পত্রিকা অফিসে সন্ত্রাসী হামলার পরদিন আবার হামলা চালানো হলো ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে। গতকাল বৃহস্পতিবার পশ্চিম প্যারিসের একটি মসজিদে পরপর চারটি গ্রেনেড বিস্ফোরণ হয়। সেইসঙ্গে দক্ষিণ প্যারিসে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরে এক সন্ত্রাসী পুলিশ সদস্যদের ওপর ওপর হামলা চালায়। এতে গুলিবিদ্ধ হয়ে এক মহিলা পুলিশ নিহত হন। জখম হন আরও কয়েকজন পুলিশ সদস্য। এই ঘটনায় এক সন্দেহভাজনকে আটক করেছে পুলিশ। এদিনই ফ্রান্সের লিওঁ শহরে একটি রেস্তরাঁয় বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। তবে কোনও হতাহতের খবর অবশ্য পাওয়া যায়নি।
পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, ফরাসি পত্রিকার দফতরে জঙ্গি হামলার পরদিন ফের প্যারিসে আততায়ী হামলা চালানোর ঘটনায় গোটা শহরে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। অ্যাম্বুলেন্সের মাধ্যমে গুলির আঘাতে জখম পুলিশ অফিসারদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। হামলার পর মেট্রোতে চেপে পালিয়ে যায় সন্ত্রাসীরা। তবে এ হামলা ও গোলাগুলির সঙ্গে শার্লি এবদু পত্রিকা অফিসে হামলাকারীদের যোগসাজশ আছে কি না তা এখনো নিশ্চিত নন কর্মকর্তারা।
নোগুজের মেয়র পিয়্যা বোসোলেত্ত বলেছেন, ওই নারী পুলিশ তার এক সহকর্মীকে নিয়ে ট্রাফিক দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়েছিলেন। সে সময়ই একটি গাড়ি এসে থামে এবং এক ব্যক্তি গাড়ি থেকে বের হয়ে তাদের ওপর গুলি চালিয়ে পালিয়ে যায়। ওই ব্যক্তির হাতে মেশিনগানসহ একটি পিস্তল ছিল এবং সে বুলেট প্রুফ জ্যাকেট পরা ছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ। ফরাসি টিভিতে ঘটনাস্থলে একটি ভবনের বাইরে বেশ কয়েকজন পুলিশকে দেখা গেছে। শার্লি এবদুতে গুলির ঘটনায় নিহত ১২ জনের জন্য ফ্রান্সে জাতীয় শোক চলার মধ্যেই নতুন এ গুলির ঘটনা ঘটল। এতে করে উত্তেজনা আরো বাড়ল।
ইউরোপ জুড়ে সতর্কতা : ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে ব্যঙ্গ সাপ্তাহিক শার্লি হেবদো কার্যালয়ে নৃশংস হত্যাকান্ডের পর ইউরোপীয় ইউনিয়ভুক্ত দেশগুলোর সরকারগুলো নিরাপত্তা পদক্ষেপ পর্যালোচনা করতে তাদের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সঙ্গে বৈঠক করছে। ভারী অস্ত্র সজ্জিত হয়ে ‘আল্লাহু আকবর’ ধ্বনি দিয়ে প্যারিসে সাপ্তাহিক ব্যঙ্গ পত্রিকার অফিসে এ ধরনের হামলা ফ্রান্সের কয়েক দশকের ইতিহাসে সবচেয়ে নৃশংস। এ ঘটনা ইউরোপে নতুন করে ইসলামপন্থী হামলার আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। প্যারিসে শার্লি হেবদো সদর দফতরে হামলায় ১২ জন নিহত হওয়ার পর ফ্রান্স সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থা ‘অ্যাটাক অ্যালার্ট’ পর্যায়ে উন্নীত করেছে।
স্বররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যাঞ্জেলিনো আলফানো প্যারিসের ‘এই অতি মারাত্মক হামলার পরবর্তীতে সন্ত্রাসী হামলার ঝুঁকির বিষয়টি নিবিড়ভাবে খতিয়ে দেখতে সিনিয়র গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা উপদেষ্টাদের এক বৈঠক ডেকেছেন।’ স্পেনের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ফার্নান্দেজ ডিয়াজও প্যারিস হামলা পর্যালোচনা করতে সিনিয়র সন্ত্রাস দমন কর্মকর্তাদের বৈঠক ডেকেছেন। লন্ডনে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনের সাথে কথা বলেছেন। তবে যুক্তরাজ্যে সতর্কাবস্থা এমনিতেই ‘মারাত্মক’ পর্যায়ে থাকায় তা আর বাড়ানো হয়নি। বেলজিয়াম সতর্কাবস্থা অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নিলেও সরকারি সূত্র জানায়, কিছু কিছু স্থানের আশ-পাশে নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে।
ডেনমার্কের যে পত্রিকাটি ২০০৫ সালে হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর কার্টুন ছাপিয়ে সারা বিশ্বে প্রতিবাদ বিক্ষোভ উস্কে দিয়েছিল তারাও অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণের কথা জানিয়েছে। উল্লেখ্য, ফ্রান্সের ব্যঙ্গ সাপ্তাহিক শার্লি হেবদো এই বিতর্কিত কার্টুনটি পুনঃপ্রকাশ করেছিল।
ফ্রান্সে পত্রিকা অফিসে হামলার ঘটনায় গ্রেফতার ৭
সন্দেহভাজন দুই ভাইয়ের খোঁজে পুলিশ
ফ্রান্সের একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা অফিসে ইসলামপন্থীদের হামলার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে পুলিশ সাত জনকে আটক করেছে। পুলিশ এই ঘটনায় দুই হত্যাকারী ভাইয়ের সন্ধানে ব্যাপক তল্লাশী অভিযান শুরু করেছে। ওই ঘটনায় ১২ জন নিহত হয়। বৃহস্পতিবার নাম প্রকাশে অস্বীকৃতি জানিয়ে এক বিচারিক সূত্র প্রধানমন্ত্রী ম্যানুয়েল ভালসের বক্তব্যকে নিশ্চিত করে জানান, পুলিশ কর্মকর্তারা হত্যাকারী দুই ভাইয়ের ঘনিষ্ঠ এই ৭ পুরুষ ও নারীকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে।
তাদেরকে কোথা থেকে আটক করা হয়েছে সে সম্পর্কে কিছু জানানো হয়নি। এর আগে প্রধানমন্ত্রী আরটিএল রেডিওকে জানান, সন্দেহভাজন দুই ভাই এখনো পালিয়ে বেড়াচ্ছে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তাদের সম্পর্কে অবহিত রয়েছে। বুধবারের হামলার ঘটনার আগেই তাদেরকে যে অনুসরণ করা হচ্ছিল সে ব্যাপারে ‘কোন সন্দেহ নেই’। বুধবার সকালে মুখোশ ও কালো পোশাক পরা দুজন লোক কালাশনিকভ রাইফেল নিয়ে পত্রিকা অফিসে ঢুকে গুলি ছুঁড়তে শুরু করে। এ সময় পত্রিকাটির সম্প্রাদকীয় বৈঠক চলছিল। এ সময় ফ্রান্সের অত্যন্ত স্পষ্টভাষী কয়েকজন সাংবাদিক ও দুই পুলিশ কর্মকর্তা নিহত হন। হামলার পর হামলাকারীরা গাড়িতে করে পালিয়ে যায়। পুলিশ জিহাদি শরিফ কোউয়াচি(৩২) ও তার ভাই সাঈদের (৩৪) বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে। ২০০৮ সালে ইরাকে যোদ্ধা পাঠানোর চক্রের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে শরিফ দন্ডিত হয়। তারা উভয়েই প্যারিসে জন্ম গ্রহণ করে।