অগ্নিদগ্ধদের আহাজারি

আপডেট : ১১ জানুয়ারি ২০১৫, ০১:১৩

দেশে পুড়ে যাওয়া রোগীদের একমাত্র পূর্ণাঙ্গ চিকিত্সা সেবাকেন্দ্র ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিট। বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলের অবরোধে রাজধানী ও বিভিন্ন এলাকায় পিকেটারদের পেট্রোলবোমায় ও যানবাহনে অগ্নিসংযোগে দগ্ধ হয়ে নারী-পুরুষরা এখানে ভর্তি হচ্ছেন। এছাড়া মিল-কারখানা, বাসা-বাড়িসহ বিভিন্নভাবে অগ্নিকান্ডে দগ্ধ রোগীদের বার্ন ইউনিটে স্থানান্তর করা হয়। ৩০০ বেডের এ বার্ন ইউনিটে প্রতিদিন চিকিত্সাধীন রোগী  থাকে ৫ শতাধিক। আর বহির্ির্বভাগে প্রতিদিন চিকিত্সার জন্য আসেন ২৫০ থেকে ৩০০ জন পোড়া-রোগী।

সীমিত সংখ্যক চিকিত্সক, নার্স ও যন্ত্রপাতি দিয়ে এ বিপুল পরিমান রোগীদের সেবা দিতে টালমাটাল অবস্থায় আছে ইউনিটটি। এ চিত্র দেখলে পরিস্থিতি যে কী যে দুর্বিষহ তা সহজেই বোঝা যায়। এ পরিস্থিতি সামাল দেয়া ডাক্তার-নার্সদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়েছে। কিন্তু পোড়া রোগীদের দুঃসহ আহাজারি কেউ শোনে না। তাদের জীবন নিয়ে ছিনিমিন খেলছে সকলেই। জীবন বাঁচানোর জন্য কাজের তাগিদে রাস্তায় নামলে পিকেটারদের নিক্ষিপ্ত পেট্রোল বোমা কিংবা যানবাহনে অগ্নিসংযোগের কবলে পড়ে দগ্ধ হন তারা। সীমিত ব্যবস্থাপনার মধ্যে হাসপাতালে গিয়ে আরেকদফা চরম দুর্বিসহ পরিস্থিতিতে পড়তে হয় তাদের।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৫০ বেডের বার্ন ইউনিটটি ২০০৩ সালে চালু হয়। ঐ সময় ৫০ বেডের এ ইউনিটে প্রতিদিন রোগী থাকত দুই শতাধিক। ২০১১ সালে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হরতাল-অবরোধে দগ্ধ হয়ে চিকিত্সাধীন রোগীদের দেখতে গিয়েছিলেন বার্ন ইউনিটে। ঐ সময় পোড়া রোগীদের চিকিত্সার করুণ অবস্থা দেখে ৫০ বেডের বার্ন ইউনিটকে ১০০ বেডে উন্নীত করার নির্দেশনা দেন প্রধানমন্ত্রী। সঙ্গে জনবলসহ অন্যান্য আধুনিক সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করারও ঘোষণা দেন। প্রতিদিন পোড়ারোগী আশংকাজনক হারে বাড়তে থাকে। চাহিদার তুলনায় বার্ন ইউনিটের সুযোগ-সুবিধা একেবারেই অপ্রতুল। এ অবস্থার মধ্যে ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১০০ বেডের বার্ন ইউনিটটিকে ৩০০ বেডে উন্নীত করার ব্যবস্থা করেন। ৩০০ বেডের বার্ন ইউনিট হলেও এর জনবল ১০০ বেডের। পোড়া রোগীদের মধ্যে পরবর্তীতে ৯৮ ভাগের প্লাস্টিক সার্জারির প্রয়োজন হয়। পোড়া রোগীদের চিকিত্সাসেবার বিশেষজ্ঞরা হলেন প্লাস্টিক সার্জনরা। প্রধানমন্ত্র্ত্রী পোড়া রোগীদের চিকিত্সা সেবা সকল সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং জেলা সদর হাসপাতালেও চালু করার নির্দেশনা দেন। যাতে করে পোড়া রোগীদের দীর্ঘ সময় ব্যয় করে ঢাকায় আসতে না হয়। তারা যেন হাতের কাছে সুচিকিত্সা পায়। তাই আলাদা বার্ন ইউনিট করার এ দায়িত্ব দেন পোড়া রোগীদের সেবায় নিবেদিত প্রাণ ও এই বার্ণ ইউনিটের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ডা. সামন্ত লাল সেনকে। ঢাকার বাইরে শুধু চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, সিলেট, রংপুর ও রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বার্ন ইউনিট রয়েছে। এছাড়া আর কোনো সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কিংবা জেলা সদর হাসপাতালে বার্ন ইউনিট নেই।
ডাক্তার সামন্ত লাল সেন বলেন, এ মুহূর্তে ২৯টি সরকারি মেডিকের কলেজ হাসপাতাল এবং জেলা সদর হাসপাতালে বার্ন ইউনিট চালু করলে ১৫৫২ জন প্লাস্টিক সার্জনের প্রয়োজন। সঙ্গে জুনিয়র ডাক্তার ও অন্যান্য জনবল প্রয়োজন। বর্তমানে দেশে ৫১ জন প্লাস্টিক সার্জন রয়েছেন। এদের মধ্যে ১৬ জন ঢামেক হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে রয়েছেন। এ ৫১ জন সার্জন দিয়ে শুধু ঢামেক হাসপাতালের বার্ন ইউনিটেই চিকিত্সা সেবা দেয়া দুষ্কর। ঢাকার বাইরে বার্ন ইউনিট চালু করার আগে অভিজ্ঞ জনবল তৈরি করা অত্যাবশ্যক।  জরুরিভিত্তিতে অভিজ্ঞ জনবল তৈরি করতে হলে উক্ত বার্ন ইউনিটটিকে ইনস্টিটিউটে পরিণত করার বিকল্প নেই।
ঢামেক হাসপাতাল বার্ন ইউনিটে বর্তমানে ১৬ জন প্লাস্টিক সার্জন রয়েছেন। ১৩ জন ওএসডিতে মেডিকেল অফিসার ও ২৯ জন স্নাতকোত্তর পর্যায়ের ছাত্রছাত্রী। এ সীমিত চিকিত্সক দিয়ে শুধুমাত্র বার্ন ইউনিটের বহির্বিভাগের রোগীদের চিকিত্সা দেয়াই কষ্টকর। এছাড়া সেখানে দৈনিক চিকিত্সাধীন থাকে ৫ শতাধিক রোগী। তাদের চিকিত্সা ও অপারেশনে এ সব সার্জন ও চিকিত্সকদের করতে হয়। আধুনিক অপারেশন থিয়েটার, ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট (আইসিইউ) এবং পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ড- সবই বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে করা। তাও চাহিদার তুলনায় সীমিত। এ সীমিত ব্যবস্থার মধ্যেও বেচেঁ যাচ্ছে শতশত পোড়ারোগী। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঢামেক হাসপাতাল বার্ন ইউনিটটিকে ইনস্টিটিউটে রুপান্তর করার জরুরি নির্দেশনা দেন। এ নির্দেশনা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় হয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় গেলে শুরু হয় ফাইল চালাচালি। পাশাপাশি নানা তথ্য জানতে চাওয়া হয়। যে ধরণের তথ্য কতিপয় আমলা চেয়েছেন বার্ন ইউনিট সম্পর্কে তা দেখে মনে হয় না, বার্ন ইউনিট সম্পর্কে তাদের বিন্দুমাত্র ধ্যান-ধারণা রয়েছে।
চিকিত্সাধীন পোড়ারোগীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে ইত্তেফাকের এ প্রতিনিধিকে জানান, ঐ সব আমলারা নিজেরা কিংবা তাদের পরিবারের কোন সদস্য পোড়া গেলে, সর্দি-কাশি হলে চলে যান বিদেশে। একইভাবে সরকারের নীতিনির্ধারক মহলের সদস্যরাও চিকিত্সার জন্য যান বিদেশে। তাদেরতো এ দেশে চিকিত্সা ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে মাথা ঘামানোর কথা নয়। এরপর আমলাদের মধ্যে রয়েছে রাজনৈতিক ভিন্ন মতাদর্শ। ফাইলতো তাদের কাছেই বন্দি থাকবে। আমাদের মত নিরীহ দিনমজুর পোড়ে গিয়ে চিকিত্সার অভাবে মারা গেলে তাদের কিছু আসে যায় না।
বার্ন ইউনিটের এক জরিপে দেখা যায়, প্রতি বছর দেশের নয় লাখ মানুষ আগুনে দগ্ধ হয়। পোড়ারোগীদের চিকিত্সাসেবা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। তারা সুস্থ হলে পরবর্তীতে পোড়াস্থানে সাদাদাগ, অঙ্গ বাাঁকা, বিকলাঙ্গ, ক্ষতস্থানে চুলকানিসহ নানা উপসর্গ দেখা দেয়। এ কারণে পোড়ারোগীরা সুস্থ হলেও প্লাস্টিক সার্জারি ছাড়া স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার সম্ভাবনা কম। এ চিকিত্সাও অত্যন্ত ব্যয়বহুল। যা নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের পক্ষে বহন করা সম্ভব নয় বলে জানান চিকিত্সকরা।

অবরোধের পঞ্চমদিনে পেট্রোলবোমা ও যানবাহনে অগ্নিসংযোগে ১৩ জন দগ্ধকে ঢামেক বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়। তাদের মধ্যে প্রাইভেটকার চালক আবুল কালাম (২৫), ট্রাকচালক আল মাসুদ ও রিকশা চালক অমূল্য বর্মনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। বার্ন ইউনিটের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম বলেন, বর্তমান বার্ন ইউনিটে সীমিত জনবল দিয়েই চিকিত্সা সেবা চালিয়ে যাচ্ছেন তারা। কোনো রোগীকে চিকিত্সা সেবা থেকে বঞ্চিত করা হয় না। প্রতিবছর এই ইউনিটের প্লাস্টিক সার্জারির স্নাতকোত্তর কোর্সে তিন ছাত্রছাত্রী ভর্তি হয়। এভাবে ১০০ বিশেষজ্ঞ তৈরি করতে ৩৩ বছর লাগবে। যেখানে এ মুহূর্তে প্রয়োজন এক হাজার ৫৫২ জন প্লাস্টিক সার্জন। ইনস্টিটিউট হলে প্রতিবছর শতাধিত বিশেষজ্ঞ জনবল তৈরি করা সম্ভব হবে।