গতকাল বুধবার সকালে ঘুম থেকে উঠে টেলিভিশনের সামনে বসেই আঁতকে উঠি। রংপুরের স্থানীয় একজন সাংবাদিক একটি টেলিভিশন চ্যানেলে দুঃসহ খবরটি জানিয়ে বলছিলেন, ‘নিহত চারজনকে চেনার উপায় নেই। পেট্রোলবোমার আগুনে পুড়ে কয়লা হয়ে গেছে চারজনের দেহ। বাকি ১০ জনের অবস্থা আশংকাজনক।’
ওই খবরেই দেখাচ্ছিল—রংপুরের পুলিশ সুপার আবদুর রাজ্জাক বলছিলেন, ‘আমরা কোন্ দেশে বাস করছি? এ কেমন বীভত্সতা। কোনো মানুষ কী করে এমনভাবে মানুষ হত্যা করতে পারে?’ হাসপাতালে আহতদের বীভত্স চেহারা দেখা যাচ্ছিল না। আর নিহতের দেহ তো আর মানুষের শরীর বলে চেনার উপায় নেই। হাসপাতালের একজন কর্মী যখন কাপড় দিয়ে মৃতদেহগুলো ঢেকে দিচ্ছিল তখন মনে হচ্ছিল কয়েকটি কয়লাখণ্ড ঢাকা হচ্ছে।
টিভি দেখতে দেখতেই মনে পড়ে, ২০১৩ সালের ডিসেম্বর মাসের আরেকটি দুঃস্বপ্নের কথা। অফিসের কাজ শেষে রাতে বাংলামোটর মোড় ঘুরে বাসায় ফিরছিলাম। সঙ্গে ইত্তেফাকেরই আরেকজন সাংবাদিক। চোখের সামনে দেখছিলাম বাংলামোটর মোড়ে একটি বাসে পেট্রোল বোমা পড়ল। সঙ্গে সঙ্গে বাসে জ্বলে উঠল দাউ দাউ করে আগুন। লোকজন সব প্রাণভয়ে বাস ছেড়ে ছুটছে। কিন্তু একজন হতভাগ্য যাত্রী আর বেরোতে পারেননি। আগুনের লেলিহান শিখার মধ্যে কিছুক্ষণ যেন ভাসছিল তার দেহটা। আশেপাশের লোকজন সাধ্যমত পানি, বালু নিয়ে দৌড়েও নিভাতে পারেনি সেই লেলিহান শিখা। একপর্যায়ে ফায়ার ব্রিগেডের গাড়ি আসার আগেই কয়লা পিণ্ড হয়ে রাস্তায় ছিটকে পড়ে কয়েক মিনিট আগের জীবন্ত প্রাণটি। চোখের সামনে এ ধরনের নৃশংসতা জীবনে আর দেখিনি।
ওই ঘটনার পর গত এক বছরে সেই দুঃসহ স্মৃতি ভোলার চেষ্টা করেছি প্রাণপণে। কিন্তু ভুলতে পারিনি। এখনও প্রাণান্ত চেষ্টা করছি সেই অসহনীয় দৃশ্য মন থেকে মুছে ফেলতে। কিন্তু গতকাল রংপুরে যখন সেই একই কায়দায় চারজনের জীবন্ত দগ্ধ হওয়ার খবর শুনলাম তখন অনেকক্ষণ চুপ করে বসে ছিলাম। চোখের সামনে ভেসে উঠছিল বাংলামটরে আগুনে পুড়ে এক যুবকের কয়লা হয়ে যাওয়ার দৃশ্য।
একটু পরে খবর নিয়ে জানা গেল রংপুর থেকে ঢাকাগামী বাসটি ছিল পুলিশ-বিজিবির প্রহরার মধ্যেই। আগে-পিছে পাহারা দিয়ে ৩০টি যাত্রীবাহী বাসকে তারা ঢাকার দিকে নিয়ে আসছিল। এরমধ্যে রংপুরের মিঠাপুকুর এলাকা পার হওয়ার সময় বহরের ২৭ নম্বর বাসটি লক্ষ্য করে দুর্বৃত্তরা পেট্রোল বোমা ছুঁড়ে মারে। খলিল এন্টারপ্রাইজ নামের পুরো বাসটিতে সঙ্গে সঙ্গে আগুন ধরে যায়। তারপর যা হবার তাই হয়। এ যেন হরর ছবিকেও হার মানাচ্ছিল।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমরা কারা কাকে পুড়িয়ে মারছি। গত একবছর আগে কিংবা এখন। কি দোষে তারা আগুনে পুড়ে কয়লা খণ্ড হচ্ছে। রংপুর থেকে বাসে করে তারা ঢাকা আসছিল কাজ করতে। বিএনপি-জামায়াত জোটের অবরোধ জেনেও তারা কেবল জীবিকার তাগিদেই ঝুঁকি নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল। তারা কোন অপরাধ করেনি। গণতন্ত্রে তো অবরোধ কিংবা হরতাল পালনেরও যেমন অধিকার আছে তেমনি তা পালন করারও সুযোগ রয়েছে। অবরোধ ডেকে এই পেট্রোল বোমা দিয়ে মানুষ মেরে কি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা যাবে। জানি না, অবরোধ আহ্বানকারীরা এর কি জবাব দেবেন।
এই রাজধানীতেও আমরা যারা প্রতিদিন কাজ করতে বাড়ি থেকে বের হই তারাও যে কখন একখণ্ড কয়লা হয়ে যাবো না তার নিশ্চয়তা কোথায়। কারণ এ ধরনের ভয়ানক পেট্রোল বোমা এখন রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার বাতাসন গ্রামেও পৌঁছে গেছে। রাজধানীতেও নিশ্চয়ই এর বড় মজুদ রয়েছে। পুলিশ-বিজিবির পাহারার মধ্যেও কিন্তু এই অসহায় মানুষগুলোকে রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। পুলিশ-বিজিবির পাহারায় যারা এখন প্রতিদিন ঘর থেকে বের হচ্ছেন তাদের জীবনের কি বিন্দুমাত্র নিরাপত্তা আছে।
সরকারের মন্ত্রীরা প্রায় প্রতিদিন বলছেন, সড়ক-মহাসড়কের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে। বিরোধী দলের অবরোধ চলাকালে কোন গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হলে ক্ষতিপূরণ দেয়ার ঘোষণাও দেয়া হয়েছে। কিন্তু রংপুরের এ বর্বর ঘটনায় কি তার সামান্যতম নিশ্চয়তা দিয়েছে।
জানি না এ চারজন নিরীহ মানুষের অসহায় জীবনহানির ঘটনার পর অবরোধ আহ্বানকারী রাজনৈতিক জোটটি কি বলবেন। ঢাকায় তাদের একজন কেন্দ্রীয় নেতা আহত হওয়ার এক ঘণ্টার মধ্যে সারাদেশে হরতাল আহ্বান করা হয়েছে। কিন্তু আগুনে পুড়িয়ে চারজন মারার ঘটনায় তারা নির্বাক কেন। এই অসহায় মানুষগুলো কি এ দেশের সন্তান নয়। তাদের জীবনের কি কোন দামই নেই কারো কাছে।
এও জানি না সরকার পক্ষ কি জবাব দেবেন জানমালের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হওয়ার পর। মানুষ যে এখন চরম এক নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে এর চেয়ে বড় প্রমাণ আর কি হতে পারে। এভাবে ক্ষমতায় যাওয়া আর টিকে থাকার লড়াইয়ের বলি কতদিন হতে থাকবো আমরা। মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে কতদিন রাস্তায় বেরোবে মানুষ। এ প্রশ্নের উত্তর এখন খুবই প্রয়োজন।
n লেখক :সাংবাদিক
