দেশব্যাপী লাগাতার অবরোধ: খালেদা জিয়া

আপডেট : ০৫ জানুয়ারি ২০১৫, ২২:০৫
 
পরবর্তী কর্মসূচি না দেয়া পর্যন্ত সারাদেশে টানা অবরোধের ডাক দিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। শনিবার রাত থেকে নিজ কার্যালয়ে অবস্থানরত খালেদা জিয়া সোমবার বিকেলে নয়াপল্টনে যাওয়ার উদ্দেশে গাড়িতে উঠেও পুলিশি বাধায় বের হতে না পেরে তালাবদ্ধ ফটকের ভেতরে থেকেই সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেছেন ‘অবরোধ অব্যাহত আছে, এটা চলবে। পরে সময়-সুযোগ  মতো আমরা শান্তিপূর্ণ সমাবেশ করবো।’ সকল দলের অংশগ্রহণে একটি অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের দাবিতে এই কর্মসূচি দেয়া হয়েছে জানিয়ে তা পালনের জন্য তিনি দেশবাসী ও দলীয় নেতা-কর্মীদের প্রতি আহ্বান জানান। অবরোধের ডাক দেয়ার পাশাপাশি নতুন নির্বাচন নিয়ে আলোচনায় বসার জন্যও তিনি সরকারের প্রতি পুনরায় আহ্বান জানিয়েছেন।
বিএনপি চেয়ারপারসন অবরোধের কথা বলার সময় পৃথকভাবে গুরুত্ব দিয়ে বিষয়টি বলেননি। তিনি তার অলিখিত বক্তব্যের ফাঁকেই কথাটি বলেন। পরে সাংবাদিকরা বিষয়টি স্পষ্ট হতে চাইলেও তিনি স্বাভাবিকভাবেই বলেন ‘যে কর্মসূচি চলছে, সেটি চলবে, অবরোধ অব্যাহত থাকবে।’ বিষয়টি নিয়ে স্পষ্ট হওয়ার জন্য পরে বিএনপি চেয়ারপারসনের প্রেস সচিব মারুফ কামাল খান সোহেলের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ইত্তেফাককে বলেন ‘বিএনপি চেয়ারপারসন যে অবরোধের কর্মসূচি দিয়েছেন তা তিনি পূর্বসিদ্ধান্ত অনুযায়ীই দিয়েছেন।’
খালেদা জিয়া অভিযোগ করে বলেন, ‘সরকার পুলিশ দিয়ে, গেটে তালা লাগিয়ে, রাস্তায় বালুর ট্রাক ফেলে রেখে আমাকে অবরুদ্ধ করে রেখেছে।’ তবে রবিবার সন্ধ্যায় ছাত্রলীগের এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ বিষয়ে বলেছেন ‘তাকে (খালেদা জিয়াকে) কেউ অবরুদ্ধ করে রাখেনি। তিনি যখন ইচ্ছা অফিস থেকে বাসায় চলে যেতে পারেন। আমি বলে দিয়েছি, কেউ তাকে বাধা দিচ্ছেও না, দেবেও না।’ প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যের আগে রবিবার রাতে বিবিসি রেডিওকে দেয়া এক সাক্ষাতকারেও খালেদা জিয়া বলেছেন ‘আমাকে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে।’
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য প্রসঙ্গে সাংবাদিকরা গতকাল প্রশ্ন করলে খালেদা জিয়া বলেন ‘এখানে যে পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছে, আমি আপনাদের (উপস্থিত সাংবাদিকদের উদ্দেশ্য করে) কাছেই জানতে চাই-এটা কি অবরুদ্ধ নয়? কেন আমাকে তালা মেরে রাখা হয়েছে। আজ পাঁচ জানুয়ারি কালো দিবস, এদিন গণতন্ত্র হত্যা করা হয়েছিল। এজন্য আমরা শান্তিপূর্ণ সমাবেশের কর্মসূচি দিয়েছি। এখানে পিপার স্প্রে, টিয়ারগ্যাস, এত পুলিশ কেন? আমি নয়াপল্টনে আমাদের পার্টি অফিসে যেতে চাইলাম, পুলিশ কেন আমাকে বের হতে দিল না? এটা কি প্রমাণ করে না, আমি অবরুদ্ধ। কি জন্য আমাকে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে, সেই কারণটিই আমার জানা দরকার।’
এসময় তিনি আরও বলেন ‘এখানে (নিজ কার্যালয়ে) থাকতে তো আমার কষ্ট হচ্ছে। কেন আমাকে এখানে থাকতে হবে? আমরা এখনও চাই, সরকার সব খুলে দেবে। যাতে আমরা শান্তিপূর্ণ সমাবেশ করতে পারি। সমাবেশ করে দেখাবো, জনগণ আমাদের সঙ্গেই আছে।’ বিকেল ৪টা ৩৮ মিনিট থেকে পাঁচটা বাজার কয়েক মিনিট আগ পর্যন্ত দেয়া বক্তব্য শেষে তিনি আবারও সোজা হেটে নিজ কার্যালয়ের ভেতরে চলে যান।
রাজধানীর গুলশানে নিজ কার্যালয়ের দোতলা থেকে গতকাল বিকেল চারটা বাজার কয়েক মিনিট আগে কালো পতাকা হাতে নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের উদ্দেশে রওনা দিতে নিচে নেমে গাড়িতে ওঠেন খালেদা জিয়া। এর আগে দুপুর সোয়া ১২টার দিকে কার্যালয়ের গেটে বাইর থেকে তালা লাগিয়ে দেয় পুলিশ।
খালেদা জিয়া গাড়িতে ওঠার পর দুই দফায় চালক বারবার হর্ণ বাজালেও পুলিশ তালা খুলেনি। ভেতর থেকে কালো পতাকা হাতে নিয়ে বিএনপির কয়েকজন মহিলা নেতা-কর্মী ফটকে বেশ কিছুক্ষণ ধাক্কাধাক্কি করেন ও সরকারবিরোধী স্লোগান দেন। বাহির থেকে ফটক ঠেলে ধরে পুলিশ। এ অবস্থার মধ্যে ঠিক ৪টায় বাহির থেকে ভেতরে পিপার স্প্রে করে পুলিশ।
খালেদা জিয়াসহ উপস্থিত নেতা-কর্মী, ব্যক্তিগত স্টাফ ও গণমাধ্যমের লোকজন স্প্রে আক্রান্ত হয়ে প্রচ্ল কাশি দিতে থাকেন। কেউ কেউ ম্যাচের কাঠি জ্বালিয়ে পিপার স্প্রে থেকে রক্ষা পাওয়ার চেষ্টা করেন। এই অবস্থায় ৩৮ মিনিট নিজের সাদা রঙ্গের প্রাডো গাড়ির ভেতরেই অবস্থান করেন খালেদা জিয়া।
এরপর গাড়ি থেকে বের হয়ে খালেদা জিয়া বলেন, ‘গণতন্ত্র এখন বন্দি। শুধু আমিই নয়, পুরো বাংলাদেশ এখন অবরুদ্ধ। এখানে পুলিশের হাতে যে ধরনের অস্ত্র-সস্ত্র দেখছি, যে জলকামান ও বালুর ট্রাক দেখছি-তাতে মনে হচ্ছে দেশে একটি যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছে। খুন, গুম ও অপহরণ চলছে। দেশে শান্তিপূর্ণ অবস্থা বিরাজ করছে না। এর দায়দায়িত্ব সম্পূর্ণভাবে সরকারের। এ সরকারের পায়ের তলায় মাটি নেই। তারা জনগণ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। পৃথিবীর কোনো সামরিক শাসকও এভাবে ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারেনি। এরাও পারবে না। অতীতেও দেখেছি ওই স্বৈরশাসকদের পরিণতি কত খারাপ হয়েছে। এদেরও পরিণতি ভালো হবে না।’
তিনি বলেন, ‘আমরা দেশে গণতন্ত্র চাই। জনগণের ভোটাধিকার ফিরিয়ে দিতে ও শান্তি আনতে আলোচনায় বসুন। একটা নির্বাচন করতে হবে। এটা শুধু আমাদের দাবি নয়, সারাবিশ্বই বলছে-সবার অংশগ্রহণে যেন একটি সুষ্ঠু নির্বাচন হয়। জনগণ দেশে নির্বাচিত সরকার দেখতে চায়। কারণ দেশে এখন কোনো বিরোধী দল নেই, সংসদে জনপ্রতিনিধিত্ব নেই। সেই নির্বাচন দিতে তারা (সরকার) ভয় পায়। কেন তাদের এত ভয়? এ সরকার এতই ভীত যে, মানুষের রক্ত নিয়ে তারা ক্ষমতা ধরে রাখতে চায়। কিন্তু এভাবে থাকা যাবে না। নির্বাচনের পরিবেশ কীভাবে হবে, তা আলোচনা করে ঠিক করা যেতে পারে। সেই পথে না গিয়ে সরকার হামলা, মামলা ও নির্যাতনের পথ বেছে নিয়েছে। বাংলাদেশকে একটি পুলিশি রাষ্ট্রে পরিণত করা হয়েছে। ভোট দিলে তাদের পরিণতি কী হবে, তা জানতে পেরেই তারা এটা করছে।’
তিনি বলেন, সরকার বলছে, আমাকে নিরাপত্তা দেয়ার জন্য নাকি এখানে এত পুলিশ-র্যাব বসানো হয়েছে। আমি যখন কোথাও যাবো তখন পুলিশ আমাকে নিরাপত্তা দেবে। কিন্তু তারা আমাকে অফিস থেকে বের হতে দিচ্ছে না, নয়াপল্টনে যেতে দিচ্ছে না। এটা কোন ধরনের নিরাপত্তা?
উপস্থিত পুলিশ সদস্যদের তিনি বলেন ‘সরকার এই পুলিশ বাহিনীর ইমেজ নষ্ট করে ফেলেছে। আমাদের ট্যাক্সের টাকায় পুলিশের বেতন হয়। পুলিশের সঙ্গে আমাদের কোনো বিরোধ নেই। অথচ সরকার তাদের দিয়ে মানুষকে গুলি করাচ্ছে। পুলিশ দিয়ে সবকিছু করানো ঠিক নয়। এত বাড়াবাড়ি ভালো নয়। এর পরিণতি তাদের একদিন ভোগ করতে হবে। সরকার এখন যত আইন করছে, একসময় এগুলো সবই অকার্যকর হয়ে যাবে।’
খালেদা জিয়া বলেন, আমরা শান্তিপূর্ণ সমাবেশ করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সরকার তা করতে দিচ্ছে না। সারাদেশে বহু মানুষ হতাহত হয়েছে। সরকারই ঢাকা থেকে সারাদেশকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে। বাহির থেকে ঢাকায় যানবাহন আসতে দেয়া হচ্ছে না। তারা সমাবেশ করতে ভয় পেয়েছে, সেজন্য আমাদেরও সমাবেশ করতে দিতে চায় না। ছাত্রলীগ-যুবলীগের গুন্ডারা ঢাকায় মিছিল করছে, অথচ আমাদের মিছিল করা নাকি অন্যায়। অন্যদের সব অধিকার কেড়ে নিয়ে নিজেরা একতরফাভাবে সবকিছু করবেন, এটা হতে দেয়া হবে না। এরমধ্যেও সারাদেশে আমাদের নেতা-কর্মীরা বিচ্ছিন্নভাবে মিছিল-বিক্ষোভ করেছে। এজন্য নেতা-কর্মীসহ দেশবাসীকে আমি ধন্যবাদ জানাই।