বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস আজ

আপডেট : ১০ জানুয়ারি ২০১৫, ১০:৩৪

আজ ঐতিহাসিক ১০ জানুয়ারি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস। দীর্ঘ ৯ মাসের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে বিজয় অর্জনের পর ১৯৭২ সালের এই দিনে পাকিস্তানে দীর্ঘ কারাবাস শেষে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে ফিরে আসেন বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা, স্বাধীনতা সংগ্রামের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু। বাঙালি জাতির মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাসে বঙ্গবন্ধুর এ স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের ঘটনা বিশেষ তাত্পর্যপূর্ণ। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে এ দেশ স্বাধীন হলেও প্রকৃতপক্ষে জাতির পিতার দেশে ফিরে আসার মধ্য দিয়েই বাঙালির বিজয় পূর্ণতা লাভ করে। স্বাধীনতার মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধু নিজেই তার এ স্বদেশ প্রত্যাবর্তনকে আখ্যায়িত করেছিলেন ‘অন্ধকার হতে আলোর পথে যাত্রা’ হিসেবে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এই দিনটি অবিস্মরণীয় ও ঐতিহাসিক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে।

১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক নির্বাচনে বাংলার মানুষের ভোটে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। কিন্তু পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী আওয়ামী লীগের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরে গড়িমসি করতে থাকে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে আলোচনার আড়ালে পাকিস্তানের সামরিক জান্তা সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পরও পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর ক্ষমতা হস্তন্তরে   অনীহার কারণে বাংলার মুক্তিকামী মানুষ ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে বঙ্গবন্ধু ঘোষণা দিয়েছিলেন, ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে অসহযোগ আন্দোলন চলাকালে ২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী তাদের পূর্বপরিকল্পিত বাঙালি নিধনযজ্ঞের নীলনকশা ‘অপারেশন সার্চলাইট’ বাস্তবায়ন শুরু করে। লাখ লাখ নিরীহ বাঙালি জনগণের ওপর আক্রমণ ও গণহত্যা চালায় তারা। এ প্রেক্ষাপটে ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। এ ঘোষণার মাধ্যমে তিনি সর্বস্তরের জনগণকে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ লড়াই শুরু করার ডাক দেন। স্বাধীনতা ঘোষণার পর পাকিস্তানিরা বঙ্গবন্ধুকে তার ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাসা থেকে গ্রেফতার করে তদানীন্তন পশ্চিম পাকিস্তানের মিয়ানওয়ালী কারাগারে আটক রাখেন। এ কারাগারের নির্জন প্রকোষ্ঠে কাটে বঙ্গবন্ধুর নয় মাস ১৪ দিনের কঠিন কারাজীবন। কারাগারে বন্দী করা হলেও বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে তার নামেই চলে মুক্তিযুদ্ধ। অবরুদ্ধ বাংলাদেশে যখন পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে সর্বাত্মক প্রতিরোধ যুদ্ধ চলছে, ঠিক তখন পশ্চিম পাকিস্তানে প্রহসনের বিচারে বঙ্গবন্ধুকে ফাঁসির আদেশ দেয়া হয়। কারাগারের যে সেলে তাকে রাখা হয়েছিল, সেই সেলের পাশে কবর পর্যন্ত খোঁড়া হয়। কিন্তু বাঙালির স্বাধীনতা, মুক্তির প্রশ্নে ফাঁসির আসামি হয়েও বঙ্গবন্ধু ছিলেন অবিচল, আপোসহীন।
এক সাগর রক্তের বিনিময়ে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাঙালি জাতি বিজয়ের লাল সূর্য ছিনিয়ে আনে। তবে তখনো জাতির মনে ছিল না স্বস্তি, বিজয়ের আনন্দ। পাকিস্তানের কারাগারে বন্দী জাতির পিতার ভাগ্যে কি আছে এ নিয়ে এ ভূখণ্ডের প্রতিটি মানুষ ছিল বিচলিত, আতঙ্কিত। কারাবন্দি বঙ্গবন্ধুর মুক্তির দাবিতে বিশ্বব্যাপী প্রবল জনমত গড়ে উঠেছিল। স্বাধীনতা লাভের পর নতুন রাষ্ট্র বাংলাদেশও বিশ্ববাসীর কাছে তার নেতার নিঃশর্ত মুক্তি দাবি জানালে বিশ্বনেতৃবৃন্দও এ ব্যাপারে সোচ্চার হন। অবশেষে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে পাকিস্তান সরকার বাধ্য হয়ে বঙ্গবন্ধুকে সসম্মানে মুক্তি দেয়। ১০ জানুয়ারি বিজয়ীর বেশে স্বদেশে ফিরে আসেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ এই বাঙালি। বাঙালি জাতির মহান এক বিজয়ের ফলেই বঙ্গবন্ধু নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে ফিরে আসেন। ৮ জানুয়ারি পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর লন্ডন-দিল্লী হয়ে তিনি ঢাকায় পৌঁছেন ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব হানাদারমুক্ত স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে আসেন বিজয়ের মালা পরে। সেদিন বাংলাদেশে ছিল এক উত্সবের আমেজ। গোটা বাঙালি জাতি রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করছিল কখন তাঁদের প্রিয় নেতা, স্বাধীন বাংলার মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব স্বাধীন দেশের মাটিতে আসবেন। পুরো দেশের মানুষই যেন জড়ো হয়েছিল তেজগাঁওস্থ ঢাকা বিমানবন্দর এলাকায়। বিমানবন্দর থেকে ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দান (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) পর্যন্ত রাস্তায় জনতার ঢল নামে। বন্দীর নাগপাশ ছিন্ন করে বঙ্গবন্ধু বিজয়ের বেশে নামলেন বিমান থেকে। পা রাখলেন লাখো শহীদের রক্তস্নাত স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে। গোটা জাতি সেদিন হর্ষধ্বনি দিয়ে তেজোদীপ্ত ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে তাদের প্রিয় নেতাকে স্বাগত জানায়।
স্বাধীন প্রিয় বাংলাদেশের মাটিতে পা রেখেই আবেগআপ্লুত হয়ে পড়েন বঙ্গবন্ধু। দীর্ঘ ৯ মাস পাক হানাদার বাহিনী ও তাদের এ দেশীয় দোসরদের গণহত্যার সংবাদ শুনে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন তিনি। সেদিন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে লাখো জনতার উদ্দেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ঘোষণা দেন ‘রক্ত দিয়ে হলেও আমি বাঙালি জাতির এই ভালোবাসার ঋণ শোধ করে যাব।’ কথা রেখেছেন জাতির পিতা। হিংস্র পাক হানাদাররা যার গায়ে আঁচড় দেয়ারও সাহস দেখাতে পারেনি, স্বাধীন দেশে বাঙালি নামক একশ্রেণীর কুলাঙ্গার-বিশ্বাসঘাতকের হাতে তাঁকে জীবন দিতে হয়েছে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে নিজের বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে বঙ্গবন্ধু তাঁর কথা রেখে গেছেন।
রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর বাণী
বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণী দিয়েছেন। রাষ্ট্রপতি তাঁর বাণীতে বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন, স্মরণীয় এই দিনে আমি গভীর শ্রদ্ধার সাথে তাঁকে স্মরণ করি। তিনি বলেন, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতির মুক্তির দূত, মহান স্বাধীনতার ঘোষক, রাষ্ট্রনায়ক এবং বিশ্বের নিপীড়িত-শোষিত-বঞ্চিত জনগণের মুক্তির কণ্ঠস্বর ও অনুপ্রেরণার উত্স। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে সুখীসমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে দলমত নির্বিশেষে সকলকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান রাষ্ট্রপতি।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর বাণীতে বলেন, বাঙালির মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাসে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি এক ঐতিহাসিক দিন। পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে এদিন স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান। স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেই তিনি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে পুনর্গঠনে সর্বশক্তি নিয়োগ করেন। ভারতীয় মিত্রবাহিনীর সদস্যদের দ্রুত দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। তাঁর আহ্বানে সাড়া দিয়ে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং বন্ধু দেশসমূহ দ্রুত বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান করে। বাংলাদেশ ১৯৭৪ সালে ওআইসির সদস্য হয়। বঙ্গবন্ধুর ঐন্দ্রজালিক নেতৃত্বে অতি অল্পদিনের মধ্যেই বিশ্বদরবারে বাংলাদেশের দৃঢ় অবস্থান তৈরি হয়। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ঘাতকরা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার মাধ্যমে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রাকে স্তব্ধ করে দেয়। বন্দুকের জোরে ক্ষমতা দখলকারীরা গণতন্ত্র হত্যা করে। সংবিধানকে ক্ষত-বিক্ষত করে। রুদ্ধ করে দেয় প্রগতি ও উন্নয়নের ধারা। তিনি বলেন, অনেক সংগ্রাম আর ত্যাগ-তিতিক্ষার বিনিময়ে দেশে আজ গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। জনগণের জীবনমানের ইতিবাচক পরিবর্তন হয়েছে। আমাদের মাথাপিছু আয় প্রায় ১২০০ ডলারে উন্নীত হয়েছে। দেশবাসীর উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আসুন, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে আমরা ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত অসাম্প্রদায়িক, সমৃদ্ধ ও শান্তিপূর্ণ বাংলাদেশ গড়ে তুলি। তিনি বলেন, কোনো অপশক্তি যাতে দেশের উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রার এ ধারাকে ব্যাহত করতে না পারে, জাতির পিতার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসে এই হোক আমাদের অঙ্গীকার।
কর্মসূচি
যথাযোগ্য মর্যাদায় স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস পালনে আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন সংগঠন বিস্তারিত কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। আওয়ামী লীগের কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে সকাল সাড়ে ৬টায় দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়, বঙ্গবন্ধু ভবনসহ সারাদেশে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন, সকাল ৭টায় বঙ্গবন্ধু ভবনে জাতির পিতার প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন এবং আগামী ১২ জানুয়ারি সোমবার দুপুর ২টায় ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জনসভা। জনসভায় প্রধান অতিথি থাকবেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সভাপতিত্ব করবেন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী। বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী ও জাতীয় নেতৃবৃন্দ জনসভায় অংশগ্রহণ করবেন। আওয়ামী লীগ ছাড়াও বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন দিবসটি পালনে নিয়েছে বিস্তারিত কর্মসূচি।
গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় চট্টগ্রামের মেজবান
গোপালগঞ্জ প্রতিনিধি: চট্টগ্রামের রাউজানবাসী স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসে শনিবার গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় বিশাল আকারের মেজবান আয়োজন করতে যাচ্ছে ।
রেলপথ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি এবিএম ফজলে করিম চৌধুরী এমপির নেতৃত্বে এ মেজবান অনুষ্ঠিত হবে ।
১০ জানুয়ারি শনিবার সকাল থেকে সরকারি শেখ মুজিবুর রহমান বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ মাঠে খাওয়ার আয়োজন করা হবে ।

মেজবান আয়োজন সম্পর্কে এবিএম ফজলে করিম চৌধুরী এমপির পার্সোনাল অফিসার মো. নিছারুল বসার জানান, বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস উপলক্ষে প্রথমারের মতো রাউজানবাসীর উদ্যোগে মেজবান আয়োজন করতে যাচ্ছি। প্রায় ৫০ হাজার লোকের জন্য এ আয়োজন। ইতিমধ্যে চট্টগ্রাম থেকে বাবুর্চিদের একটি টিম টুঙ্গিপাড়ায় পৌঁছে গেছে। আনা হয়েছে গরু। মেজবান আয়োজনকে কেন্দ্র করে টুঙ্গিপাড়া বঙ্গবন্ধুর মাজার এলাকায় সাজ সাজ রব চলছে। বঙ্গবন্ধুর শাহাদাতের ৩৯ বছর হিসেবে ৩৯ বার কোরআন খতম দেয়া হবে। এজন্য আলেমদের আগে থেকেই প্রস্তুত রাখা হয়েছে।