তিন কারণে বিনিয়োগ বাড়ছে না :সিপিডি

আপডেট : ০৪ জানুয়ারি ২০১৫, ০০:২৬

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেছেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধির ঘরে আটকে গেছে। যদিও এ হার কম নয়, তবে বাংলাদেশের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নের জন্য ‘সুপার বাংলা গ্রোথ রেট’ অর্থাত্ ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে। এজন্য ব্যক্তিখাতে বিনিয়োগ ও তার উত্কর্ষতা (উত্পাদনশীলতা) বাড়াতে হবে। তিনি বলেন, মূলত তিনটি কারণে দেশে বিনিয়োগ কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে হচ্ছে না। এর মধ্যে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা অন্যতম। সব সময়ই নির্বাচনের পর বিনিয়োগ বাড়ার প্রবণতা থাকলেও এবার তা হয়নি। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা দীর্ঘমেয়াদী হওয়ার নিশ্চয়তার অভাবে এমনটা হচ্ছে। তাই বিনিয়োগ বাড়াতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার নিশ্চয়তা দরকার। যেন উদ্যোক্তারা বিনিয়োগে আস্থা পান।

গতকাল শনিবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে সিপিডি আয়োজিত ‘বাংলাদেশ অর্থনীতি ২০১৪-১৫; অন্তর্বর্তীকালীন পর্যালোচনা’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে মূল প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন সিপিডি’র নির্বাহী পরিচালক ড. মুস্তাফিজুর রহমান। উপস্থিত ছিলেন সিপিডি’র অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম, গবেষক তৌফিকুল ইসলাম খান প্রমুখ।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে ড. দেবপ্রিয়  বলেন, আরো দুটি কারণে বিনিয়োগ বাড়ছে না। প্রচলিত একটি কারণ হলো-গ্যাস, বিদ্যুত্, জমিসহ অবকাঠামোর অভাব। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে দুর্নীতির সমস্যা। এছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের শ্লথ গতিও বিনিয়োগ না বাড়ার কারণ। তিনি বলেন, দেশের ব্যাংকিং খাত ও পুঁজিবাজারে নাজুক পরিস্থিতি বিরাজ করছে। এডিপি (বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি) বাস্তবায়ন পরিস্থিতি ও এডিপি’র গুণগত মান আশানুরূপ নয়। স্থানীয় সরকারের মাধ্যমে সরকারের ব্যয় করার প্রবণতা অনেক কম। এছাড়াও নানা ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা আমাদের রয়েছে। এসব দূর করতে সংস্কারমূলক কাজ শুরু হলেও তার গতি ধীর হয়ে পড়েছে।
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য আরও বলেন, একদিকে দেশে বিনিয়োগ নেই। অন্যদিকে দেশ থেকে অর্থ পাচার হয়ে যাচ্ছে। ২০১২ সালে দেশ থেকে প্রায় ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়ে গেছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এসব অর্থ পাচার হচ্ছে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির নামে। তাই এ বিষয়ে সরকারের নজরদারি বাড়ানো দরকার। অর্থ পাচারের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতি নতুন এক সঙ্কটের মুখোমুখি হয়েছে।
সাম্প্রতিক অর্থনীতির প্রতিবেদন উপস্থাপনকালে ড. মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, ২০১৫ অর্থবছরে কাঙ্ক্ষিত জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনে জিডিপিতে বিনিয়োগের অবদান সাড়ে ৩২ শতাংশ করা প্রয়োজন। অথচ আমরা এর কাছাকাছিও যেতে পারিনি। বর্তমানে এ হার সাড়ে ২৬ শতাংশ। সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক সূচক বিশ্লেষণ করে তিনি বলেন, ২০১৪ সালে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি আগের তুলনায় গতিশীল হয়েছে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী হয়েছে, বিনিময় হারে স্থিতিশীলতা দেখা গেছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য পরিস্থিতির নিম্নগতিতে ভর্তুকির চাপ কমেছে। তবে অর্থনীতিতে সাম্প্রতিক সময়ে যে চ্যালেঞ্জ দেখা গেছে তা হলো-বেসরকারি বিনিয়োগ প্রত্যাশা অনুযায়ী হয়নি, লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি অনেক বেশি, এডিপি’র গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে, ব্যাংকিং খাতে অধিক তারল্য ও কুঋণ বেড়েছে এবং প্রবাসী আয় তুলনামূলক কমে গেছে। মূল্যস্ফীতির হার স্বস্তিজনক পর্যায়ে থাকলেও খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমেনি। অথচ দেশে খাদ্য উত্পাদন অনেক বেড়েছে।
খাদ্য আমদানি-রপ্তানির বিষয়ে ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, আমরা খাদ্য রপ্তানির বিপক্ষে নই। বরং এর মাধ্যমে দেশের খাদ্যদ্রব্যের দাম আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হবে। তবে খাদ্য রপ্তানি করতে গিয়ে বাংলাদেশ যেন সঙ্কটে না পড়ে তা বিবেচনায় রাখতে হবে। এছাড়া কৃষি খাতে যে ভর্তুকি দেয়া হয় তা বাংলাদেশের জনগণের কল্যাণার্থে দেয়া হয়। এ ভর্তুকির সুফল বিদেশিরা পেয়ে যাচ্ছে কিনা তা ভেবে দেখতে হবে।
সাম্প্রতিক অর্থনীতিতে চারটি বিষয়কে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে প্রতিবেদনে। প্রথমত, নির্বাচনের পরও ব্যক্তি বিনিয়োগে মন্দা, দ্বিতীয়ত, আর্থিক খাতের নাজুক পরিস্থিতি, তৃতীয়ত, বস্ত্র খাতের রপ্তানি পরিস্থিতি ও চতুর্থত, জনশক্তি রপ্তানি।
আর্থিক খাতের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে ড. মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, ব্যাংকে প্রচুর তারল্য থাকলেও ঋণের চাহিদা তুলনামূলকভাবে কম। সুদের হার অনেক বেশি। ধীরে ধীরে কুঋণের আকার বড় হচ্ছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো বড় অঙ্কের কুঋণে পড়ছে। আর করদাতাদের করের টাকায় পুনঃমূলধন দিয়ে ব্যাংকগুলোকে সচল রাখা হচ্ছে। করদাতাদের অর্থ এভাবে ব্যয় করা ইতিবাচক নয়। আর্থিক খাতের দুর্বলতা চিহ্নিত করে সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ করার জন্য ফাইন্যান্সিয়াল কমিশন গঠন করা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
বস্ত্র খাতের রপ্তানি পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, চলতি অর্থবছরে বস্ত্র খাতের কাঙ্ক্ষিত রপ্তানি আয়ে ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য এ ছয় মাসে ১৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে। এটা খুব কঠিন কাজ। তবে বর্তমানে সংস্কারমূলক কাজের সুফল আগামী অর্থবছরে পাওয়া যাবে।

জনশক্তি রপ্তানি প্রসঙ্গে ড. মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানি কমে যাচ্ছে। তাই এ বিষয়ে কূটনৈতিক পদক্ষেপ দরকার। এছাড়া প্রবাসী আয় বাড়ানোর পাশাপাশি রেমিট্যান্স আউটফ্লো কিভাবে কমানো যায় সে বিষয়ে নজর দেয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, ভারতে এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশ থেকে ৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স দেশটিতে আউটফ্লো হচ্ছে। এ বিষয়ে সরকারের ভেবে দেখা প্রয়োজন।