আপনার মা-বোনের ওপর হামলা হলে কেমন লাগত

আপডেট : ৩১ ডিসেম্বর ২০১৪, ০১:১৭

পিকেটারদের পেট্রোলের আগুনে দগ্ধ হয়ে শামসুন্নাহার বেগম (৫৫) ও পুত্র জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র তানজীমুল হক অয়ন (২২) ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসাপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিত্সাধীন। হাসপাতালের বেডে চরম যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন তারা। অয়নের ছোট বোনটির শরীরও সামান্য পুড়েছে। তবে তাকে চিকিত্সা দিয়ে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। ইত্তেফাকের এ প্রতিনিধি গতকাল মঙ্গলবার গিয়েছিলেন ঢাকা মেডিক্যালের বার্ন ইউনিটে। সেখানে গিয়ে কথা হয় অয়ন ও তার মায়ের সঙ্গে। অয়নের মা শামসুন্নার হাতিয়া ইউনিয়ন মডেল স্কুলে শিক্ষকতা করেন।

প্রসঙ্গত: গত সোমবার সকালে হরতাল চলাকালে নোয়াখালীতে পিকেটারদের ইটের আঘাতে নিহত হন আরেক স্কুল শিক্ষিকা। তার নামও শামসুন্নাহার। 
অয়ন ও তার মা বলেন, ‘আমরা তো কোন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী নই, কারো প্রতিপক্ষও না। তারপরও কেন আমাদেরকে পেট্রোল দিয়ে পুড়িয়ে মারার চেষ্টা করা হলো।’ সাধারণ মানুষকে হত্যা করে যারা রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে চান কিংবা ক্ষমতায় যাওয়ার সিঁড়ি বানাচ্ছেন তাদের উদ্দেশ্যে তারা বলেন, যারা এসব ঘটনা ঘটাচ্ছেন তাদেরও তো স্ত্রী, সন্তান, পিতা-মাতা ও ভাইবোন রয়েছে। আপনাদের মা-বোন কিংবা কোন আত্নীয়ের ওপর হামলা হলে  কেমন লাগত? বুঝতেন, কী কষ্ট।
অয়ন ও তার মা প্রশ্ন রেখে বলেন, যারা যখন নাশকতা করেন, নিরীহ মানুষদের হত্যার উদ্দেশে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেন, তাদের কী নিজের মা, ভাই-বোন কিংবা কোন আত্নীয়ের কথা মনে পড়ে না। তাদের বেলাতেও তো এমন ঘটনা ঘটতে পারে।
মা ও পুত্র বলেন, আমাদেরকে যারা পেট্রোল দিয়ে মারতে চেয়েছিল আল্লাহ যেন তাদের  মা-বোনের কথা স্বরণ করিয়ে দেন। এমন নিষ্ঠুর, নির্মম ও বর্বরোচিত কাজ থেকে যেন তারা বিরত থাকে।
এসময় অয়নের বাবা ব্যবসায়ী জাবেরউদ্দিন বলেন, আমি এ নিষ্ঠুর ঘটনার বিচার চাই না। আমি আল্লাহর কাছে বিচার দিয়েছি। রাজনৈতিক নেতা-কর্মীরা যেন স্মরণ রাখেন, রাস্তায় যারা যাতায়াত করে তারাও তাদের পিতা-মাতা, ভাই-বোন ও সন্তানের মত। তাদেরকে যেন রাজনীতির বলি করা না হয়। নেতা-কর্মীদের যেন শুভবুদ্ধির উদয় হয় এ কামনা করেন তিনি।
গতকাল স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বার্ন ইউনিটে চিকিত্সাধীন শামসুন্নাহার বেগম ও অয়নকে দেখতে যান। মা ও পুত্র স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কাছে একই প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। নোয়খালীর হাতিয়া পৌরসভার বাসিন্দা জাবেরউদ্দিনের দুই ছেলে ও এক মেয়ে।  কন্যা সালমা আনিকা হাতিয়া আদর্শ মহিলা কলেজের ছাত্রী। পঞ্চম শ্রেণী থেকে আনিকার মাথাব্যাথার সমস্যা দেখা দেয়। এর আগে দুই দফা চিকিত্সার জন্য আনিকাকে নিয়ে ঢাকায় আনা হয়েছিল।
গত রবিবার শামসুন্নাহার আনিকাকে ডাক্তার দেখানোর জন্য ঢাকায় নিয়ে আসেন। ওইদিন বিকালে শান্তিনগরে চিকিত্সকের চেম্বারে গিয়ে দেখেন চিকিত্সক নেই। জানতে পারেন চিকিত্সক ওইদিন রোগী দেখবেন না। সেখান থেকে শামসুন্নাহার পুত্র অয়ন ও কন্যা আনিকাকে নিয়ে সিএনজি অটোরিকশাযোগে মিরপুর-৭ এ ভাই সারোয়ার হোসেনের বাসার উদ্দেশ্যে রওনা দেন। মিরপুর কাজীপাড়া বাসস্ট্যান্ডের কাছে গেলে কয়েকজন তরুণ পেট্রোল ঢেলে তাদের সিএনজি অটোরিকশাতে আগুন ধরিয়ে দেয়। চালক অটোরিকশার দরজা খুলে দিলে তারা বের হন। ততক্ষণেই অয়ন ও তার মা’র মুখমন্ডল, হাতসহ দেহের বিভিন্ন অংশ ঝলসে যায়। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাদের শ্বাসনালীও ।
বার্ন ইউনিটের আবাসিক সার্জন ডা. পার্থ শংকর পাল বলেন, শামসুন্নাহারের চেয়ে অয়নের অবস্থা আশঙ্কাজনক। অয়নের শ্বাসনালী বেশি পুড়ে গেছে। মা ও পুত্রকে এক কেবিনে রেখে চিকিত্সা দেয়া হচ্ছে বলে তিনি জানান।

উল্লেখ্য, গত ৫ জানুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ও পরে যানবাহনে পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ, পেট্রোল কিংবা গানপাউডার দিয়ে আগুন লাগিয়ে ২৯ জন যাত্রীকে পুড়িয়ে মারা হয়। দগ্ধ হয়েছে দুই শতাধিক। চরম দুর্বিসহ জীবন-যাপন করছেন তারা।