে। এছাড়া দলের ছাত্র-যুব সংগঠন জাতীয় ছাত্রসমাজ ও জাতীয় যুবসংহতির মাধ্যমে প্রতিদিন ট্রাকে করে রাজধানীতে মোট ১৪ লাখ প্রচারপত্র বিলির কাজ চলছে।
জাপার-ই দেয়া তথ্য অনুযায়ী, কয়েক হাজার বাস-ট্রাক ভাড়া করে ঢাকার আশপাশের জেলা-উপজেলাগুলো থেকে লোক নিয়ে আসার প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। বিশেষ করে-নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও ও রূপগঞ্জ, নরসিংদী, মুন্সীগঞ্জ, গাজীপুর, মানিকগঞ্জ, দোহার, কেরানীগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে লোক নিয়ে আসা হবে। এলক্ষ্যে কয়েকদিন আগে দলের মহাসচিবকে নিয়ে নারায়ণগঞ্জে সভা করেছেন দলের স্থানীয় দুই সংসদ সদস্য সেলিম ওসমান ও লিয়াকত হোসেন খোকা। নারায়ণগঞ্জ-৩ (সোনারগাঁও) আসনের এমপি লিয়াকত হোসেন খোকা জানান, নারায়ণগঞ্জ থেকে ১৫ থেকে ২০ হাজার লোক যাবে ঢাকায়। লোকজন আনার লক্ষ্যে গতকাল শনিবার সভা হয়েছে মানিকগঞ্জে।
এই ‘বিশাল কর্মযজ্ঞ’, প্রচার-প্রচারণা, সমাবেশস্থলে তিনটি বিরাট মঞ্চ তৈরি ও লোকজন নিয়ে আসাসহ বিপুল অংকের অর্থ সংস্থানের উত্স সম্পর্কে জিয়াউদ্দিন বাবলু বলেন ‘আমরা সারা ঢাকা সাজিয়েছি। আমাদের দলের নেতা-এমপিরা টাকা দিচ্ছেন। দলের বিভিন্ন ইউনিট থেকে টাকা আসছে। পানি সম্পদমন্ত্রী ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ এবং সংসদ সদস্য একেএম মাইদুল ইসলাম ও সালমা ইসলামসহ দলের মধ্যে যারা শিল্পপতি রয়েছেন, তাদের কাছ থেকে ভালো অনুদান পাচ্ছি। এছাড়াও দেশের বিত্তবানদের অনেকেই স্বেচ্ছায় আর্থিক অনুদান দিচ্ছেন, আমরা সেটি নিচ্ছি। তবে কাউকে জোর করছি না।’ তিনি আরও বলেন ‘পাঁচ-ছয় কোটি টাকা খরচ করে মহাসমাবেশ করা জাপার জন্য কোনো বিষয়ই নয়। সমাবেশের জন্য আমাদের বাজেটও নির্দিষ্ট করা নেই। যখন যেখানে যা লাগছে, আমরা তা খরচ করছি। এই সমাবেশের মাধ্যমে ঢাকায় আমরা নিজেদের সাংগঠনিক শক্তি পরিমাপ করার চেষ্টা করছি। কারণ, ঢাকা যার দখলে থাকে, রাজনীতিও তারই হয়। ১৯৯০ সালে ঢাকা আমাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল না বলেই ক্ষমতা ছেড়ে দিতে হয়েছে।’
জানা গেছে, ১০ লাখ পোস্টারের বাইরে ঢাকা মহানগর (দক্ষিণ) জাপার উদ্যোগে ৪৭ হাজার রঙিন পোস্টার, ২৫০টি ফেস্টুন ও ১০টি বিলবোর্ড লাগানো হয়েছে। প্রায় সমপরিমাণ পোস্টার-ব্যানার-ফেস্টুন লাগিয়েছেন ঢাকা মহানগরের (উত্তর) আহ্বায়ক এসএম ফয়সল চিশতিও। ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য কাজী ফিরোজ রশীদও বিলবোর্ড লাগিয়েছেন। এর বাইরে দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য হাজী সাইফুদ্দিন আহমেদ মিলন অনেক আগে থেকেই সারা ঢাকায় মহাসমাবেশের বিরাট আকৃতির ও নানা ঢঙের প্রচুর রঙ্গিন পোস্টার লাগিয়েছেন। সবমিলিয়ে রাজধানীতে পাঁচশ’ বিলবোর্ড লাগানোর কাজ চলছে। অভিযোগ উঠেছে, এগুলোর অনেকগুলোরই বিল দেয়া হচ্ছে না। বেদখল করে অন্যের বিলবোর্ড নিজেদের প্রচারপত্রে ঢেকে দেয়া হচ্ছে।
অবশ্য এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ঢাকা মহানগর (দক্ষিণ) জাপার আহ্বায়ক সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা এমপি। তিনি গতকাল ইত্তেফাককে বলেন ‘আমি সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত খরচে পোস্টার-ফেস্টুন-ব্যানার-বিলবোর্ড লাগিয়েছি। দখল করার কথা একদম মিথ্যা। এ ব্যাপারে আমাদের স্যারেরও (এরশাদ) নির্দেশ রয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘সরকার আমাদেরকে মহাসমাবেশের খরচ দিচ্ছে-এটা একদম চাপাবাজি। আমার জানামতে সরকার একটি টাকাও দেয়নি। তাছাড়া আমরা (জাপা) এত পড়ে যাইনি যে সরকার থেকে টাকা নিয়ে প্রোগ্রাম করতে হবে। তবে সম্পূর্ণ খরচের টাকা কোত্থেকে, কীভাবে আসছে সেটি আমার স্যার আর আল্লাহ্ জানেন।’
জানা গেছে, মহাসমাবেশের জন্য জাপা চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদ দলীয় নেতা ও সংসদ সদস্যদের চাঁদার হার নির্ধারণ করে দিয়েছেন। দলের ৪০ জন সংসদ সদস্যের প্রত্যেককে এক মাসের বেতনের সমান অর্থাত্ ১ লাখ ৫ হাজার টাকা করে দিতে বলা হয়েছে। এছাড়া প্রেসিডিয়ামের সদস্যরা ১ লাখ, উপদেষ্টারা ২৫ হাজার, ভাইস চেয়ারম্যান ২০ হাজার ও সম্পাদকরা ১০ হাজার টাকা করে দিচ্ছেন। সূত্র মতে, মহাসমাবেশের জন্য অনুদান চেয়ে এরশাদ দেশের অনেক শিল্পপতি, ব্যবসায়ীসহ বিত্তশালীদের ফোন করেছেন।
আবু হোসেন বাবলা বলেন ‘আমার ধারণা এই মহাসমাবেশের বাজেট তিন থেকে সাড়ে তিন কোটি টাকা হতে পারে। আমি যতটুকু জানি কিছু ব্যবসায়ী ২/১ লাখ টাকা করে দিয়েছেন। তবে এটা দলের চেয়ারম্যান ও মহাসচিব ভালো জানেন।’ তিনি বলেন ‘১৯৯০ সালে ক্ষমতা ছাড়ার পর এটিই হবে জাপার সবচেয়ে বড় জমায়েত। এই সমাবেশ থেকে এমন কর্মসূচি দেয়া হবে, যার মাধ্যমে সামগ্রিক রাজনীতি, বিশেষ করে ঢাকার মাঠ আমাদের নিয়ন্ত্রণে আসবে।’
জাপা মহাসচিব জানান, এই সমাবেশ থেকে রোডশোসহ এরশাদ ২০১৫ সালের সাংগঠনিক কর্মসূচি ঘোষণা করবেন।
