সন্ত্রাস বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে : প্রধানমন্ত্রী

আপডেট : ৩১ ডিসেম্বর ২০১৪, ০০:৪০

প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা নোয়াখালীতে নারী স্কুল শিক্ষক হত্যাকাণ্ড এবং ঢাকায় অপর এক নারী শিক্ষক অগ্নিদগ্ধ হবার ঘটনায় বিএনপি-জামায়াত সন্ত্রাসীদের দায়ী করে বলেছেন, যারা এ ধরনের জঘন্য অপরাধ করেছে, তাদেরকে অবশ্যই খুঁজে বের করা হবে এবং বিচারের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া হবে। প্রয়োজনে এ ধরনের হত্যাকাণ্ড বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেয়া হবে। কোন ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড সরকার সহ্য করবে না। মানুষ হত্যা ও ষড়যন্ত্রের রাজনীতি থেকে বিরত থাকার জন্য তিনি বিএনপি-জামায়াতের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানান।

গতকাল মঙ্গলবার গণভবনে প্রাথমিক স্কুল সার্টিফিকেট (পিএসসি), জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) এবং সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদ এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী মুস্তাফিজুর রহমান এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে ফলাফল হস্তান্তর করেন। প্রধানমন্ত্রী একই অনুষ্ঠান থেকে ২০১৫ শিক্ষাবর্ষের জন্য সারাদেশে পাঠ্য বই বিতরণ কর্মসূচিরও উদ্বোধন করেন। সকলের জন্য শিক্ষা কর্মসূচি নিশ্চিত করতে সরকারি উদ্যোগের অংশ হিসেবে এই প্রথমবারের মতো মাল্টিমিডিয়া গ্রন্থের বিতরণ ও উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি শেখ হাসিনা সকল শিক্ষার্থীদের জন্য উপযোগী মিডি ভারসনে পূর্ণাঙ্গ অডিও ডিজিটাল মাল্টিমিডিয়া গ্রন্থের একটি পূর্ণাঙ্গ টেক্সট উদ্বোধন করেন।
শিক্ষার্থীদের কথা মাথায় রেখে হরতাল-অবরোধের মতো কর্মসূচি না দিতে বিএনপির প্রতি আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নোয়াখালীতে স্কুল শিক্ষকের মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের জন্য বিএনপি-জামায়াতই দায়ী। বিএনপি-জামায়াতের এ ধরনের অপরাধের নিন্দা জানানোর ভাষা আমার নেই। দেশের জনগণ যে মুহূর্তে শান্তিতে বসবাস করছে, ঠিক সে সময় এ ধরনের ঘটনা ঘটানোর কোন যৌক্তিকতা থাকতে পারে না। তিনি বলেন, সোমবারের বিএনপি-জামায়াতের হরতাল ডাকার কি যৌক্তিকতা থাকতে পারে, আমার জানা নেই। হরতাল আহ্বানকারী বিএনপি-জামায়াতের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, তারা একজন স্কুল শিক্ষককে হত্যা করে এবং অপর একজন স্কুল শিক্ষককে পুড়িয়ে কি পেয়েছে? তাদের অর্জনটা কি? তারা একজন স্কুল শিক্ষকের জীবন কেড়ে নেয়া ছাড়া এবং অপর একজন আগুনে পোড়ানো ছাড়া আর কিছু তো পায়নি। তাহলে কেন এই ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড চালানো হলো? মানুষ মারা এবং পোড়ানোই যদি তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য হয়, তাহলে এটি হবে খুবই দুঃখজনক। মানুষ খুন করে কীভাবে তারা মানুষের সমর্থন পাবে? তবে যে এলাকায় ওই শিক্ষিকাকে হত্যা করা হয়েছে, আমরা সেখানে তদন্ত করব, জড়িতদের খুঁজে বের করব। এ ধরনের খুন বন্ধ করতে যতোটা কঠোর হওয়া প্রয়োজন সরকার তা হবে।
২০১৩ সালে সারা বছর বিএনপি-জামায়াতের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বিবরণ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, চট্টগ্রামে বিএনপি-জামায়াতের সন্ত্রাসীদের বোমা হামলায় একজন স্কুল ছাত্রী তার চোখ হারিয়েছে। বিএনপি-জামায়াত ক্যাডাররা ৫ জানুয়ারির নির্বাচন প্রতিরোধে আন্দোলনের নামে নিরীহ মানুষকে পুড়িয়ে হত্যা করেছে এবং সারাদেশে ৫৮৪টি স্কুল আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে। এমনকি তারা শিক্ষক ও ছাত্রদের উপরও হামলা চালিয়েছে। তিনি বলেন, তারা নির্বাচনের আগে এ ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়েছিল। কিন্তু কি করতে পেরেছে? নির্বাচন হয়েছে। তারা নির্বাচন প্রতিরোধ করতে পারেনি। তাহলে তারা কেন পুনরায় মানুষ হত্যা করছে? প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপি-জামায়াত ভালো কর্মসূচি দিলে এবং জনগণের জন্য ভালো কাজ করলে জনগণকে বলতে পারত এবং জনগণের সমর্থন পেত। কিন্তু তারা জনগণের সমর্থন পাচ্ছে না। জনগণ তাদের ব্যাপারে খুবই সচেতন। ফলে আমি মনে করি, বিএনপি নেতাদের ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকা উচিত এবং জনগণকে শান্তি ও স্বস্তিতে থাকতে দেয়া উচিত।
প্রধানমন্ত্রী শিক্ষাখাতের উন্নয়নে তার সরকারের গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপ তুলে ধরে বলেন, তার সরকার দেশের উন্নয়নে শিক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। দেশকে নিরক্ষরতা ও দারিদ্র্য মুক্ত করতে শিক্ষাখাতে ব্যয়কে বিনিয়োগ হিসেবে মনে করছে। তিনি বলেন, শিক্ষায় ব্যয় হচ্ছে বিনিয়োগ। এই বিনিয়োগ দিয়ে আমরা জাতিকে নিরক্ষর ও দারিদ্র্যমুক্ত করব। তিনি বলেন, শিক্ষা ছাড়া কোন জাতি দারিদ্র্যমুক্ত হতে পারে না। শেখ হাসিনা বলেন, শিক্ষাখাতের অধিকাংশ সমস্যার সমাধান করা হয়েছে। এ সত্ত্বেও দেশের বিভিন্ন এলাকায় কিছু স্কুল রয়েছে, যেগুলো পুনরায় নির্মাণ করা হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, তার সরকার ক্ষমতায় আসার পর পাবলিক পরীক্ষা সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আস্থা সৃষ্টি করার লক্ষ্যে দেশে পিএসসি ও জেএসসি পরীক্ষা চালু করেছে। এর আগে শিক্ষার্থীরা শুধু প্রথম পাবলিক পরীক্ষা হিসেবে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে। এতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ-উত্কণ্ঠা সৃষ্টি হতো। পিএসসি ও জেএসসি পরীক্ষা চালু করার পর সকল শিক্ষার্থী তাদের শিক্ষকদের কাছ থেকে যথাযথ শিক্ষা পাচ্ছে এবং সকল শিক্ষার্থী বৃত্তি পরীক্ষা দিচ্ছে। এর আগে একটি স্কুলের কিছুসংখ্যক শিক্ষার্থী ৫ম শ্রেণী ও ৮ম শ্রেণীর বৃত্তি পরীক্ষার জন্য মনোনীত হতো। ফলে শিক্ষকরাও শুধু ওই সকল শিক্ষার্থীর জন্য বিশেষ নজর দিতেন।
দেশে নারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধিতে সন্তোষ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মেয়েরা এখন ছেলেদের চেয়ে ভালো করছে। প্রধানমন্ত্রী বিপুলসংখ্যক বই প্রকাশ ও বিতরণ করা একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করে যথা সময়ে এ সকল বই প্রকাশ করায় সংশ্লিষ্টদের ধন্যবাদ জানান। দুই পরীক্ষার ফলাফল সময়মতো প্রকাশ করায় মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের ধন্যবাদ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ছোটবেলাতেই সার্টিফিকেট পেলে তা শিশুদের আত্মবিশ্বাস যোগাবে।
গতকাল সকালে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন গণভবনে আনন্দঘন পরিবেশ সৃষ্টি হয়। সেখানে স্কুল মাদ্রাসার প্রাথমিক-ইবতেদায়ী আর মাধ্যমিক পর্যায়ের প্রতি শ্রেণীর একজন করে প্রতিনিধি শিশু-কিশোরের উপস্থিতি ছিল। শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদই সকল শ্রেণীর বই থেকে তৈরি একটি সেট প্রধানমন্ত্রীকে উপহার হিসেবে তুলে দেন। বই হাতে নিয়ে বিস্মিত প্রধানমন্ত্রী বললেন, ‘এগুলো আমার বই! তাহলে তো এবার আমি স্কুলে যাওয়া শুরু করতে পারি!’ এভাবেই প্রধানমন্ত্রী যেন ফিরে গেলেন তার ছেলেবেলায়।

অনুষ্ঠানে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কনিষ্ঠ কন্যা শেখ রেহানা উপস্থিত ছিলেন। শিক্ষা সচিব নজরুল ইসলাম খান এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা সচিব কাজী আখতার হোসেন অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন। অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব আবদুস সোবহান সিকদার, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সিনিয়র সচিব আবুল কালাম আজাদ এবং প্রেস সচিব এ কে এম শামীম চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন।