পুব আকাশে প্রত্যাশার নতুন সূর্য

আপডেট : ০১ জানুয়ারি ২০১৫, ০০:০৭

‘সত্য যে কঠিন/ কঠিনেরে ভালো-বাসিলাম... এই কঠিন সত্যকে সারথি করে ‘আজি এ ঊষার পুণ্য লগনে উদিছে নবীন সূর্য গগনে..। তমসা কেটে পূর্ব দিগন্তে আবহমান সূর্য আবার শুরু করলো নতুন যাত্রা। ‘সময় আর স্রোত কারো জন্য অপেক্ষা করে না’-এই সত্যকে বিমূর্ত করে নতুন বছরের প্রথম সূর্যোদয়। স্বপ্ন আর দিনবদলের অপরিমেয় প্রত্যাশার রক্তিম আলোয় উদ্ভাসিত শুভ নববর্ষ। হ্যাপি নিউইয়ার ২০১৫। অভিবাদন নতুন সৌরবর্ষকে। বিশ্বের বয়স আরও এক বছর বাড়লো। এক বছরের ‘আনন্দ-বেদনা, আশা-নৈরাশ্য আর সাফল্য-ব্যর্থতার পটভূমির ওপর আমাদের ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের এই প্রিয় বাংলাদেশ নতুন বছরে পর্বতদৃঢ় একতায় সর্ব বিপর্যয়-দুঃসময়কে জয় করবে অজেয়-অমিত শক্তি নিয়ে’—এ সংকল্পের সোনালী দিন আজ। আলোড়ন আর তোলপাড় করা ঘটনাবহুল ২০১৪-এর অনেক ঘটনার রেশ নিয়েই মানুষ এগিয়ে যাবে। তবে আঁধার কাটার অনেক আশ্বাসবাণী শুনিয়েছে আবার কোনটি শোনাতে পারল না ২০১৪। ভাগ্যাকাশে আনন্দ-বেদনা প্রত্যাশা আর দুর্যোগের ঘনঘটা নিয়েই বাঙালির বছর ফুরোল। সূচনা হলো আরো একটি বর্ষযাত্রা।

কতকটা রাজনৈতিক হানাহানিতে আরম্ভ বিগত বছরটি তার পরিসমাপ্তি পর্বেও সেই ছায়াপাত রেখে গেলো। দশম সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে চরম রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু হয়েছিল বছরটির। ২০১৪ সালের প্রথম দিনটি যখন শুরু হয়, তখন প্রধান বিরোধী দল বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ছিলেন কার্যত গৃহবন্দী। এরই মধ্যে ৫ জানুয়ারিতে হলো সংবিধান রক্ষার নির্বাচন। ওই নির্বাচন বর্জনের ডাক দিয়ে দেশজুড়ে চলে অভাবনীয় সহিংসতা। জনগণের জানমালের বিপুল ক্ষয়ক্ষতি হয়। তবুও নির্বাচন ঠেকাতে ব্যর্থ হয় বিরোধী জোট। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন ১৫৩ এমপি। বিরোধী জোট এই নির্বাচনকে ‘ভোটারবিহীন’ নির্বাচন বলে মধ্যবর্তী নির্বাচনের দাবি করে। নির্বাচন শেষ হলেও নির্বাচন প্রতিরোধের নামে শুরু হওয়া তাণ্ডব থামতে সময় লেগেছে। বিএনপির আন্দোলনের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর সহিংসতা মিলে বছরের শুরুটা ছিল মৃত্যুদীর্ণ, আগুনে পোড়া, বোমায় বিধ্বস্ত, শোকাতুর। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর থেকে আন্দোলনের পালে টান পড়ে।
এনিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে যে অস্বস্তি ছিল প্রধানমন্ত্রীর চীন, জাপান ও রাশিয়া সফরের মধ্য দিয়ে তা অনেকটা দূর হয়েছে। চীন ও জাপানের সঙ্গে কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটেছে। দুটি দেশই বাংলাদেশকে বড় অঙ্কের ঋণ দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বিদেশি পুঁজি খুব একটা আসেনি গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটের কারণে। মধ্যম আয়ের একটি দেশ হিসেবে কাঙ্ক্ষিত বিনিয়োগ হয়নি এ বছর। তবে মূল্যস্ফীতির চাপ ছিল কম, বিশেষ করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, চাল, ডাল, আটা, চিনি ইত্যাদির দাম ছিল মোটামুটি স্থিতিশীল। আগের বছর ঘটে যাওয়া রানা প্লাজার দুর্ঘটনার পর রফতানি খাতে যে স্থবিরতা দেখা দেয়, তা থেকে পুরোপুরি উত্তরণ ঘটেনি। বিদায়ী বছরে একটি সুখবর, বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে রফতানিকারকের তালিকায় নিজের নাম সংযোজন করেছে। এ বছরই ১৮ জুলাই রাত ৯টায় সর্বোচ্চ সাত হাজার ৪১৮ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ উত্পাদনের রেকর্ড করেছে বাংলাদেশ। আবার এ বছরেরই ১ নভেম্বর সারাদেশে ব্ল্যাক আউটের দৃষ্টান্ত তৈরি হয়েছে। এই বিপর্যয়ই সারাদেশকে বিদ্যুত্হীন রাখে প্রায় ৯ ঘন্টা।
 রাজনৈতিক অস্থিরতা থাকার পরও গত অর্থ বছর ৬ দশমিক ১২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন, মাথাপিছু আয় এক হাজার ১৯০ ডলারে উন্নীত ও মূল্যস্ফীতির নিম্নগতিকে ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ বছরই ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমানা নিয়ে বিরোধের নিষ্পত্তি হয়েছে। পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে। মেট্রোরেলের কাজ শুরু করার জন্য চলছে ভূ-তাত্ত্বিক জরিপ।
২০১৪ সালে বেশ কয়েকটি হত্যাকাণ্ড বারবার আলোচনায় এসেছে। এর মধ্যে র্যাবের হাতে নারায়ণগঞ্জে ঘটে যাওয়া সাত খুন নিয়ে আলোচনা হয়েছে সারা বছরই। রাজধানীর বিহারিপল্লীতে হামলা ও অগ্নিসংযোগে ১০ জন এবং সুন্দরবনে পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুুকযুদ্ধে ১৩ জন নিহত হওয়ার ঘটনাও বেশ আলোচিত হয়। ২০১৪ সালে কারা হেফাজতে মারা যান ৬০ জন। এছাড়া আটক ও গ্রেপ্তারের পর আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে শারীরিক নির্যাতনে মারা যান ১৩ জন। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে ক্রসফায়ার, বন্দুকযুদ্ধ ও গুলিবিনিময়ে নিহত হন ১২৮ জন, ২০১৩ সালে এ সংখ্যা ছিল ৭২ জন।
বছরটিকে দুর্ঘটনার বছরও বলা যায়। সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে ৬৫৮২ জন, ২০১৩ সালে এ সংখ্যা ছিল ৫১৬২ জন। এক বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর হার ২৭ ভাগ বেশি। দুঃস্বপ্নের নাম হয়ে থাকবে এমএল পিনাক-৬ ও এমভি মিরাজ-৪।
যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারে যে ১৫টি রায় হয়েছে, তার মধ্যে এ বছর রায় হয়েছে ছয়টি। সবারই মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে। আগের বছর কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকর হলেও এ বছর আরেক যুদ্ধাপরাধী কামারুজ্জামানের মৃত্যুদণ্ড আপিল বিভাগে বহাল থাকলেও রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি প্রকাশ না হওয়ায় অপেক্ষমাণ আছে দণ্ড কার্যকর। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিশ্চিত করার দাবিতে গড়ে ওঠা গণজাগরণ মঞ্চ ভেঙেছে। হজ, তাবলিগ জামাত নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছেন আবদুল লতিফ সিদ্দিকী। বাদ পড়লেন মন্ত্রিসভা থেকে, অপসারিত দল থেকে। আছেন জেলখানায়।
এ বছর আমরা হারিয়েছে জাতির বাতিঘরতুল্য প্রিয়জনদের অনেককে। তাদের মধ্যে আছেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্ট বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান, দেশের প্রবীণতম কবি আবুল হোসেন, দার্শনিক ও শিক্ষাবিদ সরদার ফজলুল করিম, উপমহাদেশের কিংবদন্তী নজরুল সঙ্গীত শিল্পী ফিরোজা বেগম, ইতিহাসবেত্তা অধ্যাপক এএফ সালাহ্উদ্দীন আহমদ, শিক্ষাবিদ জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, ভাষা আন্দোলনের পুরোধা আবদুল মতিন, শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী, বাউল সম্রাট আবদুল করিম শাহ, সাংবাদিক এবিএম মূসা, ইংরেজি দৈনিক দি ইনডিপেনডেন্টের সাবেক সম্পাদক ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা মাহবুবুল আলম, কণ্ঠশিল্পী বশীর আহমেদসহ আরও অনেককে।
এর মধ্যে শিশু জিহাদের সকরুণ মৃত্যু শোকাতুর করেছে পুরো জাতিকে।
সুন্দরবনে অয়েল ট্যাংকার ডুবি কেবল খুলনা অঞ্চলই নয়, সারা দেশ এবং দেশের বাইরেও অন্যতম সর্বাধিক আলোচিত ঘটনা ছিলো। বিমান বন্দরগুলো পরিণত হয়েছিলো পুরোপুরি সোনার খনিতে।
দেশবাসী এবং বিশ্ববাসী সবাইকে ইংরেজি নববর্ষের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া, জাতীয় পার্টির (জেপি) চেয়ারম্যান এবং পরিবেশ ও বন মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, মহাসচিব শেখ শহিদুল ইসলাম প্রমুখ।

তারা বলেন, ১ জানুয়ারি প্রতিবছর নতুন বার্তা নিয়ে আমাদের দ্বারে উপস্থিত হয়। পুরনো বছরের ব্যর্থতা, গ্লানি, হতাশাকে ঝেড়ে ফেলে নবউদ্যমে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা যোগায় নববর্ষ।