দারিদ্র্য ও বাল্যবিবাহ :বরিশালে ঝরে পড়ছে বহু শিক্ষার্থী

আপডেট : ০৩ জানুয়ারি ২০১৫, ০৩:৫৮

টানা ৫ বছর  জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) ও প্রাথমিক সমাপনী (পিএসসি) পরীক্ষার ফলাফলে বরিশাল শিক্ষাবোর্ড সারাদেশে প্রথম স্থানে থাকলেও বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী ঝরে পড়ছে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে গত পরীক্ষায় ২৩ হাজার শিক্ষার্থী অনুপস্থিত ছিল বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে। এ সত্যতা স্বীকার করে বরিশাল শিক্ষাবোর্ড ও প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের কর্মকর্তারা জানান, ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের সিংহভাগই নির্বাচনী পরীক্ষায় কৃতকার্য হতে পারেনি। ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের সিংহভাগই গ্রাম-গঞ্জের বিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত ছিল। তাদের ঝরে পড়ার ব্যাপারে শিক্ষকরা জানান, নির্বাচনী পরীক্ষায় পাস না করার পাশাপাশি পারিবারিক অসচ্ছলতা ও দারিদ্য, নদীভাঙ্গন, শিক্ষার ব্যয় বৃদ্ধি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অন্যত্র বদলী, শিশুশ্রম, সামাজিক প্রতিবন্ধকতা ও মেয়েদের বাল্যবিয়ে অন্যতম কারণ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। দরিদ্র পরিবারের সিংহভাগ শিশুই স্কুলে ভর্তি হয়। এদের মধ্যে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে যাওয়ার আগেই স্কুল থেকে অধিকাংশই বিদায় হয়। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৫ম শ্রেণি পাস করার আগে-পরে শিশুদের মধ্যে ছেলেরা পারিবারিক অভাব- অনটন ও কন্যা শিশুরা ধর্মীয় অনুশাসনের নামে সামাজিক ও কুসংস্কারের ফলে আর হাইস্কুলে ভর্তি হয় না। যে সব শিশু ৫ম শ্রেণি উত্তীর্ণ হওয়ার পর হাইস্কুলে ভর্তি হয় তারা অষ্টম শ্রেণির আগেই স্কুল থেকে বিদায় হওয়ার অন্যতম কারণ দরিদ্র শিশুরা পরিচর্যার অভাবে ভাল পড়াশুনা করতে না পেরে পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়। এ ছাড়া পারিবারিক অসচ্ছলতার কারণে ছেলেশিশুরা পরিবারের আর্থিক উপার্জনের জন্য নিজেরাই কাজে যুক্ত হয়ে পড়েন। আর কন্যাশিশুরা অষ্টম শ্রেণির গণ্ডি পার হওয়ার আগেই বিয়ের পিঁড়িতে বসেন। শহর অঞ্চলে ঝরে পড়ার সংখ্যা কম হলেও কারণ প্রায় একই।  

বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের বিদ্যালয় পরিদর্শক আবুল বাশার তালুকদার জানিয়েছেন, বরিশাল শিক্ষাবোর্ডের অধীন ৬টি জেলা থেকে ২০১৪ সালে জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষায় অংশ নিতে ১ লাখ ৭ হাজার ২৯ জন শিক্ষার্থী নিবন্ধন করেছিল। এর মধ্যে পরীক্ষায় অংশ নিতে ফরম পূরণ করেছে ৯৮ হাজার ৯৮২ জন। এদের মধ্যে নিয়মিত শিক্ষার্থী ফরম পূরণ করেছে ৯৬ হাজার ৮১৭ এবং অনিয়িমিত ২ হাজার ১৬৫ জন। সব মিলিয়ে চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে মাত্র ৯৬ হাজার ৪৬৮ পরীক্ষার্থী। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, নিবন্ধন করার পর ১০ হাজার ২১২ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেনি। আর পরীক্ষার  ফরম পূরণ করার পরও ২ হাজার ৫১৪ জন পরীক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেনি। বরিশাল শিক্ষাবোর্ডে ২০১৪ সালের  জেএসসি পরীক্ষার্থীদের মধ্যে ১২ হাজার ৭২৬ জন শিক্ষার্থী ঝরে পড়েছে বলে ঐ কর্মকর্তা জানান। 

জেএসসি’র মত একই চিত্র প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষার্থীদের। শিক্ষা অধিদপ্তরের  বরিশাল বিভাগীয় উপ-পরিচালক মাহবুব এলাহী জানান-এ বছর বরিশাল বিভাগ থেকে ১ লাখ ৭৫ হাজার ৫২১ জন শিক্ষার্থী প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য ডিআরভুক্ত হয়েছিল। এদের মধ্যে ১ লাখ ৬৯ হাজার ১৩ জন পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছিল। পাস করেছে ১ লাখ  ৬৭ হাজার ৪৮ জন শিক্ষার্থী। প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষার ডিআরভুক্ত হওয়ার পর থেকে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ পর্যন্ত ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা  ৬ হাজার ৫০৮ জন। তবে যারা সমাপনী পরীক্ষায় অংশগ্রহণের পর অকৃতকার্য হয়েছে তাদের ভবিষ্যত্ ঝরে পড়াদের তালিকায় যুক্ত হওয়ার আশংকাই বেশি বলে জানান শিক্ষা কর্মকর্তা ও বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। অতীত অভিজ্ঞতা থেকে তারা বলছেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সমাপনী পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ার পর সে সব শিক্ষার্থীদের আর খুব একটা বিদ্যালয়মুখী হতে দেখা যায় না। অথচ এদের পড়াশুনার ব্যাপারে একটু যত্নবান হলেই তারাও অন্যদের মত ভাল ফলাফল অর্জন করতে সক্ষম হতো বলে তারা মনে করেন। বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা জানান, ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের পুনরায় বিদ্যালয়মুখী করতে তারা পরিবারের সাথে আলাপ করলেও খুব সন্তোষজনক ফলাফল আসে না। কারো পারিবারিক অসচ্ছলতা এবং কেউ কেউ সন্তানের পড়াশুনায় ভাল ফলাফল না আসায় স্কুলের পরিবর্তে কর্মে নিয়োগে আগ্রহী হয়ে পড়েন বেশি।