পদ্মা সেতু নিয়ে এত কথা হয়েছে যে, মানুষ বিশ্বাস করতে পারছে না এই সেতু আদৌ আলোর মুখ দেখবে কি না। তবে, পদ্মা সেতু প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখলে সেই সন্দেহ থাকবে না কারো মনেই। পদ্মা নদীর মাওয়া পয়েন্ট আর ওপারের জাজিরা এলাকা জুড়ে এক বিশাল কর্মযজ্ঞ শুরু হয়েছে। এই কর্মযজ্ঞ দেখলে বুঝতে কষ্ট হয় না বাংলাদেশের মানুষের স্বপ্নের সেতু শেষ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখবেই। মূল সেতু নির্মাণের কর্মকাণ্ড চলছে দ্রুত গতিতে। এর মধ্যেই পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের ১৬ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। আর ২৫ হাজার কোটি টাকার এ প্রকল্পের ইতোমধ্যেই ৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে।
এদিকে পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের নতুন বছরে সড়ক পরিবহন ও সেতু বিভাগ থেকে দুর্নীতি ১০ শতাংশ কমিয়ে আনার ঘোষণা দিয়েছেন । বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সাথে এক মতবিনিময় সভায় পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী এ প্রতিশ্রুতি দেন।
মন্ত্রী বলেন, যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের আওতায় সকল প্রকল্পে কাজের গুণগত মান বৃদ্ধি করা হবে। এখানে কোন দুর্নীতি মানা হবে না। নতুন বছরে আমাদের অঙ্গীকার হচ্ছে পরিবহন ও সেতু বিভাগ থেকে দুর্নীতি কমিয়ে আনা। তিনি বলেন, ২০১৮ সালের মধ্যেই পদ্মা সেতুতে সড়ক ও রেলপথ যোগাযোগ স্থাপন করা সম্ভব। আগামী ঈদের আগেই ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ফোর লেন ও ময়মনসিংহ মহাসড়ক নিয়ে সকল অভিযোগ নিরসন করা হবে। এ সড়ক নিয়ে আর কারো অভিযোগ থাকবে না।
এ সময় বিএনপিসহ সকল রাজনৈতিক দলকে হরতালের বিকল্প চিন্তা করার আহ্বান জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, বিএনপিকে প্রধানমন্ত্রী সংলাপের আহ্বান জানিয়েছিলেন। তারা তখন সংলাপে অংশ না নিয়ে সুবর্ণ সুযোগ হারিয়েছে। বিএনপি নেতাদের নির্যাতন সহ্য করার ক্ষমতা নেই বলে মন্তব্য করে ওবায়দুল কাদের আরো বলেন, নেতারা এয়ারকন্ডিশন ঘরে বসে আন্দোলনের ঘোষণা দিলেও কর্মীরা সংগঠিত হয় না। নেতা-কর্মীরা ঘরে ঘুমায়।
বিশ্ব ব্যাংক যখন এই সেতু নির্মাণে অর্থায়ন বন্ধ করে দিল তখনই এ সেতু নির্মাণ নিয়ে অনিশ্চয়তার সৃষ্টি হয়েছিল। দেশের মানুষ ধারণা করেছিল এই সেতু নির্মাণ পিছিয়ে যাবে। কিন্তু তা হয়নি। সেইসময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষণা দিয়েছিলেন বিদেশি অর্থায়ন ছাড়াই নিজস্ব অর্থেই এ সেতু নির্মাণ করা হবে। আর প্রধানমন্ত্রীর কথামতোই নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। তাঁর সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধানে এই প্রকল্প বাস্তবায়নে সবাই দিন-রাত কাজ করে চলেছেন। সেতুটি এশিয়ান হাইওয়ে রুট ‘এ এইচ-১’ এর অংশ। এই সেতু নির্মাণের পর দেশের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশসমূহের যোগাযোগের ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে। সে কারণেই সরকার এ সেতু নির্মাণে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে।
সেতু নির্মাণের অগ্রগতি প্রসঙ্গে পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বললেন, পদ্মা সেতু এখন আর অবাস্তব কল্পনা নয়, স্বপ্ন নয়। এ সেতু নির্মাণে যা যা চ্যালেঞ্জ ছিল সব দূর করা হয়েছে। এখন শুধু নির্মাণ কাজ বাকি। তিনি জানান, প্রকল্প এলাকায় যেমন কর্মযজ্ঞ শুরু হয়েছে। তেমনি জার্মানি, সিঙ্গাপুর ও চায়নাতেও সেতুর প্রয়োজনীয় উপাদান নির্মিত হচ্ছে। ২০১৮ সালের মধ্যে এ সেতু নির্মাণে সরকার বদ্ধপরিকর। ২০১৮ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ সেতুর উদ্বোধন করবেন। সে কারণে কোথাও কোনরকম ছাড় দেয়া হচ্ছে না। সেনাবাহিনীর সদস্য, মন্ত্রণালয়ের প্রকৌশলী ও বিদেশি প্রকৌশলী সবাই একযোগে দিন-রাত পরিশ্রম করে চলেছেন এ বিশাল কর্মযজ্ঞকে বাস্তব রূপ দিতে।
উল্লেখ্য, পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্প সরকারের একটি বৃহত্তম অবকাঠামো প্রকল্প। আওয়ামী লীগ সরকারের সবচেয়ে অগ্রাধিকার প্রাপ্ত এ সেতু নির্মিত হলে ঢাকার সঙ্গে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সড়ক ও রেল যোগাযোগ স্থাপনের মাধ্যমে মুন্সীগঞ্জ, শরীয়তপুর, মাদারীপুর, বরিশাল, পটুয়াখালী এবং ফরিদপুর জেলার উন্নয়নে সরাসরি ভূমিকা রাখবে। একইসঙ্গে সেতুটি দক্ষিণ অঞ্চলের ১৯টি জেলার সঙ্গে ঢাকাসহ পূর্বাঞ্চলের যোগাযোগ স্থাপন নিশ্চিত করবে।
পদ্মা সেতুর দৈর্ঘ্য ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার। দ্বিতলবিশিষ্ট এই সেতু নির্মিত হবে কংক্রিট আর স্টিল দিয়ে। ওপর দিয়ে যানবাহন আর নিচ দিয়ে চলবে ট্রেন। পদ্মা সেতু প্রকল্পের সমীক্ষা হয়েছিল জাপানি সংস্থা জাইকার অর্থে। নকশা প্রণয়ন করা হয়েছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের অর্থায়নে। মূল প্রকল্প বাস্তবায়নে বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, জাইকা ও ইসলামিক উন্নয়ন ব্যাংকের সঙ্গে চুক্তি হয়েছিল; কিন্তু দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগে দাতারা সরে যাওয়ার ঘোষণা দিলে জটিলতা তৈরি হয়। এক পর্যায়ে সরকার নিজস্ব অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেয়। রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংক প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় ডলার জোগান দেয়ার নিশ্চয়তা দেয়।
পদ্মা সেতু প্রকল্প এলাকায় সরেজমিন
গত মঙ্গল ও বুধবার-এই দুইদিন পদ্মা নদীর মাওয়া পয়েন্ট এবং ওপারের পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্প এলাকা ঘুরে এই বিশাল কর্মযজ্ঞ চোখে পড়ে। ইতোমধ্যেই বহুমুখী সেতু নির্মাণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ভূমি অধিগ্রহণ, হুকুম-দখল, ভূমি উন্নয়ন এবং পুনর্বাসনের কাজ প্রায় শেষের দিকে। এখন চলছে এই সেতুর এপ্রোচ রোড নির্মাণের কাজ। ২০১৮ সালে সেতু দিয়ে যানবাহন ও ট্রেন চলাচল করবে এই পরিকল্পনা নিয়েই এগোচ্ছে সবকিছু। প্রকল্পের মাওয়া অংশে গিয়ে দেখা যায়, পদ্মার দুই পাড়ে কর্মযজ্ঞ চলছে। মাওয়ায় বড় বড় বার্জে ক্রেন বসানো হয়েছে নির্মাণসামগ্রী ওঠানো-নামানোর জন্য। বড় বড় যন্ত্রে মাটি কাটা ও সমান করা হচ্ছে। চলছে সড়ক নির্মাণ ও সমপ্রসারণের কাজ। নদীতে চলছে ড্রেজার। কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ডে চলে এসেছেন বিদেশি প্রকৌশলী ও শ্রমিক ও কর্মকর্তারা। তাদের থাকার জন্য প্রায় এক কিলোমিটার লম্বা ঘর বানানো হয়েছে। একই রকম কর্মমুখর পরিবেশ শরীয়তপুরের জাজিরা ও শিবচরে। সেখানে সীমানাপ্রাচীর দিয়ে পাথর-বালু-ইট এনে স্তূপ করে রাখা হচ্ছে। রাস্তায় মাটি ফেলে রোলার দিয়ে মাটি সমান করা হচ্ছে। এদিকে, সেতুর পিলার নির্মাণের কাজ চলছে।
মূল সেতু নির্মাণ করবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না মেজর ব্রিজ কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেড। সেতু তৈরির জন্য স্প্যান, পাইলিং, গার্ডার নির্মাণের আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি নির্মাণের জন্য মাওয়ার শিমুলিয়া ফেরিঘাটের কাছে কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ড নির্মাণ করা হয়েছে। গত নভেম্বর মাসে চীনা কোম্পানির কাছে বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে কোম্পানিটির প্রকৌশলী ও অন্য কর্মকর্তারা আসতে শুরু করেছেন। কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ড ঘুরে দেখা গেছে, তিনটি করে ড্রেজার ফ্লোটিং ক্রেন, দুটি টাগবোট, একটি অ্যাংকর বোট চলে এসেছে। এ ছাড়া সেখানে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়, গবেষণাগার, ওয়ার্কশেড, কর্মীদের আবাসনের নির্মাণ কাজ চলছে।
শরিয়তপুরের জাজিরা অংশে প্রায় ১০ দশমিক ৫৭ কিলোমিটার চার লেনের এপ্রোচ সড়ক নির্মাণ করা হবে। সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, জাজিরা, শিকদারকান্দি, কুতুববাড়ি, বড় কেশবপুর, নাওডোবাসহ বিভিন্ন এলাকায় এপ্রোচ সড়কের পাইলিং ও মাটি ভরাটের কাজ চলছে। এর পাশাপাশি চলছে ৫টি ব্রিজ, ২০টি কালভার্ট ও আটটি আন্ডারপাস নির্মাণের কাজ। এ কাজে ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৯৭ কোটি টাকা। সার্বিকভাবে কাজের অগ্রগতি প্রায় ২৯ শতাংশ।
এদিকে মাওয়া প্রান্তে এক কিলোমিটার এপ্রোচ সড়ক হবে এক কিলোমিটার। এ সড়ক তৈরির জন্য মাটি ভরাটের কাজ চলছে। টোলপ্লাজা, সেতু, কালভার্ট নির্মাণ করা হবে। সার্বিক অগ্রগতি মাত্র ২২ শতাংশ। এ কাজে ব্যয় হবে ১৯৩ কোটি টাকা। দুই পাড়ের এপ্রোচ সড়ক নির্মাণের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হলো আবদুল মোনেম লিমিটেড- হাইওয়ে কনস্ট্রাকশন ম্যানেজমেন্ট (এএমএল-এইচসিএম) নামের বাংলাদেশ- মালয়েশিয়ার যৌথ বিনিয়োগের কোম্পানি। ২০১৬ সালের দ্বিতীয়ার্ধে এ দুটি সড়কের কাজ শেষ হবে।
এদিকে চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রকৌশলী ও কর্মকর্তাদের আবাসনের জন্য জাজিরার নাওডোবা এলাকায় ২০৮ কোটি টাকা ব্যয়ে বিশেষ আবাসিক এলাকা তৈরি হচ্ছে। ডুপ্লেক্স বাংলো টাইপের বাড়ি, ব্যাচেলর মেস, খেলাধুলা ও বিনোদন ব্যবস্থাসহ প্রায় সব নাগরিক সুবিধা থাকবে এখানে। সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, একদিকে চলছে মাটি ভরাটের কাজ, অন্যদিকে চলছে বাংলো নির্মাণ। কাজের অগ্রগতি ১২ শতাংশ।
প্রকল্প এলাকায় চলে এসেছে, চায়না মেজর ব্রিজ ও ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানির প্রকৌশলী ও শ্রমিকরা। মূল সেতু এবং রোড এন্ড রেল ভায়াডাক্ট নির্মাণ করবে এ প্রতিষ্ঠানটি। চায়না মেজরের প্রকৌশলীরা জানালেন, সেতুর স্প্যান চায়নায় তৈরি হচ্ছে। সেগুলো বাংলাদেশে এনে জোড়া দেয়া হবে। চায়না মেজরের প্রকৌশলীরা জানালেন, খুব দ্রুততার সঙ্গে কাজ চলছে।
এই সেতুর জাজিরা সংযোগ সড়ক, মাওয়া সংযোগ সড়ক ও সার্ভিস এরিয়া-২ নির্মাণের কনসালটেন্ট নিয়োগ দেয়া হয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে। আর ঠিকাদারী কাজ করছে আব্দুল মোনেম লিমিটেড। এ কাজের প্রধান সমন্বয়ক মেজর জেনারেল আবু সাঈদ মোহাম্মদ মাসুদ জানালেন, পদ্মা বহুমুখী সেতুর জাজিরা সংযোগ সড়কের মোট ২৪ দশমিক সাত দুই ভাগ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। তিনি জানান, সেনা সদস্যরা দিন-রাত কাজ করছেন যথাসময়ে এই সংযোগ সড়ক নির্মাণ শেষ করতে।
পদ্মা বহুমুখী সেতুর প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী শফিকুল ইসলাম জানালেন, এ সেতু নির্মাণ যথাসময়ে শেষ করতে আমরা কাজ করছি। প্রতিটি কাজ নিখুঁত ও সময়মত যাতে শেষ হয় সে ব্যাপারে আমরা সবাই খুব সচেতন। তিনি জানান, যদি ডলারের দাম না বাড়ে তবে প্রকল্প ব্যয় আর বাড়বে না বলেই আমরা মনে করছি।