২০ জানুয়ারির মধ্যে বাড়তি টাকা ফেরত দেয়ার নির্দেশ

আপডেট : ০৭ জানুয়ারি ২০১৫, ০১:০৫

আসন্ন এসএসসি পরীক্ষা উপলক্ষে ফরম পূরণ বাবদ যেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সরকার নির্ধারিত ‘ফি’ এর চেয়ে বেশি টাকা নিয়েছে তাদের ২০ জানুয়ারির মধ্যে শিক্ষার্থীদের হাতে বাড়তি অর্থ ফেরত দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। বিচারপতি কাজী রেজা-উল হক ও বিচারপতি আবু তাহের মো. সাইফুর রহমানের ডিভিশন বেঞ্চ গতকাল মঙ্গলবার এই নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, শিক্ষা সচিব ও ১০টি শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান এই মর্মে আদেশ জারি করবেন যে, সমগ্র বাংলাদেশে যে সব বিদ্যালয় সরকার নির্ধারিত এসএসসি পরীক্ষার ফি এবং আইনগতভাবে আদায়যোগ্য ফি বহির্ভূত কোনো প্রকার বাড়তি ফি আদায় করেছে, সেসব ফি আগামী ২০ জানুয়ারির মধ্যে শিক্ষার্থীদের হাতে ফেরত দিবে। তা না হলে সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটি বাতিল বলে গণ্য হবে। একই সঙ্গে ওইসব ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যরা পরবর্তী তিন বছরের জন্য ব্যবস্থাপনা কমিটি ও গভর্নিং কমিটির নির্বাচনের জন্য অযোগ্য বিবেচিত হবেন।

গত ১৪ ডিসেম্বর হাইকোর্ট অতিরিক্ত ‘ফি’ আদায়কারী রাজধানীর ২০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান ও ম্যানেজিং কমিটির সভাপতিকে তলব করে। আদালতের আদেশ মোতাবেক হাইকোর্টে হাজির হন ভিকারুন্নিসা নুন স্কুল ও মতিঝিল আইডিয়াল স্কুলের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি বেসামরিক বিমান, পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন এমপি, উদয়ন স্কুলের সভাপতি ঢাবি’র উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, রাজউক স্কুল অ্যান্ড কলেজের চেয়ারম্যান শিক্ষা সচিব নজরুল ইসলাম খানসহ অধিকাংশ বিবাদী।
শুনানিতে মন্ত্রী রাশেদ খান মেননকে আদালত জিজ্ঞাসা করেন, সরকারি আইন লংঘন করে এভাবে অতিরিক্ত ফি নেয়া কি ঠিক? জবাবে মন্ত্রী বলেন, আমরা বোর্ডের নিয়মানুযায়ী ফি নিয়েছি। এ পর্যায়ে রাশেদ খান মেননের আইনজীবী শম রেজাউল করিম আদালতকে বলেন, স্কুলে নিয়মিত ক্লাসের বাইরে কোচিং ক্লাস নেয়া হয়। এজন্য অতিরিক্ত অর্থ নিতে পারবে বলে বোর্ডের সার্কুুলারে বলা আছে। আদালত বলেন, সর্বোচ্চ ১২শ’ টাকা এর বেশি তো নয়। আমাদের সময় তো কোচিং ক্লাস ছিল না। কেউ টেস্ট পরীক্ষায় অকৃতকার্য হলে শিক্ষকরা পাগল  হয়ে পড়তো, বাসায় গিয়ে পড়াতো। এ পর্যায়ে শম রেজাউল করিম বলেন, এটা ঠিক, তবে এখনকার পরিস্থিতি ভিন্ন। যাহোক, বোর্ড নোটিস দেয়ার পর অতিরিক্ত ‘ফি’ ফেরত দেয়া হয়েছে। আদালত বলেন, এটা তো শুধুমাত্র ২০টি স্কুলের প্রেক্ষাপট। আমরা সারা দেশের সকল স্কুলের অবস্থা জানাতে আদেশ দিয়েছিলাম। কিন্তু শুধুমাত্র ঢাকা ও বরিশাল বোর্ড আদালতে প্রতিবেদন দিয়েছে।
এ পর্যায়ে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল বিশ্বজিত রায় আদালতকে বলেন, ঢাকা শহরের এমনও স্কুল আছে যেখানে প্রত্যেক শিক্ষার্থীর কাছ থেকে ১৮ হাজার টাকা নিয়েছে। এটা পত্রিকায় আসেনি, অভিভাবকরা আমাদেরকে জানিয়েছেন। এ পর্যায়ে শিক্ষা সচিবকে উদ্দেশ্য করে আদালত বলেন, একটি আইনে সকল ক্ষমতা শিক্ষা বোর্ডকে দেয়া হয়েছে। কিন্তু আপনারা শিক্ষা বোর্ডকে পাশ কাটিয়ে মন্ত্রণালয় থেকে একের পর এক প্রজ্ঞাপন জারি করেন, এমন বহু নজির আছে। কেন এমন করেন? সচিব বলেন, আমি তো মাত্র তিন মাস এসেছি, সুনির্দিষ্ট করে বললে ভালো হয়।
সচিবকে উদ্দেশ্য করে আদালত বলেন, সৃজনশীল পরীক্ষা চালু করে এ বিষয়ে আদেশ জারি করেছে মন্ত্রণালয়, আপনারা এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করার কে? কাজটা তো বোর্ডের। সচিব বলেন, সৃজনশীল বিষয়টি রাষ্ট্রীয় নীতির বিষয়। এটি সরকারি সিদ্ধান্ত। আদালত শিক্ষা সচিবের উদ্দেশে আরো বলেন, আমরা যতটুকু জানি আপনি পদাধিকারবলে রাজউক ও রেসিডেন্সিয়াল স্কুলের সভাপতি। সচিব বলেন, আমি সভাপতি ঠিকই, কিন্তু তারা বেশি ‘ফি’ নিয়েছে বলে আমি জানি না। আদালত বলেন, গ্রামাঞ্চলের বেশিরভাগ স্কুল বেশি ‘ফি’ নিচ্ছে। সেখানকার অভিভাবকরা অর্থনৈতিকভাবে অসচ্ছল। এভাবে ফি নিলে তাদের অসহনীয় পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে। সচিব বলেন, সব কিছু মন্ত্রণালয়ের পক্ষে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থার উপর বিষয়টি নির্ভর করে। আদালত বলেন, আমরা আগে আদেশ দিয়েছি, কেউ যদি বর্ধিত ফি দিতে না পারে তাহলে তাকে পরীক্ষার ফরম পূরণে বাদ রাখতে পারবে না। আদালত বলেন, স্কুলে কোচিং-এর নামে বাড়তি টাকা নেয়া হচ্ছে। স্কুলে কোচিং করানো হলে বাইরে কোচিং সেন্টার কেন আছে?
আইনজীবী রেজাউল করিম বলেন, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় এক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের চারজন ভিসি। তখন সচিব বলেন, চারজন ভিসিই হাইকোর্ট থেকে স্টে অর্ডার নিয়ে শিক্ষা বাণিজ্য চালাচ্ছেন। আদালত বলেন, ম্যানেজিং কমিটিতে থাকার ব্যাপারে এত আগ্রহ কিসের? সচিব বলেন, টাকা পয়সা আছে তো তাই। আদালত এপর্যায়ে বলেন, কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান আদালতের নির্দেশ মানে না। আপনারা কি করেন? সচিব তার জবাবে বলেন, আমরা প্রজ্ঞাপন জারি করেছি, তারপরও যদি না মানে, তাহলে কি আর করার আছে! আদালত বলেন, আদেশ না মানলে তার শাস্তি কি। সচিব বলেন, কোনো শাস্তি নেই। এ বিষয়ে একটি সুনির্দিষ্ট আইন করা দরকার।
এরপর আগামী ২০ জানুয়ারির মধ্যে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায় করা অতিরিক্ত ফি ফেরত দেয়ার নির্দেশ দিয়ে তলবকৃতদের ব্যক্তিগত হাজিরা থেকে অব্যাহতি দেয় আদালত।
উল্লেখ্য, গত ১০ নভেম্বর একটি জাতীয় দৈনিকে ‘এসএসসি ফরম পূরণ শুরু: আটগুণ বাড়তি ফি আদায়’ শীর্ষক শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ওই প্রতিবেদন আমলে নিয়ে হাইকোর্ট রুল জারি করে। রুলে অতিরিক্ত ফি আদায় কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না এবং অতিরিক্ত ফি আদায়কারীদের বিরুদ্ধে কেন আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে না তা জানতে চাওয়া হয়।

এর আগে গত ১৪ ডিসেম্বর অধ্যক্ষ/প্রধান শিক্ষক ও ব্যবস্থাপনা কমিটির চেয়ারম্যানকে তলব করেছিলেন হাইকোর্ট। অতিরিক্ত ফি আদায়ের কারণে তাদের বিরুদ্ধে কেন আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না, তা আজ ৬ জানুয়ারি স্বশরীরে হাজির হয়ে কারণ ব্যাখ্যা করতে বলা হয়েছিল। এছাড়া অতিরিক্ত ফি আদায়কারী প্রতিষ্ঠানের একটি তালিকা আদালতে দাখিল করে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড। এর পরিপ্রেক্ষিতে তলবের আদেশ দেয়া হয়।