আজহারের ফাঁসি

আপডেট : ৩১ ডিসেম্বর ২০১৪, ০০:৪৫

মুক্তিযুদ্ধকালে গণহত্যা, হত্যা, লুণ্ঠন, আটক, অপহরণ, নির্যাতন ও অগ্নিসংযোগের দায়ে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এটিএম আজহারুল ইসলামকে ফাঁসির আদেশ দিয়েছে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল। তার বিরুদ্ধে আনা ছয়টি অভিযোগের মধ্যে ট্রাইব্যুনালের মতে তিনটি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। এছাড়া মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ধর্ষণ ও দুই জনকে নির্যাতনের দুই অপরাধে আরো ৩০ বছর সশ্রম কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। রায়ে বলা হয়েছে, একটি প্রমাণিত না হওয়ায় তাকে ওই অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেয়া হলো। এটিএম আজহারকে তিনটি অভিযোগে পৃথকভাবে দেয়া মৃত্যুদণ্ডের একটি কার্যকর হলে স্বাভাবিকভাবে সকল শাস্তি একীভূত হয়ে যাবে। গতকাল মঙ্গলবার বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিমের নেতৃত্বাধীন যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ রায় দেন। এই ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন- বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন ও বিচারপতি আনোয়ারুল হক।

তবে এ রায়কে ফরমায়েশি বলে দাবি করেছেন খোদ এটিএম আজহার। বিচারকেরা মৃত্যুদণ্ডের আদেশ পড়ার সময় কাঠগড়ায় থাকা আজহার দাঁড়িয়ে বলেন, ফরমায়েশি রায়, ফরমায়েশি রায়। আমি সম্পূর্ণ নির্দোষ, আপনাদের বিচার আল্লাহর আদালতে হবে। রায় পড়া শেষে তিনি বলেন, আল্লাহ আকবার, আল্লাহ আকবার, আল্লাহ বিচার করবে আপনাদের। পরে তাকে কাঠগড়া থেকে নামিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়।
গত ১৮ সেপ্টেম্বর উভয়পক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে আজহারের বিরুদ্ধে মামলার রায় ঘোষণা অপেক্ষমাণ (সিএভি) রাখা হয়। যুদ্ধাপরাধের বিচারে গঠিত দুই ট্রাইব্যুনালের এটি ছিলো পঞ্চদশ রায়। এর মধ্যে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল থেকে সাতটি ও ট্রাইব্যুনাল-২ থেকে আটটি মামলার রায় ঘোষণা করা হয়েছে। এছাড়া এখনো দুইটি মামলার রায় ঘোষণা অপেক্ষমাণ রয়েছে।
মানবতাবিরোধী অপরাধে এটিএম আজহারকে মৃত্যুদণ্ড দেয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপক্ষ ও সরকার। রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে প্রসিকিউটর জেয়াদ আল মালুম বলেন, একাত্তরে রংপুরের ত্রাস আজহারের এই রায়ে দেশের মানুষ ও ভুক্তভোগী পরিবারের প্রত্যাশা পূরণ হয়েছে। রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। সন্তোষ প্রকাশ করে দেশের বিভিন্ন জায়গায় আনন্দ মিছিলের ঘটনাও ঘটেছে। শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চের কর্মীরাও আনন্দ মিছিল করেছে।
এদিকে আজহারের আইনজীবী অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, আসামি সুবিচার পাননি। এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হবে। আশা করি, উচ্চ আদালতে আমরা ন্যায় বিচার পাবো। তিনি আরো বলেন, এটিএম আজহারের সাথে কথা হয়েছে, তিনি মৃত্যুদণ্ডে ভীত নন। রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে এটিএম আজহারের দল জামায়াতে ইসলামী সারাদেশে আজ বুধবার ও আগামীকাল বৃহস্পতিবার সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ডেকেছে।
গতকাল এটিএম আজহারের বিরুদ্ধে মামলার রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে ট্রাইব্যুনালসহ সুপ্রিম কোর্টের আশেপাশের এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিপুলসংখ্যক সদস্য মোতায়েনের পাশাপাশি দোয়েল চত্বর থেকে ট্রাইব্যুনালের দিকের সড়কে যান চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়। বাইরে প্রস্তুত রাখা হয় পুলিশের সাঁজোয়া যান। রায়ের জন্য গতকাল ট্রাইব্যুনালে বিপুল সংখ্যক পর্যবেক্ষক এবং এর বাইরে বিক্ষুব্ধ সংগঠনের মিছিল চোখে পড়ে।
গতকাল সকাল ১০টা ৫৮ মিনিটে কাঠগড়ায় আনা হয় আজহারকে। এর পর বেলা ১১টা ১৮ মিনিট থেকে রায় ঘোষণা শুরু করেন ট্রাইব্যুনাল। ১৫৮ পৃষ্ঠার সংক্ষিপ্ত রায় ঘোষণা শেষ হয় ১২টা ৪৫ মিনিটে। তিন বিচারপতিই রায়ের সংক্ষিপ্ত অংশ পড়ে শোনান। সবশেষে সাজার আদেশ ঘোষণা করেন বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম। রায় ঘোষণার আগে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম দুই পক্ষের আইনজীবী ও উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মীদের উদ্দেশে বলেন, বিভিন্ন দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমে যুদ্ধাপরাধ মামলার রায়ের খবর ভুলভাবে আসছে। অনেক সময় বলা হচ্ছে, ধর্মীয় নেতাদের সাজা দেয়া হচ্ছে। এ কথা সত্য নয়। ১৯৭১ সালে যারা মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে তাদেরই বিচার করা হচ্ছে। আর বিবৃতি দিয়ে কিংবা সহিংসতা করে রায় পরিবর্তন করা যায় না।
রায়ে বলা হয়, মুক্তিযুদ্ধকালে আজহারুল ছিলেন আলবদর বাহিনীর রংপুর অঞ্চলের কমান্ডার। তার নেতৃত্বে বৃহত্তর রংপুর এলাকায় আলবদর বাহিনী যুদ্ধাপরাধ সংঘটিত করে। এছাড়া সৈয়দ মো. কায়সারের পর আজহারের রায়ের পর্যবেক্ষণেও নারী মুক্তিযোদ্ধাদের পুনর্বাসন করতে রাষ্ট্রকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। একইসঙ্গে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে মুক্তিযুদ্ধে আত্মত্যাগকারী মুক্তিযোদ্ধাদের ভূমিকা, অবদান ও পাকিস্তানি সেনা, রাজাকার, আল বদরের নৃশংসতার কথা পাঠ্যপুস্তকে তুলে ধরতে বলা হয়েছে। 
তিন অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড
এটিএম আজহারের বিরুদ্ধে মোট ছয়টি অভিযোগ এনেছিলো রাষ্ট্রপক্ষ। এর মধ্যে ২, ৩ ও ৪ নম্বর অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় ট্রাইব্যুনাল সর্বসম্মতিতে তাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছে।
আজহারের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় অভিযোগ ছিলো, একাত্তরের ১৬ এপ্রিল তার নিজ এলাকা রংপুরের বদরগঞ্জ থানার ধাপপাড়ায় ১৫ জন নিরীহ-নিরস্ত্র বাঙালিকে গুলি করে হত্যা, লুণ্ঠন ও অগ্নিসংযোগ। এ ঘটনায় পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে আজহার অংশ নেন। এ অভিযোগে দোষী সাব্যস্তকরণ ও সাজার বিষয়ে বলা হয়, মৌখিক সাক্ষ্য ও ডকুমেন্ট বিশ্লেষণে দেখা যায়, আসামি এটিএম আজহার জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্র সংঘের সদস্য এবং পাকিস্তানি সেনাদের নিয়ে ভোদরগঞ্জ থানাধীন মোকসেদপুর গ্রামের ধাপপাড়ায় যান। এ সময় তারা রাস্তার আশেপাশের বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ করে এবং নিরস্ত্র কয়েকজনকে গুলি করে হত্যা করে। নিরস্ত্র বেসামরিক মানুষ হত্যায় আসামি সহায়তা ও সহজ করেন।
তৃতীয় অভিযোগ হলো, একাত্তরের ১৭ এপ্রিল রংপুরের বদরগঞ্জের ঝাড়ুয়ারবিল এলাকায় এক হাজার ২শ’রও বেশি নিরীহ লোক ধরে নিয়ে গণহত্যা, লুণ্ঠন ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। যাদের মধ্যে ৩৬৫ জনের পরিচয় পাওয়া গেছে। এ অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত ও সাজাপ্রদানের যুক্তিতে বলা হয়, সাক্ষ্য-প্রমাণে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে এটিএম আজহার ও তার সহযোগীরা এবং পাকিস্তানি সেনারা বদরগঞ্জের ঝাড়ুয়ারবিল গ্রামে অগ্নিসংযোগ করে এবং অসংখ্য নিরস্ত্র মানুষকে হত্যা করে। এটা যে বড় হত্যাযজ্ঞ তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এই অপরাধ সংগঠনে আসামির সরাসরি সম্পৃক্ততা ছিলো। যা মানবতাবিরোধী অপরাধ।
চতুর্থ অভিযোগ হলো, একাত্তরের ৩০ এপ্রিল রংপুর কারমাইকেল কলেজের শিক্ষক কালাচান রায়, সুনীল বরণ চক্রবর্তী, রামকৃষ্ণ অধিকারী, চিত্তরঞ্জন রায় ও কালাচান রায়ের স্ত্রী মঞ্জুশ্রী রায়কে বাসা থেকে অপহরণের পর দমদমা সেতুর কাছে নিয়ে হত্যা করা হয়। এ অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত ও সাজা প্রদানের বিষয়ে বলা হয়, এটা গণহত্যা সম্পর্কিত অভিযোগ। আসামি আজহার ও তার সহযোগীরা এবং পাকিস্তানি সেনারা কারমাইকেল কলেজের চার শিক্ষক এবং এক শিক্ষকের স্ত্রীকে অপহরণ করে দমদমা সেতুর কাছে হত্যা করে। এ হত্যাকাণ্ড ছিলো হিন্দু সম্প্রদায়কে ধংসের পরিকল্পনার একটি অংশ। সাক্ষ্য প্রমাণে দেখা যায়, এই ঘটনার সময় এটিএম আজহার প্রকৃতপক্ষে উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া হত্যাকাণ্ডে আজহারের সরাসরি সহায়তা, উত্সাহ ও নৈতিক সমর্থন ছিলো। এই তিন অপরাধে আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন, ১৯৭৩ এর আওতায় তাকে দোষী সাব্যস্ত করে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দেয়া হচ্ছে।
দুই অভিযোগে ৩০ বছর সশ্রম কারাদণ্ড
এটিএম আজহারকে ৫ ও ৬ নম্বর অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে ৩০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৫ নম্বর অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাকে ২৫ বছর ও ৬ নম্বর অভিযোগ আংশিক প্রমাণিত হওয়ায় তাকে ৫ বছর সশ্রম কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে।
আজহারের বিরুদ্ধে পঞ্চম অভিযোগ হলো, একাত্তরের ২৫ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বরের মধ্যে রংপুর শহর ও বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মহিলাদের ধরে এনে টাউন হলে আটকে রেখে ধর্ষণসহ শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়। এসব ঘটনার সঙ্গে আজহার জড়িত ছিলেন। আর ষষ্ঠ অভিযোগ হলো, একাত্তরের নভেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে রংপুর শহরের গুপ্তপাড়ায় একজনকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয়। একই বছরের ১ ডিসেম্বর রংপুর শহরের বেতপট্টি থেকে আজহারের নেতৃত্বে একজনকে অপহরণ করে রংপুর কলেজের মুসলিম ছাত্রাবাসে নিয়ে আটক রেখে শারীরিক নির্যাতন ও গুরুতর জখম করা হয়। তবে আজহারের বিরুদ্ধে আনা একাত্তরের ২৪ মার্চ থেকে ৩ এপ্রিলের মধ্যে ১১ জনকে অপহরণ, আটক ও নির্যাতনের পর হত্যার এক নম্বর অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তাকে এই অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে।
বীরাঙ্গনাদের অবদান পাঠ্যপুস্তকে তুলে ধরতে হবে
এটিএম আজহারের বিরুদ্ধে মামলায় রাষ্ট্রপক্ষ সর্বোচ্চ শস্তির পাশাপাশি নির্যাতনের শিকার এক বীরাঙ্গনার জন্য ক্ষতিপূরণের দাবি জানায়। এ বিষয়ে রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, রাষ্ট্রপক্ষের প্রথম সাক্ষীসহ মুক্তিযুদ্ধে নিপীড়নের শিকার সকল বীরাঙ্গনার জন্য যথাযথ ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা অনতিবিলম্বে রাষ্ট্রে করা উচিত। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাদের বীরাঙ্গনা (ওয়ার হিরোইনস) হিসাবে ঘোষণা করে সম্মানিত করেছিলেন। তাদের গ্রহণ, স্বীকৃতি ও সম্মান দিতে জাতি নৈতিকভাবে বাধ্য। তারা মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদদের মতোই জাতির গর্ব।
আল বদর কমান্ডার এটিএম আজহার

রায়ে আজহারের বিষয়ে বলা হয়, ১৯৫২ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি রংপুর জেলার বদরগঞ্জ উপজেলার বাতাসন লোহানীপাড়া গ্রামে তার জন্ম। বাবার নাম নাজির হোসাইন, মা রামিসা বেগম। ১৯৬৮ সালে রংপুর জেলা স্কুল থেকে মেট্রিক পাস করে পরের বছর তিনি ভর্তি হন রংপুর কারমাইকেল কলেজে। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধকালে তিনি জামায়াতের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র সংঘের জেলা কমিটির সভাপতি এবং আলবদর বাহিনীর রংপুর শাখার কমান্ডার ছিলেন। ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের আগে আজহার দেশত্যাগ করেন। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হওয়ার পর আজহার আবার দেশে ফেরেন এবং ১৯৮০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স করেন।