ব্রিজের টোলে ‘কালো হাত’!

আপডেট : ৩১ ডিসেম্বর ২০১৪, ১৮:৪৫
 
 
মেঘনা ও মেঘনা-গোমতী ব্রিজের টোল আদায় এবং মেরামত ও ব্যবস্থাপনায় ধারাবাহিকভাবে অনিয়মের ঘটনা ঘটছে। সরকার যায়, সরকার আসে কিন্তু টোলের ওপর থেকে ‘কালো হাতের’ ছায়া সরে না। টোলের টাকা নয় ছয় করার লক্ষ্যে সেখানে বসানো হয় ‘ব্যক্তিগত কাছের লোক’। এই ‘কাছের লোকদের’ টোল আদায় এবং মেরামত ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পাইয়ে দিতে দরপত্রেই ঘটানো হয় ইঞ্জিনিয়ারিং। এবারও সেই ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কবলে পড়েছে নতুন অপারেটর নিয়োগ প্রক্রিয়া। বিষয়টি গড়িয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কান পর্যন্ত। এতে একটু হোঁচট খাওয়ায় ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কারিগররা নিয়েছেন নতুন কৌশল। কৌশলের মারপ্যাঁচের কারণে এ দুটি ব্রিজে আজ পহেলা জানুয়ারি থেকে নতুন অপারেটর দায়িত্ব পালনের কথা থাকলেও সেটি হচ্ছে না।
প্রাপ্ত তথ্য-প্রমাণ ও অভিযোগ খতিয়ে দেখা যায়, আগামী তিন বছরের জন্য ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মেঘনা ব্রিজের ২৫ কিলোমিটার এবং মেঘনা-গোমতী ব্রিজের আগে-পিছে যথাক্রমে ৪২ ও ৪৩ কিলোমিটার এলাকা রক্ষণাবেক্ষণের পাশাপাশি ব্রিজ দুটির কম্পিউটারাইজড টোল সংগ্রহের জন্য অপারেটর নিয়োগে দরপত্র দাখিলের শেষ দিন ছিল গত ২৪ নভেম্বর। এতে আটটি প্রতিষ্ঠান প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। সর্বনিম্ন দরদাতা প্রতিষ্ঠান ছিল ‘মেক্স-ইনফ্রাটেক জেভি’। এর মধ্যে ‘মেক্স’ মালয়েশিয়ান এবং ‘ইনফ্রাটেক জেভি’ স্থানীয় কোম্পানি। যৌথ বিনিয়োগে দুটি কোম্পানি দরপত্রে অংশ নেয়। তবে মূল্যায়নে দেখা যায়, দরপত্রের ন্যূনতম শর্ত পূরণেও সক্ষম নয় প্রতিষ্ঠানটি। অন্য দরদাতারা ক্রম অনুযায়ী তাদের মধ্য থেকে কাউকে কার্যাদেশ দেয়ার আবেদন জানালেও এতে গড়িমসি করে সড়ক যোগাযোগ ও সেতু মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের বাতলানো পথে হাঁটছে সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগও।
অভিযোগ উঠেছে, ‘মেক্স-ইনফ্রাটেক জেভি’র মূল ব্যক্তি মন্ত্রণালয়ের একজন শীর্ষ কর্তার নিকটাত্মীয়। সে জন্য তাকে কাজ পাইয়ে দিতে যত ইঞ্জিনিয়ারিং। ব্রিজ দুটির বর্তমান অপারেটর ‘এশিয়ান ট্রাফিক টেকনোলজিস লিমিটেড’ও মন্ত্রণালয়ের প্রভাবশালী ব্যক্তির ‘কাছের মানুষ’। এবার সর্বনিম্ন দরদাতা যখন যোগ্যতার বিচারে বাদ পড়ার উপক্রম-তখন দরদাতা আটটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অন্য দুটি প্রতিষ্ঠানকে অলিখিতভাবে এক করে কৌশলে তাদের কাজ দেয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়। মূলত প্রথম হওয়া এবং এই দুটি প্রতিষ্ঠানের কর্তা-ব্যক্তিরা ঘুরেফিরে একই লোক। ভিন্ন ভিন্ন নামে তারা দপরত্র দাখিল করে। উদ্দেশ্য, যে কেউ কাজ পেলেই সবার পাওয়া। তবে এতে বাঁধ সাধে দরদাতা অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো।
বাধাপ্রাপ্ত হয়েতুন কৌশল হিসেবে আবার দরপত্র আহ্বানের প্রক্রিয়া শুরুর চেষ্টা চলছে। সেটিরও উদ্দেশ কোনো না কোনোভাবে এবং প্রয়োজনে নতুন প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি করে সেটিকে কাজ দেয়া। পাশাপাশি বর্তমানের অপারেটর ‘কাছের লোকের’ মেয়াদ বৃদ্ধি। এতে আপত্তি তুলেছে অন্য নিম্ন দরদাতারা। নানা মাধ্যমে এর বিচার গেছে প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত। এ দিকে, বর্তমান অপারেটরের মেয়াদ শেষ হয়েছে বুধবার। অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ার কারণে একদিকে যেমন বর্তমান অপারেটরই আপাতত বহাল থাকছে, তেমনি নতুন অপারেটর নিয়োগও আটকে গেছে কৌশলের ঘেরাটোপে।
এ ব্যাপারে সওজের প্রধান প্রকৌশলী ফিরোজ ইকবাল ইত্তেফাককে বলেন, ‘সর্বনিম্ন দরদাতা অযোগ্য হওয়ায় আমরা নতুন করে দরপত্র আহ্বানের কথা ভাবছি।’ এখানে তো আটজন প্রতিযোগী আছে, ক্রমানুসারে তাদের মধ্য থেকে কেন অপারেটর নিয়োগ দেয়া যাচ্ছে না—প্রশ্ন করলে তিনি বলেন ‘বিষয়টি সরাসরি মন্ত্রণালয় দেখভালো করছে।’
অনুসন্ধানে জানা যায়, মূলত টোলের টাকার ওপরই লোলুপ দৃষ্টি। এই দুটি ব্রিজ থেকে প্রতিদিন যে টোল আদায় হয়, নির্দিষ্ট হারে সেটির একাংশ ‘এই হাত-ওই হাত’ ঘুরে চলে যায় বিভিন্ন পকেটে। টোল আদায়ের ক্ষেত্রেও রয়েছে নানা অনিয়ম। পাঁচ টনের গাড়িকে এক টনের ওজনের দেখানোসহ নানা কৌশলে ব্রিজের টাকা নয়-ছয় হয়ে যায়। শুধু এই দুটি ব্রিজেই নয়, অন্যান্য ব্রিজেও কম-বেশি এ সব অনিয়ম বিদ্যমান। শুধু বর্তমান আমলেই নয়, অতীতেও বিভিন্ন সরকারের সময় এই অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে।
টোলের টাকা কী ভাবে লোপাট হয়—একটি তথ্য থেকেই তা অনুমেয়। মেঘনা ও মেঘনা-গোমতী ব্রিজের টোল আদায়সহ যাবতীয় রক্ষণাবেক্ষণে তিন বছরের জন্য অপারেটরকে সরকার ১৩ কোটি ৭০ লাখ ৪১ হাজার ৮৬৪ টাকা দেবে বলে এবারের দপরত্রে উল্লেখ করেছে। সেখানে সর্বনিম্ন দরদাতার উল্লেখকৃত দর ছিল মাত্র ২ কোটি ৯ লাখ ৪৭ হাজার ৭ টাকা। যা সরকারি দর থেকে ৮৫ শতাংশই কম। অভিজ্ঞরা জানান, দুটি ব্রিজ অপারেট করতে কমপক্ষে ৯০ জন আনসার ও ৩৬ জন টোল সংগ্রহকারী লাড়ে। তাদের বেতন-ভাতা এবং অফিস ও ব্যবস্থাপনা খরচ বাবদ তিন বছরে কম করে হলেও ৮ থেকে ১০ কোটি টাকা দরকার হয়। সেখানে একটি প্রতিষ্ঠান মাত্র ২ কোটি ৭০ লাখ টাকা চেয়ে কী ভাবে এই খরচের জোগান দেবে? এই একটি হিসাবেই টোলের টাকা নয়ছয় হওয়ার প্রমাণ মেলে।
তথ্য-প্রমাণে দেখা যায়, দরপত্রে ব্রিজ অপারেটর প্রতিষ্ঠানের অপারেশন ডিরেক্টরের যোগ্যতা সিভিল ইঞ্জিনিয়ার ও এমবিএ এবং সংশ্লিষ্ট কাজে ১৫ বছরের বাস্তব অভিজ্ঞতা থাকার শর্ত থাকলেও সর্বনিম্ন দরদাতা প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির তা নেই। মালয়েশিয়া ভিত্তিক কোম্পানিটির সঙ্গে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের যৌথ বিনিয়োগের পরিচালনা পর্ষদের রেজুলেশন আছে কিনা, তিনশ টাকার স্ট্যাম্পে যৌথ বিনিয়োগের দলিল থাকা এবং উভয় দেশের দূতাবাস কর্তৃক সেটি সত্যায়িত কিনা-সেটিও নিশ্চিত নয়। এই প্রতিষ্ঠানের আদৌ ব্রিজ অপারেট করার অভিজ্ঞতা আছে কিনা, সেটির স্বপক্ষেও দরপত্রের সঙ্গে প্রমাণপত্র সংযুক্ত নেই।