দাম বাড়ছে গ্যাসের

আপডেট : ১৪ জানুয়ারি ২০১৫, ১০:০২

দাম বাড়ছে গ্যাসের। চলতি মাসে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাবে গণশুনানির পর পরই আগামী ২ ফেব্রুয়ারি শুরু হচ্ছে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাবে গণশুনানি। গ্যাস বিতরণ ও সঞ্চালন কোম্পানিগুলোর দেয়া দাম বাড়ানোর প্রস্তাবের উপর শুনানি হবে। ৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত টানা চারদিন শুনানি শেষে গ্যাসের নতুন দাম নির্ধারণ করবে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। আবাসিক খাতে গ্যাসের দাম সর্বোচ্চ ১২২ দশমিক ২২ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব দেয়া হয়েছে।

বিইআরসি সদস্য ড. সেলিম মাহমুদ বলেছেন, গণশুনানির মাধ্যমে গ্যাসের দাম বাড়ানোর যৌক্তিকতা যাচাই-বাছাই করা হবে। এরপরই নতুন দাম নির্ধারণ করা হবে। প্রস্তাব অনুযায়ী গ্যাসের দাম বাড়ানো হলেও আন্তর্জাতিক দরের চেয়ে অনেক কম থাকবে। তাই ধীরে ধীরে গ্যাসের মূল্য যৌক্তিক পর্যায়ে নিয়ে আসতে হবে। তবে দাম বাড়ানোর সব প্রক্রিয়া মেনেই সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। গণশুনানিতে অংশগ্রহণের জন্য আগ্রহী ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা সংস্থার প্রতিনিধিদের ২১ জানুয়ারির মধ্যে আবেদন করতে হবে বলে বিইআরসি জানিয়েছে।
উল্লেখ্য, গত বছরের ৩০ অক্টোবর পেট্রোবাংলা সকল বিতরণ কোম্পানির পক্ষে গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) সে প্রস্তাব যথাযথ হয়নি বলে গ্যাস বিতরণ সব কোম্পানিকে আলাদাভাবে প্রস্তাব দিতে বলে। এরপর নভেম্বরে বিইআরসিতে বিতরণ কোম্পানিগুলো আলাদা আলাদাভাবে গ্যাসের দাম বাড়ানোর এ প্রস্তাব দিয়েছে। এখন সেই প্রস্তাবের উপর শুনানি অনুষ্ঠিত হবে। গ্যাস বিতরণ পাঁচ কোম্পানি তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লি., জালালাবাদ গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড, বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি, কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি এবং সুন্দরবন গ্যাস কোম্পানি গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে।
আবাসিক খাতে এক চুলার গ্যাসের দাম ৪০০ থেকে বাড়িয়ে ৮৫০ টাকা, দুই চুলা ৪৫০ থেকে বাড়িয়ে এক হাজার টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া আবাসিক গ্রাহকদের মধ্যে যারা মিটার ব্যবহার করেন, তাদের প্রতি ইউনিট (এক হাজার ঘনফুট) গ্যাসের দাম ১৪৬ টাকা ২৫ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২৩৫ টাকা করার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে।
বর্তমানে বিদ্যুেকন্দ্রের জন্য প্রতি ইউনিট গ্যাসের দাম ৭৯ টাকা ৮২ পয়সা। নতুন প্রস্তাবনায় পাঁচ দশমিক ২৪ শতাংশ বাড়িয়ে ৮৪ টাকা নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে। এছাড়া সার কারখানায় নয় দশমিক ৭১ শতাংশ বাড়িয়ে ৮০ টাকা, ক্যাপটিভ পাওয়ারে ১০২ দশমিক ৯৪ শতাংশ বাড়িয়ে ২৪০ টাকা ও শিল্পে ৩২ দশমিক ৬ শতাংশ বাড়িয়ে ২২০ টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। সিএনজি স্টেশনে গ্যাসের দাম ৩৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। এতে গ্রাহক পর্যায়ে ৩০ টাকার পরিবর্তে প্রতি ঘনমিটারের দাম পড়বে ৪০ টাকা। আর সিএনজি ফিলিং স্টেশনে পাইকারি দাম ২৩ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩২ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া বাণিজ্যিক গ্রাহকদের ক্ষেত্রে ২৬৮ টাকা শূন্য পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৩৫০ টাকা ও চা বাগানে ১৬৫ টাকা ৯১ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২০০ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
সারাদেশে আবাসিক গ্রাহক গ্যাস ব্যবহার করেন মোট উত্পাদনের মাত্র ১১ শতাংশ। শিল্পে ব্যবহার হয় ৩৩ শতাংশ (ক্যাপটিভ বিদুুত্সহ), বিদ্যুতে ৪২ শতাংশ, সিএনজিতে ৬ শতাংশ ও সার কারখানায় ৭ শতাংশ। বাকি গ্যাস ব্যবহার হয় চা বাগান ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে।
সব ধরনের গ্রাহকের জন্য গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব করা হলেও সবচেয়ে বেশি বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে আবাসিক খাতের গ্রাহকদের জন্য। মূলত আবাসিক খাতে গ্যাসের ব্যবহার নিরুত্সাহিত করতে দাম দ্বিগুণ করার প্রস্তাব করা হচ্ছে। সর্বশেষ ২০০৯ সালের আগস্টে বিইআরসি সব ধরনের গ্যাসের দাম ১১ দশমিক ২২ শতাংশ বাড়ায়। এছাড়া ২০১১ সালে দুই দফা সিএনজির দাম বাড়িয়ে প্রতি ঘনমিটার ৩০ টাকা করা হয়। এরপর ২০১২ সালের ২০ মে পেট্রোবাংলা বিইআরসিতে আবাসিক গ্রাহকদের ছাড়া অন্য খাতগুলোতে গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু এ খাতে লোকসান নেই বলে বিইআরসি সে সময় দাম বাড়ানোর প্রস্তাবে সম্মতি দেয়নি। তবে এখন আগের চেয়ে পেট্রোবাংলার মুনাফা বাড়লেও গ্যাসের দাম বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
দাম বাড়ানো প্রসঙ্গে বাংলাদেশ সিএনজি ফিলিং স্টেশন এন্ড কনভারসন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের উপদেষ্টা জাকির হোসেন নয়ন গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, গ্যাসের দাম বৃদ্ধি করা হলে সিএনজি চালিত গণপরিবহন আবার ডিজেলে ফিরে যাবে। এতে করে আবার পরিবেশ বিপর্যয় ঘটবে। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এছাড়া সিএনজি ব্যবহার নিরুত্সাহিত করা হলে এ শিল্প খাতটি ধ্বংস হয়ে যেতে পারে বলে তিনি জানান।

দেশে গ্যাসের সংকট রয়েছে। এই সংকট মেটাতে তরল গ্যাস আমদানির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তরল গ্যাস আমদানি করা হলে গ্যাসের দাম অনেক বেড়ে যাবে। এছাড়া পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত, পাকিস্তানসহ কয়েকটি দেশের তুলনায় বাংলাদেশে কম দামে গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। বাংলাদেশে যেখানে বিদ্যুত্ খাতে প্রতি ইউনিট (এমসিএফ) গ্যাসের দাম ৭৯ দশমিক ৮২ টাকা। সেখানে ভারত, পাকিস্তান, থাইল্যন্ড এবং মালয়েশিয়ায় যথাক্রমে ৫২০ দশমিক ৩০ টাকা, ৪৫৮ দশমিক ৪৩ টাকা, ৩৫৬ দশমিক ৮০ টাকা এবং ১৫০ টাকা। বাংলাদেশের সার কারখানায় প্রতি ইউনিট গ্যাস দেয়া হয় ৭২ দশমিক ৯২ টাকায়, যা ভারতে ৬১১ দশমিক ১০ টাকা আর পাকিস্তানে ২৮২ দশমিক ৭৮ টাকা।