জুমার নামাজে মুসল্লিদের ঢল

আপডেট : ১৭ জানুয়ারি ২০১৫, ০০:৩২

ধর্মপ্রাণ লাখো মুসল্লির এবাদত বন্দেগীতে আবার মুখর টঙ্গীর তুরাগ তীর। প্রথম পর্বের মতো গতকাল শুক্রবার থেকে শুরু হওয়া বিশ্ব ইজতেমার দ্বিতীয় পর্বেও মুসল্লিদের ঢল নেমেছে। অবরোধ, হরতাল, শীত উপেক্ষা করে তুরাগ তীরে গতকাল জুমার নামাজ আদায় করার জন্য রাজধানী ঢাকাসহ আশেপাশের জেলা এমনকি দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসে নানা বয়সী মানুষ। দীর্ঘপথ হেঁটে আসেন অনেকে। তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না ১৬০ একর জমিতে তৈরি করা বিশাল ছাউনির নিচে। জুমার নামাজ শুরুর আগ পর্যন্ত পুরো ইজতেমা স্থল কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। নামাজের কাতার ছাপিয়ে যায় নদীর তীর, সড়ক, মহাসড়ক, মনদীর ব্রিজের উপর। এমনকি যানবাহনের উপরও। বহু মুসল্লিকে জায়গা না পেয়ে রাস্তায় খবরের কাগজ, পলিথিন বিছিয়ে নামাজ আদায় করতে দেখা যায়।

গতকাল ইজতেমা ময়দানে বিশাল জুমার নামাজের ইমামতি করেন ঢাকার কাকরাইল মসজিদের ইমাম হাফেজ মাওলানা মোহাম্মদ জোবায়ের। গতকাল জুমার নামাজে শরিক হন স্থানীয় সংসদ সদস্য জাহিদ আহসান রাসেল, গাজীপুরের জেলা প্রশাসক মো: নূরুল ইসলাম, পলিশ সুপার মুহাম্মদ হারুন অর রশীদ পিপিএমসহ অন্যান্য কর্মকর্তাগণ।
জুমার নামাজে মুসল্লিদের ঢল
ইজতেমার প্রথম দিনেই ইজতেমা মাঠে অনুষ্ঠিত হয় দেশের স্মরণকালের বৃহত্তম জুমার নামাজ। আয়োজকদের ধারণা, আনুমানিক ১০-১২ লাখ মুসল্লি জুমার নামাজ আদায় করেছেন। বাদ জুমা বয়ান করেন বাংলাদেশের তাবলীগ মুরব্বী মাওলানা মোহাম্মদ হোসেন।
গতকাল ফজরের নামাজের পর বিশ্ব ইজতেমার দ্বিতীয় পর্বের কার্যক্রম শুরু হয়। বাদ ফজর বয়ান করেন পাকিস্তানের মাওলানা ইসমাইল হোসেন গোদরা। বয়ানের বাংলা তরজমা করেন বাংলাদেশের মাওলানা নূরুল রহমান। উর্দু ও আরবিতে পরিবেশিত এ বয়ান সাথে সাথেই বাংলায় তরজমা করা হয়। তিনি তাবলিগের উসুল এবং ইসলামে তাবলীগের গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করেন।
দ্বিতীয় পর্বে গতকাল শুক্রবার বাদ ফজর পাকিস্তানের মাওলানা ইসমাইল হোসেন গোদরা, বাদ জুমা ভারতের মাওলানা মোহাম্মদ জোয়াহের হোসেন, বাদ আছর ভারতের হযরত মাওলানা মুহাম্মদ মূসা ও বাদ মাগরিব ভারতের হযরত মাওলানা সা’দ বয়ান করছেন বলে জানান বিশ্ব ইজতেমার মুরুব্বী ইঞ্জিনিয়ার মোঃ গিয়াস উদ্দিন। 
বয়ানে বিশিষ্ট আলেমগণ বলেন, পরকালের চিরস্থায়ী সুখ শান্তির জন্য আমাদের প্রত্যককে দুনিয়াতে জীবিত থাকা অবস্থায় দ্বীনের দাওয়াতের কাজে কঠিন মেহনত করতে হবে। ঈমান আমলের মেহনত ছাড়া কেউ হাশরের ময়দানে কামিয়াব হতে পারবে না।
প্রথম দিনের বয়ান
জুমাপূর্ব বয়ানে বলা হয়, গরিরেব জন্য ঈদের নামাজের চেয়েও উত্তম ইবাদত হলো শুক্রবারের জুমার নামাজ। এদিনে আল্ল­াহ্র কাছে যে যা চাইবে, আল্লাহ তা তাকে দেবেন। এ নামাজ আদায় করার তৌফিক আল্লাহ আমাদেরকে দান করুন। জুমার নামাজ আদায়ের লক্ষ্যে ওজু গোসল করে মসজিদের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার পর  থেকে তার আমলনামায় এক বছরের নফল নামাজ ও রোজার নেকী লেখা শুরু হয়। শুক্রবার দিন আল্লাহ আমাদের আদি পিতা হযরত আদম (আ.)কে সৃষ্টি করেছেন। এইদিনে দুনিয়া সৃষ্টি করেছেন ও ধ্বংস করবেন। তাই শুক্রবার দিনটিকে আল্লাহর ফেরেশতাসহ সব সৃষ্টিকুল ভয় পায়। আমরা যা করবো আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্যই করবো। আল্লাহ পাকের হুকুম মতো আমরা যেন সারা জীবন চলতে পারি সে চেষ্টা করতে হবে। এখান থেকে শিক্ষা নিয়ে দেশে ও সারা দুনিয়ায় মানুষের মাঝে দীন কায়েম করার জন্য ছড়িয়ে পড়তে হবে।
বিভিন্ন ভাষায় বয়ানের অনুবাদ
বিশ্ব ইজতেমায় বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের তাবলিগ মারকাজের ১৫-২০ জন শুরা সদস্য ও বুজর্গ বয়ান পেশ করবেন। মূল বয়ান উর্দুতে হলেও বাংলা, ইংরেজি, আরবি, তামিল, মালয়, তুর্কি ও ফরাসি ভাষায় তাত্ক্ষণিক অনুবাদ হচ্ছে। বিদেশি মেহমানদের জন্য মূল বয়ান মঞ্চের উত্তর, দক্ষিণ ও পূর্বপাশে হোগলা পাটিতে বসেন। বিভিন্ন ভাষাভাষি মুসল্লিরা আলাদা আলাদা বসেন এবং তাদের মধ্যে একজন করে মুরুব্বী মূল বয়ানকে তাত্ক্ষণিক অনুবাদ করে শুনান।
মুসল্লি­দের টঙ্গীমুখী স্রোত অব্যাহত
বিশ্ব ইজতেমায় যোগ দিতে দেশ-বিদেশ থেকে মুসল্লি­দের টঙ্গীমুখী স্রোত অব্যাহত রয়েছে। আখেরি মোনাজাত পর্যন্ত এ স্রোত আরো প্রবল হবে। তুরাগ তীরবর্তী বিশাল প্রান্তরে নির্মিত পাটের চট ও লাইলন কাপড়ের সামিয়ানা ইতোমধ্যেই কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে গেছে। ফলে নতুন করে যারা আসছেন তাদেরকে নিজ উদ্যোগে তাঁবু টানিয়ে অবস্থান নিতে হচ্ছে।
আগামীকাল রবিবার দুপুরের আগে আখেরি মোনাজাতের মধ্য দিয়ে এবারের বিশ্ব ইজতেমার দ্বিতীয় পর্বের সমাপ্তি ঘটবে।
ময়দানের আশপাশে ময়লার স্তূপ
 ইজতেমা ময়দানের উত্তর পাশে টঙ্গী-আশুলিয়া রোডের ফুটপাতে, পশ্চিম ও দক্ষিণ দিকে তুরাগ নদীর তীর সংলগ্ন এলাকায় প্রথম পর্বে মুসল্লিদের ফেলে যাওয়া উচ্ছিষ্ট ও নানা ধরনের আবর্জনার স্তূপ রয়ে গেছে। সেগুলো থেকে উত্কট গন্ধ বের হচ্ছে যা মুসল্লিদের জন্য সম্পূর্ণ অস্বাস্থ্যকর।
৪ মুসল্লির মৃত্যু
গত বুধবার রাত থেকে গতকাল শুক্রবার সকাল ১১টা পর্যন্ত ৪ মুসল্লির মৃত্যু হয়েছে।
জানা গেছে, গত বুধবার রাতে লক্ষ্মীপুর জেলার ডুমনি থানার মৃত নুরুল ইসলামের ছেলে আবদুল কুদ্দুস (৬২) হূদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। এদিকে গত বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুক্রবার ১২টা পর্যন্ত পটুয়াখালীর মো. বিল্লাল হোসেন (৩০), বগুড়ার শাহজাহানপুরের আবদুর রহমান (৬৫) ও অজ্ঞাতনামা (৬৫) অপর এক মুসল্লি মারা যান।
ময়দানের চারপাশ জুড়ে যানজট
ইজতেমার চার পাশের সড়কগুলো যানজট মুক্ত রাখতে ১ম পর্বের চেয়ে দ্বিতীয় পর্বে অধিক পুলিশ মোতায়েন করা হলেও এই পর্বে যানজট লেগেই আছে। গতকাল জুমার নামাজ শেষে ইজতেমা ময়দানের আশপাশ এলাকা জুড়ে দীর্ঘ যানজট লেগে যায়।
পাঁচ স্তরের কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা
ইজতেমা মাঠের সার্বিক নিরাপত্তায় পুলিশ ও র্যাব কন্ট্রোল রুম ও ওয়াচ টাওয়ার স্থাপন করেছে। সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে সার্বিক নিরাপত্তা কন্ট্রোল রুম থেকে মনিটরিং করা হচ্ছে। খিত্তায় খিত্তায় সাদা পোশাকে আইন-শৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা অবস্থান করছেন।
আজ যৌতুকবিহীন বিয়ে
ইসলামিক শরিয়া অনুযায়ী শনিবার বাদ আসর শতাধিক যৌতুকবিহীন বিয়ে অনুষ্ঠিত হবে। সকাল থেকে ওইসব বিয়ের জন্য বয়ান মঞ্চের কক্ষেই বর-কনের নাম তালিকাভুক্ত করা হবে।
জেলা প্রশাসনের কার্যক্রম
গাজীপুরের জেলা প্রশাসক মোঃ নূরুল ইসলাম জানান, জেলা প্রশাসন বিশ্ব ইজতেমার সার্বিক কর্মকাণ্ড সুন্দর ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে বিভিন্ন বিভাগের কাজের সমন্বয় করে থাকে। ঢাকা বিভাগীয় প্রশাসন এবং পুলিশ প্রশাসন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দিক নির্দেশনায় বিভিন্ন কার্যাদি তদারকি করে।
ইজতেমায় ফ্রি মেডিক্যাল ক্যাম্প

বৃহস্পতিবার থেকে বিশ্বইজতেমায় আগত মুসল্লিদের স্বাস্থ্য সেবা দিতে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা কাজ করছে। এবার প্রায় ৪৫টি স্বেচ্ছাসেবী, সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা স্বাস্থ্য সেবা প্রদান করছে বলে জানা গেছে।