এবারো অবরোধের বলি শ্রমজীবী মানুষ

আপডেট : ১৬ জানুয়ারি ২০১৫, ০১:৩১

মীরপুর পূরবী সিনেমা হলের সামনে দিনমজুরদের জটলা। এদের বেশিরভাগ রাজমিস্ত্রির কাজ করেন। প্রতিদিন সকাল আটটায় সেখানে এসে বসেন। ভবন বা দেয়াল নির্মাণ কাজে তাদের দৈনিক পারিশ্রমিকের ভিত্তিতে কাজ করানো হয়। সপ্তাহে ছয়দিন কাজ করার পর তাদের অনেকে গ্রামের বাড়িতে চলে যান। এক সপ্তাহ গ্রামে গৃহস্থালী কাজ করার পর আবার ঢাকায় ফিরে আসেন।

জটলার মাঝখান থেকে আবু জাফর নামে একজনের সাথে কথা হয়। তিনি জানালেন বাড়ি থেকে এসেছেন চারদিন হলো। এখনো পর্যন্ত তাকে কেউই কাজে ডাকেনি। আগে দরদাম করে ভালো পারিশ্রমিকে তারা কাজ পেতেন। কিন্তু এবারের অবরোধে এখনো পর্যন্ত মহাজন (আবু জাফরের ভাষায়) আসেনি। গত চারদিনে ঢাকায় তার জীবন কেটেছে কখনো অনাহারে কখনো অর্ধাহারে। কাজ না পাওয়ায় বাড়ি ফেরাও হচ্ছে না তার। কোথায় থাকেন প্রশ্ন করলে আবু জাফর জানান, গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহের ভালুকার রিকশাচালক তাহের মিয়া তার পরিচিত। সেখানে কোনমতে রাত কাটাচ্ছেন। সকালে বাসা থেকে বেরিয়ে যান। রাতে ফেরেন। শুধু আবু জাফর নয়, পূরবী সিনেমা হলের সামনে ২০ থেকে ২৫ জন দিনমজুর বসে আছেন কোদালসহ নানা সরঞ্জাম নিয়ে। তাদের কারোরই কাজ নেই। এদের কেউই ঢাকায় থাকেন না। ঢাকার আশপাশের জেলাগুলো থেকে এসে কাজ করে আবার বাড়ি ফিরে যান।
শুধু পূরবী সিনেমা হলের সামনেই নয়, এরকম চিত্র দেখা গেছে মীরপুরের কালসি, কচুক্ষেত বাজার, বাড্ডা, রামপুরা, খিলক্ষেত মোড়সহ রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে। এর আগেও বিভিন্ন সময়ে হরতাল কিংবা অবরোধে বলি হয়েছে খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ। এবারও ২০ দলীয় জোটের টানা অবরোধে দিনমজুরদের জীবিকার রাস্তা সংকীর্ণ হয়ে গেছে। যাদের সংসার দৈনিক পারিশ্রমিকের ওপর নির্ভর করে, অবরোধে সহিংসতা ও নাশকতার কারণে তাদের জীবন ও জীবিকা অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। তেমন কাজ নেই বললেই চলে।
কালসি মোড়ে কথা হয় ভ্যানগাড়ি চালক আফাজের সাথে। চল্লিশোর্ধ এই ব্যক্তি জানালেন, অবরোধ না হলে প্রতিদিন তার উপার্জন হয় আটশ টাকার বেশি। কিন্তু অবরোধে দু’ একটা ভাড়া মিললেও তাতে পুষিয়ে উঠতে পারেন না। দুর্বৃত্তদের নাশকতায় মালামাল হারানোর ভয়ে এই সময়ে মানুষ পণ্য পরিবহন করছে কম। একারণে ভাড়াও যায় না তার গাড়ি। তিনি বলেন, মানুষের বাসাবাড়ি বদল করলেও বেশ ভাড়া পাওয়া যায়। কিন্তু অবরোধের সময় মানুষ বাসাবাড়িও তেমন বদল করছে না। ফলে যে শ্রমজীবী মানুষটি প্রতিদিন খাটুনির পর বাসায় ব্যাগ ভর্তি বাজার নিয়ে যেতেন সেই মানুষটি এখন ফিরছেন শুকনো মুখে খালি হাতে। সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন। আফাজ বলেন, ‘আমরা রাজনীতি বুঝি না। ছেলেমেয়ে নিয়ে জীবন বাঁচিয়ে রাখতে চাই।’
কারওয়ান বাজারে মিন্তির কাজ করে সোলায়মান। তার গ্রামের বাড়ি চাঁদপুরে। ১৫ বছর ধরে এ পেশায় আছেন। তিনি জানালেন, মিন্তির কাজ অনেকে ভালো চোখে না দেখলেও এ কাজ করেই আমার সংসার ভালোই চলে। কিন্তু অবরোধের কারণে বাজারে ক্রেতা কম। তিনি জানান, অনেক দূর থেকে মানুষ কারওয়ান বাজারে সওদা করতে আসে। এ কাজ করতে করতে অনেকের সাথে আমার পরিচয়ও হয়ে গেছে। কিন্তু অবরোধের কারণে তারা এখন আর এই বাজারে আসছেন না। অনেকে বাসা বাড়ির কাছ থেকে বাজার করেন। এতে করে তার কাজ কমে এসেছে। সারাদিনে এখন যে কয়টি কাজ পান তা দিয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাকে।
খিলক্ষেত বাসস্টান্ডের কাছে টং দোকানে বসে চা পান করছিল আউয়াল। একটি হিউম্যান হলারের কন্ডাক্টরের কাজ করেন সে। বয়স আনুমানিক ১৫ হবে। দিন কেমন যাচ্ছে প্রশ্ন করলে সে জানায়, মাসিক বেতন না থাকায় আগে প্রতিদিনের আয় দিয়ে তাকে চলতে হতো। প্রতিদিন দুই থেকে আড়াইশ টাকা রোজগার হতো। এখন বসে বসে দিন কাটাতে হচ্ছে। রাস্তায় গাড়ি পোড়ানো হচ্ছে দেখে তার মালিক গাড়ি বের করতে নিষেধ করেছেন। গত ১০ দিন ধরে তার কোন আয় নেই বলে জানান।

ঢাকা শহরে দৈনিক পারিশ্রমিকের ভিত্তিতে কাজ করেন এমন লোকের সংখ্যা কয়েক লাখ। ২০ দলীয় জোটের টানা অবরোধে এদের কপাল পুড়েছে। এ বিষয়ে গবেষণা সংস্থা উন্নয়ন অন্বেষণের চেয়ারম্যান রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র গঠিত হয়েছে সমতা, মানবিক মর্যাদা এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে। এর কোনটা অনুপস্থিত থাকলে বাংলাদেশের মূল স্পিরিট নষ্ট হয়ে যায়। তিনি বলেন, প্রতিটি রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় খেটে খাওয়া মানুষ। যারা দৈনিক পারিশ্রমিকের ভিত্তিতে কাজ করে তাদের কথা রাজনৈতিক দলগুলো মনে রাখে কিনা তা নিয়ে সংশয় আছে।