ভার্সিটিতে ভর্তির আদেশ পরের দিনই স্থগিত

আপডেট : ০২ জানুয়ারি ২০১৫, ০৯:৩২




এসএসসি ও এইচএসসির ফলাফলের ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ভর্তির আদেশ জারির পরের দিনই তা স্থগিত করা হয়েছে। এদিকে হুট করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এমন আদেশ জারি আবার পরের দিনই তা স্থগিত করায় প্রশ্নের মুখে পড়েছে শিক্ষামন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্টরা।
দীর্ঘদিন ধরে একাধিক আইন ও বিধিমালা ঝুলে আছে মন্ত্রণালয়ে। একের পর এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বদল হচ্ছে। আইন ও বিধিমালার তৈরির জন্য সকলেই এসে নিজেদের মত করে জনমত যাচাই করছে। কিন্তু ভর্তি প্রক্রিয়া নিয়ে উপাচার্যদের সাথে বৈঠক না করে, তাদের মতামত না নিয়ে এতবড় সিদ্ধান্ত নেয়ায় বৃহস্পতিবার দিনভর আলোচনা-সমালোচনা চলছিল শিক্ষাঙ্গনে।
ভর্তি পরীক্ষা পদ্ধতি তুলে দিয়ে মাধ্যমিকএবং উচ্চ মাধ্যমিকের ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পক্ষে মত ছিল শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের। মন্ত্রীর বক্তব্য হলো, বিশ্ববিদ্যালয়ের বাছাই প্রক্রিয়া দিয়ে সঠিকভাবে শিক্ষার্থীদের মেধা যাচাই হয় না। তার প্রশ্ন, তাহলে এসএসসি-এইচএসসির কি মূল্য থাকলো? এসব ছেলেমেয়েরা হতাশ হয়ে যাবে। নিশ্চয়ই এখানে কোথাও না কোথাও গলতি আছে। তবে শিক্ষামন্ত্রীর এই বক্তব্যের সঙ্গে অনেক উপাচার্য একমত ছিলেন না।
গত বুধবার ফলের ভিত্তিতে শিক্ষার্থী ভর্তি করার জন্য বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্দেশনা পাঠানো হয় মন্ত্রণালয় থেকে। শিক্ষামন্ত্রীর নিজস্ব চিন্তাভাবনার সঙ্গে এ নির্দেশনার মিল পাওয়া গেলেও গতকাল মন্ত্রী নিজেই নির্দেশনাটি স্থগিত করেন। মন্ত্রীর দফতরে কর্মকর্তা বলেছেন, অনেক ফাইলের সাথে এ ফাইলটিও সই হয়েছে। মন্ত্রী বিষয়টি খেয়াল করেননি। খেয়াল করলে এ ফাইলের অনুমোদন তিনি দিতেন না। মন্ত্রীকে ভুল বুঝিয়ে ফাইলে স্বাক্ষর করানো হয়েছে।
সূত্র জানিয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি প্রক্রিয়া নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে সভা করে একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য মন্ত্রীর সাথে আলোচনা করেই নথি তৈরি হয়েছিল। কিন্তু নথি সচিবের কাছে পৌঁছলে নথিতে যোগ করা হয়, ফলাফলের ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি প্রক্রিয়ায় বিষয়টি। নথির পরের পাতায় মন্ত্রী স্বাক্ষর করেন। এ কারণে মন্ত্রী বিষয়টি খেয়াল করেননি।
তবে মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, মন্ত্রণালয়ের একটি অংশ চেয়েছিল এভাবে নির্দেশনা জারি করে মাঠের অবস্থান যাচাই। এর অংশ হিসেবেই এমন নির্দেশনা আসে। মন্ত্রী পুরো বিষয়টি জানতে পরে গতকাল দুপুরে এসে ফাইল এনে তা স্থগিতের নির্দেশ দেন।
এর আগে ২০১৩ সালের আগস্টে এইম ওয়ার্ল্ডওয়াইড নামের একটি সংগঠনকে শিক্ষা মেলার আয়োজনের অনুমতি দেয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল কলেজ কর্তৃপক্ষকে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে শিক্ষা মেলা আয়োজনকারী প্রতিষ্ঠানকে সহযোগিতার জন্য নির্দেশনা জারি করা হয়। এই নির্দেশনা পত্র পেয়ে এইম ওয়ার্ল্ডওয়াইড বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে বিভিন্ন অংকের টাকা দাবি করে। পরে বিষয়টি মন্ত্রীর গোচরে আনলে তিনি দেখেন সংশ্লিষ্ট ফাইলে তার স্বাক্ষর রয়েছে। তিনি সাংবাদিকদের কাছে দাবি করেন, তাকে ভুল বুঝিয়ে এভাবে কাজটি করা হয়।
এর আগে শিক্ষক বদলি নিয়ে বিসিএস (শিক্ষা) কর্মকর্তাদের মধ্যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল। শিক্ষকদের ঢালাওভাবে অনৈতিকভাবে বদলি করার অভিযোগ তুলে তারা শিক্ষামন্ত্রীর সাথে একাধিক বৈঠকও করেন। সার্বিক বিষয় নিয়ে অনেকে মন্ত্রী ও সচিবের সমন্বয়হীনতাকে দায়ী করেছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, ভর্তি পরীক্ষার আয়োজন না করার তথ্য আমরা গণমাধ্যমে জানতে পেরেছি। ঐ ধরনের কোন চিঠি পাইনি। তবে আজ (গতকাল) মন্ত্রণালয় থেকে ফোন করে জানানো হয়েছে, সিদ্ধান্তটি স্থগিত করা হয়েছে। আর পত্রিকায় যেভাবে বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে, তা সর্বাংশে সঠিক নয়।
তিনি বলেন, এর আগে কখনোই ভর্তি পরীক্ষা গ্রহণ করা যাবে না, এমন কোন আলোচনা মন্ত্রণালয়ের সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের হয়নি। সমন্বিত পদ্ধতিতে পরীক্ষা গ্রহণের বিষয়ে আলোচনা হয়েছিল। আর এ পদ্ধতি নিয়ে এখনও পর্যালোচনা চলছে।
 ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় নগর ও গ্রামের শিক্ষার্থীদের সুযোগপ্রাপ্তিতে এখনও বড় ব্যবধান রয়ে গেছে। বিভিন্ন ধরনের সুবিধা সহজলভ্য হওয়ায় শহরের শিক্ষার্থীরা সহজেই ভালো ফলাফল করে। আর গ্রামের শিক্ষার্থীরা তেমন করতে পারে না। তাদের মেধা বিকশিত হওয়ার সুযোগ দিতে হবে। তাই বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তিতে পরীক্ষার পাশাপাশি এসএসসি ও এইচএসি পরীক্ষার ফলাফল যুক্ত করা হয়। এখন পর্যন্ত এটিই সবচেয়ে সহজ ও যৌক্তিক উপায় বলে চিহ্নিত হয়েছে। অন্য বিকল্পগুলো পর্যালোচনাশেষে গ্রহণ বা বর্জন করা যেতে পারে। উচ্চশিক্ষার জন্য সেটিই হবে মঙ্গলজনক।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফারজানা ইসলাম বলেন, এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে হুট করে সিদ্ধান্ত নেয়া ঠিক হবে না। শিক্ষাবিদসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অভিজ্ঞদের সাথে আলোচনা করেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক হারুন অর রশীদ বলেন, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিতে গিয়ে ছেলেমেয়েরা হয়রানির শিকার হয়। অভিভাবকদের অতিরিক্ত টাকা খরচ করতে হয়। এসব বিবেচনায় এটি ভালো উদ্যোগ। অন্যদিকে এটা হলে যেই ছেলেটা ইংরেজিতে ভালো সে হয়ত সেই বিষয়ে পড়ার সুযোগ পাবে না। বিশেষায়িত বিষয়ে যারা ভালো তারা উপেক্ষিত হতে পারে।